সোমবার, ১৬ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ৩রা ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ, ২৮শে শাবান, ১৪৪৭ হিজরি

ঝিকরগাছায় ক্লিনিকে সিজারিয়ান প্রসূতির মৃত্যু, দোষীদের শাস্তির দাবি

আরো খবর

আলমগীর হোসেন:

যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার বাঁকড়া বাজারের পাঁচরাস্তার মোড়ে ব্রিজ রোড সংলগ্ন বাঁকড়া মেডিকের সার্ভিসেসে সিজারিয়ান অপারেশনের পর সাবিকুন নাহার (৩১) নামের এক প্রসূতির মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় নিহতের স্বজনদের পক্ষ থেকে ভুল চিকিৎসার অভিযোগ তোলা হয়েছে। নিহত সাবিকুন নাহার উপজেলার বাঁকড়া ইউনিয়নের মাঠশিয়া উত্তরপাড়া গ্রামের আব্দুল্লাহ আল মামুনের স্ত্রী এবং মাঠশিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অফিস সহকারী ছিলেন।

নিহতের স্বামী আব্দুল্লাহ আল মামুনের দাবি, বুধবার (১১ ফেব্রুয়ারি) বাঁকড়া মেডিকের সার্ভিসেসের চিকিৎসক ডা. পল্লবী সাহাকে দিয়ে তার স্ত্রীর সিজারিয়ান অপারেশনের জন্য ১৫ হাজার টাকায় চুক্তিবদ্ধ হন এবং নগদ ৩ হাজার ৫০০ টাকা জমা দেন।

বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) সকালে সাবিকুন নাহার নিজ বাড়ি থেকে হেঁটে ভোটকেন্দ্রে গিয়ে ভোট দিয়ে আসেন। পরে ক্লিনিক থেকে ফোন করে জানানো হয়, ডাক্তার এসে গেছে রোগীকে দ্রুত নিয়ে আসতে হবে।

পরিবারের সদস্যরা ক্লিনিকে উপস্থিত হয়ে ক্লিনিক মালিককে না পেয়ে প্রসূতিকে ক্লিনিকে রেখে দেন। এ সময় তার স্বামী নিচে চায়ের দোকানে গেলে,  ওই ফাঁকে প্রসূতিকে অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে সিজারিয়ান অপারেশন করা হয় বলে স্বজনদের অভিযোগ।

পরে শিশুকে দেওয়ার মতো কাউকে খুঁজে না পেয়ে তাৎক্ষণিকভাবে আব্দুল্লাহ আল মামুনকে ফোন করে ডেকে এনে নবজাতক তার কোলে দেওয়া হয় এবং জানানো হয় রোগীর অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হচ্ছে, রক্ত প্রয়োজন।

তিনি জানান, এক ব্যাগ রক্ত দেওয়ার পরও স্ত্রীর অবস্থার অবনতি হলে তাকে খুলনায় রেফার করা হয়।

পরিবারের ধারণা, বাঁকড়া মেডিকের সার্ভিসেসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সামিরুল ইসলাম ও তার স্ত্রী, ক্লিনিকের ডেন্টিস্ট মোছা. নিলুফা ইয়াসমিন সিজারিয়ান অপারেশন করান এবং পরে দোষ এড়াতে রোগীকে খুলনায় পাঠানো হয়।

অনুসন্ধানে জানা যায়, বাঁকড়া মেডিকের সার্ভিসেসের পূর্বের নাম ছিল ‘বাঁকড়া সার্জিক্যাল ক্লিনিক অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার’। ২০২৩ সালের আগস্ট মাসে ‘ঝিকরগাছায় ক্লিনিকের মালিক ও দাদার ষড়যন্ত্রে প্রাণ হারালো প্রতিবন্ধী নবজাতক’ শিরোনামে বিভিন্ন পত্রিকা ও অনলাইনে সংবাদ প্রকাশিত হয়।

ওই ঘটনায় অভিযোগ ছিল, রোগীর কাগজপত্র ছাড়াই দ্রুত অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে ডেলিভারির চেষ্টা করা হয় এবং সে সময় কোনো চিকিৎসক উপস্থিত ছিলেন না। পরবর্তীতে প্রশাসনের হস্তক্ষেপে প্রতিষ্ঠানের নাম পরিবর্তন করে ‘বাঁকড়া মেডিকের সার্ভিসেস’ রাখা হয়।

নিহতের চাচী শাশুড়ি নাসরিন বেগম বলেন, “ওটিতে খুব নোংরা পরিবেশ ছিল, যেকোনো মানুষ আসা-যাওয়া করছিল। রোগীকে ওয়াশ করা হচ্ছিল এবং প্রচুর ব্লিডিং হচ্ছিল। একজনকে ডাক্তার মনে করে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন, তিনি ডাক্তার নন। ডাক্তার কোথায় জানতে চাইলে বলেন, ডাক্তার চলে গেছেন। পরে বলেন রোগীর কিটিক্যাল অবস্থা, খুলনা মেডিকেলে নিতে হবে।” তিনি আরও বলেন, খুলনা মেডিকেলে নেওয়ার পর চিকিৎসকরা জানান রোগীর অবস্থা ভালো নয়, যেকোনো সময় মৃত্যু হতে পারে।

পরিবারের দাবি, রোগীর জরায়ুসহ ‘ফুল’ কেটে ফেলা হয়েছে এবং প্রায় ১৯-২০ ব্যাগ রক্ত দেওয়া হয়েছে।

নিহতের ননদ ফারজানা আক্তার রিমি বলেন, “আমি গিয়ে দেখি ওখানে তারা পায়তারা করছে, রোগী কাঁপছিল। একজনকে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন তিনি ডাক্তার নন। ডাক্তার কোথায় জানতে চাইলে বলেন, ডাক্তার চলে গেছেন।”
আরেক ননদ শাহানারা বলেন, “ওখানে ডাক্তারও ছিল না, নার্সও ছিল না। নিজেদের গাফিলতির কারণে এমন ঘটনা ঘটেছে। আমরা বিচার চাই।”

এ বিষয়ে বাঁকড়া মেডিকের সার্ভিসেসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সামিরুল ইসলাম বলেন, “আমি কিছু বলতে চাই না। ওই সময় অপারেশন করেছেন সার্জন ডা. মেহেদী হাসান, তার সঙ্গে কথা বলুন।”

সার্জন ডা. মেহেদী হাসান বলেন, “আমি অপারেশন করেছি। এ সময় অন্য ডাক্তাররাও ছিলেন, কিন্তু অ্যানেস্থেসিয়া ডাক্তার ছিল না। অ্যানেস্থেসিয়া ডাক্তার ছাড়া আমার অপারেশন করা ঠিক হয়নি।”
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. আবদুর রশিদ বলেন, “ঘটনার বিষয়ে আমি অবগত ছিলাম না। যেহেতু বিষয়টি জানানো হয়েছে, তদন্তপূর্বক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”

এ ঘটনায়  স্বজনরা ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।

আরো পড়ুন

সর্বশেষ