বিশেষ প্রতিনিধি
মহান মুক্তিযুদ্ধে যশোর রোড, লক্ষ লক্ষ বাঙালির অশ্রুভেজা রোড। এই রোড সন্তান হারা মাকে দেখেছে, স্বামীহারা স্ত্রীকে দেখেছে, তাদের চোখের জলে প্রতিনিয়ত স্নান করেছে, এই রোড সম্ভমহারা নারীকে মুখ লুকিয়ে চলতে দেখেছে। শুধু তাই নয় এই যশোর রোড লাখো শরনার্থীকে বিজয়ের মিছিল নিয়ে নিজ ভূখন্ডে ফিরতে দেখেছে। যুদ্ধকালীন সময়ে যশোর রোডে শরণার্থীদের অবর্ণনীয় দুর্দশা ও যুদ্ধচিত্র ঘটনা প্রবাহের রং-তুলির ছোঁয়ায় তুলে ধরেছেন ‘মুক্তিযুদ্ধে যশোর রোড’ শিরোনামে আর্ট ক্যাম্পে’র ৫০ জন দেশ বরেণ্য চিত্রশিল্পী। (৫ ডিসেম্বর) রোববার দিনব্যাপী মুক্তিযুদ্ধের সেই অধ্যায়ের গল্প নিয়ে যশোর পৌর পার্কে আর্ট ক্যাম্পের আয়োজন করে জেলা সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট। বিজয়ের ৫০ বছর উদযাপনের অংশ হিসাবে যুদ্ধকালীন সময়ে যশোর রোডে শরণার্থীদের অবর্ণনীয় দুর্দশা-যুদ্ধচিত্র রং তুলির প্রাণবন্ত এবং মনোমুগ্ধকর উপস্থাপনা দেখে অনেকের চোখ যেন ছলছল করে ওঠে।
প্রদর্শনীতে দেখা যায়, যখন ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের শরণার্থীরা এই রাস্তা ধরে ভারতে পাড়ি জমাচ্ছিল, তখন এই রাস্তাটিই ছিল তাদের শুধুমাত্র বেঁচে থাকার স্বপ্ন পূরণের পথ। তাদের অনেকেই পথ চলার ক্লান্তি সহ্য করতে না পেরে ঢলে পড়েছিলেন মৃত্যুর কোলে। এই রাস্তার প্রতিটি ধূলিকণাও যেন সেই হাজারো শরণার্থীদের ক্লান্তি, দুর্ভোগ ও বয়ে বেড়ানো স্বপ্নের সাক্ষী। বেঁচে থাকার জন্য নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে তারা পাড়ি দিচ্ছেন যশোর রোড। পথের দু’ধারের খড়ের চালার ঘর, অগুনতি নিরাশ্রীয় জনতার দখলকৃত বাংলাদেশ থেকে ভারতমুখী পথ চলা। কারো হাতে নীল আকাশের বিস্তারে ভেসে যাচ্ছে সাদা মেঘ। রাস্তার দুধারে বড় বড় গাছ। তার মধ্যে কাঁদা-মাটি রাস্তায় দলবেঁধে হাঁটছে ভারতের দিকে শত শত বাংলার নারী-পুরুষ। কারো হাতে রং তুলিতে বিজয় মিছিল দিতে দিতে যশোর রোড দিয়ে ওপার বাংলা থেকে এই বাংলার ফেরার দৃশ্য ফুটে উঠেছে।
আয়োজকরা জানান, বিজয়ের ৫০ বছর উদযাপনে যশোরে জেলা প্রশাসনের সহযোগীতায় ও জেলা সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের উদ্যোগে ৫ ডিসেম্বর থেকে শুরু হয়েছে জেলাজুড়ে ২১ দিনব্যাপী সাংস্কৃতিক উৎসব। সাংস্কৃতিক উৎসবের ধারাবাহিকতায় ঐতিহাসিক যশোর রোডকে উপজিব্য করে ‘মুক্তিযুদ্ধে যশোর রোড’ শিরোনামে আর্ট ক্যাম্পে ছবি আঁকার মধ্য দিয়ে শুরু হয় এ উৎসব। আর্ট ক্যাম্পে যশোরসহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় চারুকলা বিভাগের সাবেক এবং বর্তমান শিল্পীরা অংশ নেয়। তারা এই আর্টক্যাম্পে অ্যাক্রেলিক রঙে ক্যানভাসে যশোর রোডের শরণার্থীদের অবর্ণনীয় দুর্দশা ও যুদ্ধচিত্র মুহূর্ত অবলম্বনে চিত্রাঙ্কন করেছেন। পরবর্তী প্রজন্মের কাছে যশোর রোড ও মুক্তিযদ্ধের শৈল্পিক অস্তিত্ব তুলে ধরতে এই দিনব্যাপী আর্টক্যাম্পের আয়োজন। ক্যাম্পে আঁকা চিত্রকর্মগুলো নিয়ে সোমবার থেকে সাতদিন ব্যাপী যশোর ইনস্টিটিউটের মিলনায়তনে প্রদর্শনীর আয়োজন করা হবে।
আর্ট ক্যাম্পে অংশ নেওয়া দেবব্রত দাস জানান, ‘এ উদ্যোগের মধ্য দিয়ে তরুণ বাঙালি প্রজন্মকে ৭১ এর যশোর রোডের যে দুঃখ দুর্দশা ও যুদ্ধচিত্র কিছুটা আচ করতে পারবে। যশোর রোড নিয়ে আর্ট ক্যাম্পে এ ধরণের চিত্রকর্ম তুলে ধরেছি আমি এটাই প্রথম।
এই আয়োজন সম্পর্কে বিজয়ের ৫০ বছর পূতি উদযাপন পর্ষদ-২১ ভাইস চেয়ারম্যান ফারাজী আহমেদ সাঈদ বুলবুল জানান, বিজয়ের ৫০ বছর উদযাপন আমাদের জীবনে এক অনন্যপ্রাপ্তি। মহান মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস তুলে ধরা এবং বর্তমান ও আগামী প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় শানিত করার লক্ষ্য নিয়ে এ উৎসবের আয়োজন করা হয়েছে। এই আয়োজনের মধ্যে দিয়ে আমাদের শিল্পীরা যে আন্তরিকতা নিয়ে ছবিগুলো আঁকছেন সেটি ইতিহাসের একটি অমূল্য দলিল হিসাবে বিবেচিত হবে বলে আমি মনে করি। এই আয়োজন নিয়ে যশোরের জেলা প্রশাসক তমিজুল ইসলাম খান সাংবাদিকদের বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতির যে ধারাবাহিকতা শুরু হয়েছিল, তা থেকে আমরা মুক্তি পেয়েছি। এখন আমরা জোরেশোরেই বলতে পারি, যে আদর্শের ভিত্তিতে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা হয়েছিল তা বাস্তবায়িত হচ্ছে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সাথে যশোর রোডের একটি ঐতিহাসিক যোগসূত্র রয়েছে। যশোর রোড নিয়ে আর্ট ক্যাম্পটির মাধ্যমে আমরা ইতিহাসকে নতুনভাবে জানছি, যা আমাদের স্মৃতিকে প্রবলভাবে নাড়া দেয়।’#

