ফারুক রহমান, সাতক্ষীরা:
প্রতিষ্ঠার পর দীর্ঘদিন চালু থাকার বিগত ২০০৭ সালে বন্ধ হয়ে যায় সাতক্ষীরার একমাত্র ভারি শিল্প প্রতিষ্ঠান সুন্দরবন টেক্সটাইল মিলস। এরপর গত পনের বছরে কয়েকবার প্রাইভেট কোম্পানির কাছে লিজ দেওয়া হয়। সে সময় সার্ভিস চার্জ পদ্ধতিতে স্বল্প সময় চালু ছিল মিলটি।
এদিকে, দীর্ঘ কয়েক বছরেও চালু করা সম্ভব হয়নি সাতক্ষীরার এই একমাত্র ভারি শিল্প প্রতিষ্ঠান সুন্দরবন টেক্সটাইল মিল্স। বর্তমানে মিলটি বন্ধ থাকায় নষ্ট হয়ে যাচ্ছে শতশত কোটি টাকার যন্ত্রপাতি। হতাশায় ভূগছেন চাকরি হারানো বিপুল সংখ্যক শ্রমিক। সকল পক্ষে দাবি মিলটি আবারও চালুর করার। যদিও কর্তৃপক্ষ দাবি করছে পিপিটি’র মাধ্যমে চালু করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
বিটিএমসি ও সুন্দরবন টেক্সটাইল মিল্স সূত্রে জানা যায়, সাতক্ষীরা জেলার একমাত্র ভারী শিল্প প্রতিষ্ঠান এই মিলটি। ১৯৮৩ সালে সাতক্ষীরা শহর উপকণ্ঠের মাগুরা এলাকায় ৩০ একর জায়গায় স্থাপন করা হয় সুন্দরবন কেক্সটাইল মিলস। মিলটি চালু হওয়ায় সেখানে কাজ করতেন দেড় সহ¯্রাধিক শ্রমিক। মিলীটর মূল ইউনিট ও নীলকমল ইউনিটের আওতায় ৩৯ হাজারেরও বেশি টাকু ঘুরতো প্রতিনিয়ত। মিলের দু’টি ইউনিটের সুতা উৎপাদন ক্ষমতা দৈনিক ১০ হাজার কেজি। তবে এই জৌলুস বেশীদিন থাকেনি। ক্রমাগত লোকসানের ফলে ২০০৭ সালে শ্রমিক-কর্মচারীদের বিদায় জানানো হয় গোল্ডেন হ্যান্ডশেকের মাধ্যমে। পরে সার্ভিস চার্জ পদ্ধতিতে মিলটি চালু হয়। সেই পদ্ধতিও কাজে লাগেনি, টেকেনি বেশি দিন। ২০১৭ সালের শেষের দিকে মিলটি ভাড়ায় নেয় নারায়নগঞ্জের ট্রেড লিংক লিমিডেট। লোকসান হতে থাকায় এক বছর কয়েক মাস চালানোর পর ২০১৯ সালে আবারও বন্ধ ঘোষণা করা হয় মিলটি। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় মরিচা পড়ে নষ্ট হচ্ছে শত কোটি টাকার যন্ত্রপাতি। প্রতিষ্ঠানটি দেখভালের জন্য বিটিএমসির তত্ত্বাবধ্যানে বর্তমানে আটজন কর্মকর্তা-কর্মচারি নিয়োজিত আছেন।
এদিকে, সর্বশেষ বিগত পাঁচ বছর মিলটি বন্ধ থাকায় বেকার জীবনযাপন করছেন এলাকার চার শতাধিক শ্রমিক। জেলার একমাত্র ভারী শিল্প প্রতিষ্ঠানটি অবিলম্বে চালু করতে সরকারের স্বদিচ্ছা গ্রহণের আহবান জানিয়েছেন শ্রমিকরা।
শ্রমিক আরিফুল ইসলাম, মিল সংলগ্ন মাগুরা গ্রামের নারী শ্রমিক শারমিন আরা, জয়নাল গাজীর সাথে কথা হলে তারা বলেন, ‘আমরা এখানে চাকরি করতাম। মিলে শ্রম বিক্রি করা টাকায় চলতো আমাদের সংসার। এখন মিল বন্ধ হয়ে গেছে। আমাদের কর্মসংস্থানের জন্য মিলটি চালু হওয়া জরুরি। আমাদের দাবি মিলটি চালু করা হোক। মিলটি চালু হলে কর্মসংস্থানের সুযোগ হবে, আমরা পরিবার নিয়ে আবারও স্বপ্ন দেখতে পারবো। সরকারের কাছে আমাদের দাবিÑমিলটি জরুরিভাবে চালু হোক’।
সম্প্রতি সুন্দরবন টেক্সটাইল মিলটি চালুর দাবিতে কমিটি গঠন হয়েছে। এই কমিটির সদস্যরা মনে করেন, পরিকল্পিতভাবে চালু করতে পারলে সুন্দরবন টেক্সটাইল মিলস লাভবান হবে। এছাড়াও শ্রমিক নেতারা অভিমত করেছেন এই মিলটি পকিল্পিতভাবে সরকার যদি পরিচালনা করতে পারে তবে, আবারও আশার আলো দেখাবে সুন্দরবন টেক্সটাইল মিলস।
এই বিষয়ে সুন্দরবন টেক্সটাইল মিলস চালু বাস্তবায়ন কমিটির দপ্তর সমন্বয়কারী শেখ শওকত আলী জানান, ‘এই মিলের লাভ দিয়ে আমিন টেক্সটাইল মিল ও মাগুরা টেক্সটাইল মিল গঠিত হয়েছে। কিন্তু বিগত বিএনপি সরকারের ভ্রান্ত নীতির কারণে আজ মিলটি দেউলিয়া। সে সময় পাকিস্থানি তুলা আমদানি করে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে মিলটি। আমরা দাবি করছিÑ সরকার যেকোনভাবে মিলটি চালু করুক’।
’
সুন্দরবন টেক্সটাইল মিলস চালু বাস্তবায়ন কমিটির সদস্য সচিব মাগফুর রহমান বলেন, ‘‘সরকার লোকসান দিয়ে চালাবে না। পিপিপির (পাবলিক প্রাইভেট পটির্নারশিপ) মাধ্যমে বিটিএমসি ইতোমধ্যে তিনটি মিল চালু করেছে। ত্রিশ বছরের লিজে সেগুলো তারা চালাচ্ছে। তারা লাভবান হতে পারলে এই মিল চালু হতে পারবে না কেন’।
কমিটির আহবায়ক শেখ হারুন উর রশিদ বলেন, ‘সম্প্রতি মিলটি চালুর বিষয়ে স্থানীয় সংসদ সদস্য আশরাফুজ্জামান আশু সংসদে জোরালো বক্তব্য রেখেছেন। মিলটি চালু না হলে একদিকে যেমন শত কোটি টাকার যন্ত্রপাতি নষ্ট হবে, অপরদিকে আগে থেকে কর্মরত শ্রমিকরা বেকার হয়ে পড়বে’।’
মিলটি চালুর বিষয়ে বর্তমান ইনচার্জ শফিউল বাশার জানান, ‘১৯৮০ সালে ২৯.৪৭ একর জায়গার ওপর এটি গড়ে ওঠে। ১৯৮৩ সালে এটি চালু হয়। দেড় হাজারেরও বেশি শ্রমিক একসময় কর্মরত ছিল। ১৯৯২ সালে মূল ইউনিটের বাইরে ‘নীলকমল’’ নামে আরও একটি ইউনিট প্রস্তুত হয়। সুতা উৎপাদন থেকে থেকে থান কাপড় পর্যন্ত তৈরি হতো। ক্রমাগত লোকসানের কারণে ২০০৭ সালে গোল্ডেন হ্যান্ডশেকের কারণে শ্রমিক ও কর্মচারীদের বিদায় করা হয়। কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়ে যায় মিলটি দেখাশুনার জন্য। পরে সার্ভিস চার্জ পদ্ধতিতে মিলটি পরিচালিত হতো। পরে সেটাও বন্ধ হয়ে যায়। এরপর ভাড়া পদ্ধতিতে চালানোর চেষ্টা চলে। কিন্তু বিদ্যুৎ সংকট ও মেশিনারিজ পুরনো হওয়ায় ২০১৯ সাল থেকে আবারো বন্ধ হয়ে যায়। এরপর আর চালানো সম্ভব হয়নি। আমি যতটুকু জানি, হয়তবা ভবিষ্যতে পিপিপি’র (সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব) মাধ্যমে মিলটি চালানোর চিন্তা বিটিএমসি’র আছে।
সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ হুমায়ুন করিব জানান, বাস্তবতার নিরিখে সুন্দরবন টেক্সটাইল মিলটিকে সম্পূর্ণভাবে আর চালানো সম্ভব নয়। সে কারণে এই জমিতে টেক্সটাইল ভোকেশনাল ইনস্টিটিউট তৈরি করার চিন্তাও সরকারের রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ‘মিলটি দীর্ঘদিন বন্ধ রয়েছে। ক্রমাগত লোকসান দিয়ে মিলটিকে হয়ত আর চালু করা সম্ভব হবে না। আমরা চিন্তা করছি এখানে একটা ভোকেশনাল ইনস্টিটিউট করা যায় কি-না। যাতে শিক্ষার্থীরা এটা নিয়ে পড়ালেখা করতে পারে। গতবছর ডিসি সম্মেলনে প্রস্তাব দিয়েছি। বস্ত্র মন্ত্রণালয়ে এই প্রস্তাব দেওয়ার পরে তা তারা গ্রহণ করেছে। তিন একর জায়গা লাগবে, ইনস্টিটিউট করতে। ভিন্ন ধরণের কর্মসংস্থানে বাকি জায়গা অন্যভাবে ব্যবহারের কথা ভাবছে মন্ত্রণালয়।

