কালীগঞ্জ (ঝিনাইদহ) প্রতিনিধি:
ভারতে গিয়ে খুন হয়েছেন ঝিনাইদহ-৪ (কালীগঞ্জ উপজেলা) আসনের সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আজিম আনার। বুধবার (২২ মে) সকালে কলকাতার নিউটাউন এলাকার অভিজাত আবাসন সঞ্জিভা গার্ডেন থেকে তার মরদেহ উদ্ধারের পর দেশের গন্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আলোচনায় আসেন সংসদ সদস্য আনার।
আনার ১৯৬৮ সালের ৩ জানুয়ারি কালীগঞ্জ শহরের মধুগঞ্জ বাজার এলাকায় জন্মগ্রহন করেন। তার বাবার নাম ইয়াকুব আলী ও মাতার নাম জহুরা খাতুন। বাবা-মা দু’জনই গত হয়েছেন। চার ভাই ছয় বোনের ৮ম সন্তান আনার। ১৯৮৪ সালে শহরের নলডাঙ্গা ভূষণ পাইলট মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাশ করেন। ১৯৮৬ সালে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করেন শহরের মাহতাব উদ্দীন ডিগ্রী কলেজ থেকে। একই কলেজ থেকে ১৯৯০ সালে স্নাতক পাশ করেন।
ছোটবেলা থেকেই ফুটবল খেলার প্রতি আগ্রহী ছিলেন। অল্প বয়সে তিনি এ অঞ্চলের একজন জনপ্রিয় খেলোয়ার হয়ে ওঠেন। এরপর ১৯৯১ সালের ২১ জুলাই একই কালীগঞ্জ পৌরসভাধীন হেলাই গ্রামের কলেজ শিক্ষক শরিফুল ইসলামের মেয়ে শেফালী পারভিনের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। সে দুই কন্যা সন্তানের জনক। ১৯৯৩ সালে কালীগঞ্জ পৌরসভার প্রথম নির্বাচনে কমিশনার নির্বাচিত হন।
এরপর ২০০৪ সালে একই পৌরসভায় চেয়ারম্যান পদে নির্বাচন করে পরাজিত হন। এসময় তিনি রাজনৈতিক ঝামেলার কারনে দির্ঘদিন ভারতে পালিয়ে ছিলেন। একই বছর ভারতে পালিয়ে থাকা অবস্থায় কালীগঞ্জ উপজেলা আওয়ামীলীগের সাধারন সম্পাদক নির্বাচিত হন। ২০০০ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত তার নামে ২১ টি মামলা হয়। এরমধ্যে তিনটি হত্যা, তিনটি স্পেশাল পাওয়ার এ্যাক্ট, ১০টি বিস্ফোরক দ্রব্য ও পাঁচটি প্যানাল কোডের বিভিন্ন ধারা। ২০০৮ সালে অস্ত্র ও বিস্ফোরক মামলায় ইন্টারপোলের মোষ্ট ওয়ান্টেড তালিকায় তার নাম ওঠে।
পরে ২০০৮ জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামীলীগ সরকার গঠন করে। ২০০৯ সালে আনার উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে জয়লাভ করে য়োরম্যান নির্বাচিত হন। সে সময় ইন্টারপোলের তালিকা থেকে তার নাম প্রত্যাহার হয়।
২০১৪ সালে জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামীলীগের দলীয় প্রতিক নৌকা নিয়ে নির্বাচিত হন। এরপর ২০১৮ ২০২৪ সালে আওয়ামীলীগের মনোনয়ন নিয়ে টানা তিনবার নির্বাচিত হন। শেষ সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পাঁচ মাস পর ঘাতকের হাতে হত্যার স্বীকার হলেন।
কথিত আছে সাংসদ আনোয়ারুল আজিম আনার এক সময় দক্ষিণ ও পশ্চিমাঞ্চলের চরমপন্থিদের নিয়ন্ত্রণ করতেন। ১৯৮৬ সালের দিকে জাতীয় পার্টি ক্ষমতায় থাকাকালে আনার মাদক কারবারে জড়িয়ে পড়েন। ভারতের বাগদা সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশের বাঘাভাঙ্গা সীমান্ত পথে চোরাচালান করতেন তিনি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে স্বর্ণ চোরাচালানের কাজ করতেন।
নিহত সাংসদ পুলিশের তালিকা বিভিন্ন মামলার আসামি থাকলেও স্থানীয় জনগণের কাছে একজন জনপ্রিয় নেতা ছিলেন।
টানা ৩ বার আওয়াামী লীগ থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে এলাকার বিভিন্ন উন্নয়নে কাজ করেছেন। সাংসদ হিসাবে বিভিন্ন সেবামূলক কাজের জন্য তার বেশ সুনাম ছিল। ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত নির্বাচনী এলাকার গ্রামে গ্রামে গিয়ে মানুষের সাথে দেখা করে সমস্যা শুনতেন ও সমাধান করতেন। সাধারনত তিনি চলাচলের সময় পুলিশ প্রটোকল ব্যবহার না করে একা একা চলতে স্বাচ্ছন্দ বোধ করতেন।
সবথেকে আলোচিত বিষয় তার নির্বাচনী এলাকায় যে কোন ব্যক্তি মারা গেলে তার বাড়িতে পৌছে শোকার্ত পরিবারকে শান্তনা দিতেন। এমনও হয়েছে তিনি একদিনে ১০ জন মৃত্যু ব্যক্তির বাড়িতে গিয়ে পরিবারের সাথে দেখা করেছেন। এ পর্যন্ত তিনি পাঁচ সহা¯্রাধিক মৃতু ব্যক্তির দোয়া অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছেন। যা দেশের একজন জনপ্রতিনিধি হিসাবে বিরল বলে উল্লেখ করেছেন তার নেতাকর্মীরা।
প্রসঙ্গত, গত ১২ মে রোববার দুপুরে সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আজিম আনার চিকিৎসার জন্য দর্শনার গেদে বন্দর দিয়ে ভারতে যান। বুধবার (২২ মে) সকালে বিভিন্ন মাধ্যমে খবর আসে কলকাতার নিউটাউন এলাকার অভিজাত আবাসন সঞ্জিভা গার্ডেন থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করেছে ভারতীয় পুলিশ।

