নিজস্ব প্রতিবেদক: চুয়াডাঙ্গায় ১২ কোটি টাকার স্বর্ণের চালান গায়েব নিয়ে আন্ডারওয়ার্ল্ডে তোল পাড় শুরু হয়েছে। বেরিয়ে আসছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। পাওয়া গেছে ভারতের গোল্ড মাফিয়া চৈতন্যর সংশ্লিষ্টতা।
সূত্র জনায়, চুয়াডাঙ্গা জেলার জীবননগর উপজেলার সীমান্তবর্তী গোয়ালপাড়া গ্রাম থেকে ৫ কেজি স্বর্ণ অত্মসাৎ ঘটনায় ৫ ব্যাক্তি অপহরণের ২৪ দিন পর যশোর জেলার ঝিকরগাছার কুল্লা গ্রামের একটি খামারবাড়ি থেকে চারজনকে উদ্ধার করেছে পুলিশ। এর পর বেরিয়ে আসছে নানা অজানা কাহিনী।
বুধবার (৫ নভেম্বর) ভোররাতে চুয়াডাঙ্গা জেলা পুলিশের গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) সাইবার ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন সেল ও পুলিশ সুপারের বিশেষ টিমের যৌথ অভিযানে তাদের উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় চার জনকে আটক করা হয়েছে। এর আগে গত ৪ (নভেম্বর) এই ঘটনার মামলায় হরিহরনগর গ্রাম থেকে আজিজুল হক (৪৫) ও আমিনুল ইসলাম (৩৭)-কে আটক করে পুলিশ। তাদের দেয়া তথ্যে পুলিশ বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে।
জীবননগর উপজেলার গোয়ালপাড়া (মাঠপাড়া) গ্রামের হাজারী মালের ছেলে শওকত আলী থানায় অভিযোগ করেন।
তিনি অভিযোগে উল্লেখ করেন, ৫ কেজি স্বর্ণ চোরাচালান আত্মসাতকে কেন্দ্র করে আসামি আব্দুল মজিদসহ একাধিক ব্যক্তি তার ছেলে ও অপর কয়েকজনকে অপহরণ করে নিয়ে গেছে । এ ঘটনায় ২১ অক্টোবর জীবননগর থানায় পেনাল কোডের ৪৪৭, ৩৬৪, ৫০৬ ও ৩৪ ধারায় মামলা (নং-০৮) দায়ের করা হয়।
পুলিশ জানিয়েছে, জীবননগরের গোয়ালপাড়া গ্রামের মাঠপাড়ার শওকত আলী (৫৩) তার ছেলেসহ কয়েকজনকে অপহরণের অভিযোগে থানায় মামলা দায়ের করেন। মামলায় উল্লেখ করা হয়, স্বর্ণ চোরাচালান ও আত্মসাতকে কেন্দ্র করে গত ১২ অক্টোবর সন্ধ্যায় জীবননগরের গোয়ালপাড়ার মাঠপাড়ার শফিকুল ইসলাম (৩৫) ও আনারুল ইসলামকে (৫০) অপহরণ করা হয়।
এর পরদিন সকালে গোয়ালপাড়ার ক্লাবপাড়ার হাসান মিয়া (২৬), আবুল হোসেন (২৭) ও স্বপন ইসলামকে (৪৪) অপহরণ করা হয়। ভারতের গোল্ড মাফিয়া চৈতন্যর নির্দেশে তাদেরকে অপহরণ করা হয় বলে সূত্রের দাবি।
মামলায় অভিযুক্ত আসামিরা হলেন-একই এলাকার আব্দুল মজিদ (৪০), মিজানুর রহমান রুবেল (৩০), লালন মন্ডল (৪২), আব্দুস সামাদ (৪৫), বিপ্লব হোসেন (৫০) ও শাহীনকে (৩২)।
চুয়াডাঙ্গা জেলার পুলিশ সুপার খন্দকার গোলাম মওলা’র সার্বিক দিকনির্দেশনায় সহকারী পুলিশ সুপার আনোয়ারুল কবীরের নেতৃত্বে বুধবার ভোরে ঝিকরগাছার কুল্লা গ্রামের রেজাউল ইসলামের খামারে অভিযান চালানো হয়।
অভিযানকালে পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে খামারের মালিক রেজাউল ইসলাম ও সহযোগী আব্দুল গফ্ফার পালিয়ে যায়। তবে ঘটনাস্থল থেকে বিল্লাল হোসেন (৪০), তার স্ত্রী সাগরিকা খাতুন (২৮), স্থানীয় গ্রাম্য চিকিৎসক বিকাশ দেবনাথ (৩০) এবং শফিকুল ইসলাম (৩৫) কে আটক করা হয়।
উদ্ধারকৃত অপহৃতদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানায়,গত ১২ অক্টোবর সকালে স্বর্ণ চোরাচালানের ৫০ পিস স্বর্ণের বার খোয়া যাওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে তাদের অপহরণ করা হয়। পরে যশোরের ঝিকরগাছায় ওই খামারে নিয়ে গিয়ে মধ্যযুগীয় কায়দায় নির্যাতন চালায় তারা। এর মধ্যে শফিকুল ইসলাম নামের ব্যাক্তির চারটি আঙুল কেটে দেওয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে চুয়াডাঙ্গার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জামাল আল নাসের প্রেস ব্রিফিংয়ে বলেন, প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে চক্রটি স্বর্ণ চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত। স্বর্ণ হারানোর ঘটনায় প্রতিশোধ নিতে ভিকটিমদের অপহরণ করে যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলায় নিয়ে বন্দি অবস্থায় অমানুবিক নির্যাতন চালায়। বিশেষ টিম গঠন করে অভিযান পরিচালনার মাধ্যমে তাদের জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। ঘটনার সঙ্গে জড়িত অন্যদের শনাক্ত করা হয়েছে এবং তাদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।
উল্লেখ্য, উপজেলার গোয়ালপাড়া গ্রামের পাঁচ কেজি স্বর্ণের চালান লোপাট হওয়াকে কেন্দ্র করে স্বর্ণ চোরাচালানিদের মধ্যে বিরোধ তৈরি হয়। এরই ধারাবাহিকতায় গত ১৩ অক্টোবর ও ১৪ অক্টোবর উপজেলার গোয়ালপাড়া গ্রাম থেকে মমিন হোসেনের ছেলে স্বপন (৪০), আতিয়ার রহমানের ছেলে আবুল হোসেন (৩০), আনার (৫২) ও তার ছেলে শফি (২৭) এবং শওকত আলীর ছেলে হাসান (২৮) নিখোঁজ হয়।
এরপর পরিবারের সদস্যরা তাদেরকে কোথাও খুঁজে না পেয়ে গত ২১ অক্টোবর শওকত আলী বাদী হয়ে জীবননগর থানায় ৬ জনের নাম উল্লেখ করে একটি মামলা দায়ের করেন। এদিকে চুয়াডাঙ্গার একটি সূত্র জানিয়েছে স্বর্ণের চালান লেপাট ঘটনার পর থেকে সীমান্তে বিজিবির এক সদস্য কর্মস্থলে অনুপস্থিত রয়েছে। এব্যাপারে স্থানীয় থানায় জিডিও হয়েছে। অন্যদিকে ওই সোনার চালানের হদিস না পাওয়ায় নানা প্রশ্নের উদ্রেক হয়েছে জনমনে।

