পাইকগাছা(খুলনা) থেকে আলাউদ্দীন রাজা:আজ ২৫ মে, প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় আইলার ১৪ বছর। বিগত ২০০৯ সালের এই দিনে প্রলয়ংকারী ঘুর্ণিঝড় আইলা পাইকগাছা-কয়রাসহ গোটা উপকুলীয় এলাকা লন্ডভন্ড করে ব্যাপক ক্ষতিসাধন করেছিল। বিস্তীর্ণ জনপদের বিভিন্ন এলাকায় পাউবোর দুর্বল ভেড়িবাঁধ ভেঙ্গে গ্রামের পর গ্রাম লবণ পানিতে তলিয়ে যায়। এতে বহু কাঁচা-পাকা ঘর বাড়ি, ফষলের ক্ষেত ও মাছের ঘের ভেসে গিয়ে কোটি কোটি টাকার ক্ষতির সম্মুখিন হয়।
হাজার হাজার গবাদি পশুর মৃত্যু হয়। উপকূলজুড়ে অর্থনীতিতে পড়ে বিরুপ প্রভাব। আইলা উদ্বাস্তু বহু মানুষ গৃহহারা হয়ে রাস্তার উপর আশ্রয় নেয়। শ্রমজীবি পরিবারে খাদ্য সংকট তীব্র আকার ধারণ করে। দেখা দেয় সুপেয় পানির সংকট। জেলা সদরের সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে গোটা এলাকা। গোটা এলাকায় পানিবাহিত বিভিন্ন রোগ জীবাণু ছড়িয়ে পড়ে অবর্ণনীয় দূর্ভোগের মুখে পড়ে উপকূলীয় জনমানুষ। ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় কাটিয়ে উঠতে সরকারের পাশাপাশি বিভিন্ন দাতা সংস্থা, এনজিও, সামাজিক, রাজনৈতিক ও স্বেচ্ছাসেবি সংগঠন দূর্যোগকবলিত মাানুষের কল্যানে এগিয়ে আসেন। এসময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কয়রা সফরকালে বাগালিতে জনসভায় ক্ষতিগ্রস্থ মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতসহ উপকূলীয় অঞ্চলে টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ ও সবুজ বেষ্টনি গড়ে তোলার ঘোষণা দেন। আইলা পরবর্তী ১৪ বছরে অবস্থার উত্তরণ হলেও এর ক্ষত কাটিয়ে উঠতে পারেননি অনেকেই।
এখন পর্যন্ত পাউবো দু’উপজেলায় ঝুঁকিপূর্ণ পোল্ডার অভ্যন্তরে জরুরী ভিত্তিতে বেড়িবাঁধ নির্মান করলেও পরবর্তী ফনি, আম্পান ও ইয়াস দুর্যোগগুলোতে তা ধোপে টেকেনি। এসব দূর্যোগে এমনকি জোয়ারের অতিরিক্ত পানির চাপে পাইকগাছা ও কয়রার বিভিন্ন পোল্ডারে ভেড়িবাঁধ ভাঙ্গনে ঐ সকল এলাকায় ক্ষয় ক্ষতির ঘটনা ঘটে। বেড়িবাঁধ না টেকার কারণ হিসেবে স্থানীয়রা অপরিকল্পিত চিংড়ি চাষে বেড়িবাঁধ ও স্লুইচগেটগুলোর অপব্যবহারকে দায়ী করে লবণ পানি বিরোধীরা। বার বার এরুপ ঘটনায় জনমনে বিরুপ প্রভাব পড়ে। অভিযোগ ওঠে সরকারের পরিকল্পনা থাকার পরেও নবম ও বিশেষ করে দশম সংসদ নির্বাচনের পরে উপকূল এলাকায় মজবুদ ও টেকসই ভেড়িবাঁধ গড়ে ওঠেনি ।
এ অবস্থার মধ্যেও দুই উপজেলায় কৃষি ভিত্তিক অর্থনীতি ব্যাপক উন্নয়ন ঘটে। লবন পানির চিংড়ি চাষ থেকে মানুষ মুখ ফিরিয়ে নিতে শুরু করেছে। এদিকে একাদশ সংসদ নির্বাচনের পর সংসদ সদস্য আক্তারুজ্জামান বাবু লবন পানির একক চিংড়ি চাষ এর পরিবর্তে মিষ্টি পানিতে ধান ও মাছ চাষের জোরালো দাবি তোলেন। একই সাথে তিনি উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্হা, কয়রায় সুন্দরবন ভিত্তিক পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলা ও প্রধান মন্ত্রীর ঘোষনা টেকসই মজবুদ ভেড়িবাঁধ নির্মানের জন্য জোরালো দাবি উত্থাপন করেন। যার পরিপ্রেক্ষিতে বঙ্গবন্ধু কন্যা প্রধানমন্ত্রী কয়রায় টেকসই ভেড়িবাঁধের জন্য দেড় হাজার কোটি টাকা বরাদ্ধ দিয়েছেন এবং যার বেশ কয়েকটি পোল্ডারে টেন্ডার প্রক্রিয়া শেষে কাজ চলমান রয়েছে।
ইতোমধ্যে অনেক এলাকায় লবণ পানির পরিবর্তে মিষ্টি পানিতে মাছ চাষের পাশাপাশি ধানসহ নানা মৌসুমী ফসল উৎপাদনের দিকে ঝুঁকে পড়েছেন অনেকেই। সব মিলিয়ে গতি ফিরেছে সার্বিক অর্থনৈতিক উন্নয়নে। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, সুপেয় পানি নিশ্চিত করতে সরকারসহ ইউএনডিপি এখন পর্যন্ত দুই উপজেলায় প্রায় সতের হাজার পানির ট্যাংকি সরবরাহ করেছে। এখনও আসার অপেক্ষায় রয়েছে প্রায় কয়েক হাজার জলাধার। দুই উপজেলায় ৪০ টি পুকুর খনন করা হয়েছে। ৩০০ টি নলকুপ ও ১০ টি সোলার পি এস স্থাপন করা হয়েছে। সর্বশেষ,স্হানীয় সংসদ সদস্য আক্তারুজ্জামান বাবু’র ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় পাইকগাছা-কয়রা উপজেলায় সুপেয় পানির সংকট নিরাসনে ৩৯কোটি টাকার প্রকল্প অনুমোদন হয়েছে।
অনুমোদিত এ প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে রেইন ওয়াটার হারভেস্ট(ট্যাংকি), গভীর নলকূপ, ওয়াস ব্লকসহ নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন ব্যবস্থাপনা। পাইকগাছার জলাবদ্ধতা নিরসনে ১০ কোটি টাকা ব্যায়ে নাসিরপুর ৯ ও পোদা নদী ৭ কি:মি: খাল খননের কাজ শেষ হয়েছে।দেড় হাজার কোটি টাকা ব্যায়ে শালিখা হতে আমাদী পর্যন্ত ৩২ কি:মি: কপোতাক্ষ নদ খনন প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে। এ দিকে সংশ্লিষ্ট মৎস্য অধিদপ্তরের অভিযোগ বেশ কয়েকটি খাল খনন মুখ থুবড়ে পড়েছে। অভিযোগ কিছু চিংড়ি ঘের মালিক ও প্রভাবশালীদের প্রভাবে এরূপ হয়েছে।গত বছর থেকে দুই উপজেলায় লবন পানির চিংড়ি চাষ বিরোধী আন্দোলন জোরদার হয়েছে। সংসদ সদস্য আক্তারুজ্জামান বাবু এ নিয়ে দুই উপজেলার সমন্বয় কমিটির সভা সহ বিভিন্ন সভা সমাবেশে জোরালো বক্তব্য রেখেছেন। কতিপয় চিংড়ি ঘের মালিক বাদে এ বক্তব্যে ব্যাপক জনসমর্থন বেড়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় গড়ইখালী, দেলুটি, গদাইপুর, কপিলমুনি , চাঁদখালী , কয়রার আমাদী, মহেশ্বরীপুর , বাগালি সহ বিভিন্ন ইউনিয়নে রবি মৌসুমে ধান, তরমুজ সহ বিভিন্ন সবজি উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে। এলাকার মানুষ কৃষি বান্ধব সরকারের উন্নয়নের ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখার জোরালো দাবি রেখেছেন। সর্বশেষ আইলার ১৪ বছরে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে সুন্দরবন উপকূলীয় পাইকগাছা-কয়রার মানুষ। প্রাকৃতিক দূর্যোগ প্রশমনে তারা সরকারের সহযোগীতার পাশাপাশি জনসচেতনতা গড়ে তোলারও আহ্বান জানান।
