শনিবার, ১৭ই জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ৩রা মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ, ২৮শে রজব, ১৪৪৭ হিজরি

নড়াইলে অর্থকরী পণ্য হয়ে উঠেছে পাটকাঠি, বছরে শতকোটি টাকার বেচাকেনা

আরো খবর

শাহরিয়ার কবীর টুকু, নড়াইল:
            নড়াইলের কৃষকেরা বংশানুক্রমে পাটের আবাদ করলেও পাঠকাঠির বহুল ব্যবহার ও মূল্য সম্পর্কে কোন ধারণা ছিলনা। তখন তাঁরা শুধু পাটের আঁশ ছাড়িয়ে বাজারে পাট বিক্রি করতেন। আর উৎপাদিত পাটকাঠি জ্বালানি ও বাড়ির বিভিন্ন গৃহস্থলির কাজে ব্যাবহার করতেন।
গত কয়েক বছর ধরে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন কোম্পানিতে কাঁচামাল হিসাবে পাটকাঠি ব্যবহার বেড়েছে। পানের বরজ, পার্টিকেল বোর্ড ও চারকোল কারখানায় পাটকাঠির ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। রাজধানী ঢাকাসহ বরিশাল, দাউদকান্দি, ভোলাসহ বিভিন্ন পারটেক্স বোর্ড কারখানা ও আকিজ গ্রুপের মতো বড় বড় কোম্পানিতে এ পাটকাঠি ব্যবহৃত হচ্ছে।
ফলে নড়াইলে বছরে প্রায় শতকোটি টাকার পাটকাঠি বেচাকেনা হয়। এছাড়া পাঠকাঠির ছাই (কার্বন পাউডার বা চারকোল) এখন চীন, মেক্সিকো, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, জার্মানি, তাইওয়ানসহ বেশ কয়েকটি দেশে ব্যাপক চাহিদা সৃষ্টি হয়েছে। তারা এই পাটকাঠির কার্বন থেকে কার্বন পেপার, কম্পিউটার ও ফটোকপিয়ারের কালি, আতশবাজি, ফেসওয়াশের উপকরণ, প্রসাধন পণ্য, মোবাইল ব্যাটারি, দাঁত মাজার ওষুধ, খেতের সারসহ অনেক ধরনের পণ্য তৈরি করছে। ফলে, নড়াইলের অর্থকরী পণ্য হয়ে উঠেছে একসময়ের ফেলনা পাটকাঠি।
  নড়াইলের লোহাগড়া, কালিয়া এবং সদর উপজেলার হাজারো কৃষক পাঠকাঠি বিক্রি করে লাভবান হচ্ছেন। গত কয়েক বছর ধরে জমি থেকে পাট কেটে পাটের আঁশ ছাড়িয়ে যতœ করে রেখে দেন পাটকাঠি। কৃষকেরা তাঁদের উৎপাদিত পাটকাঠি ছোট ও বড় দু’টি শ্রেনিতে ভাগ করে রাখেন। বড় গুলো কাউন হিসাবে বেশি দামে বিক্রি করেন, আর  ছোট পাটকাঠি কেজিতে বিক্রয় করেন। শুকনো মৌশুমে কৃষকদের সেই পাটকাঠি ব্যাবসায়ীরা বাড়ি থেকে নগদ টাকায় কিনে নিয়ে যান। জেলার কয়েক হাজার ক্ষুদ্র ব্যাবসায়ী গ্রামের কৃষকদের কাছ থেকে পাটকাঠি কিনে মজুদ করে বড় বড় ব্যাপারিদের কাছে বিক্রয় করেন।
 জেলার বিভিন্ন কৃষক ও কৃষি কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলে জানাগেছে, আকারে বড় পাটকাঠি কাউন হিসাবে এবং ছোটগুলো কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। স্থানীয়ভাবে সাধারনত ৪টিতে ১ গোন্ডা, ২০ গোন্ডায় এক পোন এবং ১৬ পোনে এক কাউন হয়। আর এক কাউন পাটকাঠি ১০০০ থেকে ১২০০ টাকা দরে বিক্রয় করেন স্থানীয়রা। কৃষকদের কাছ থেকে ছোট পাটকাঠি ৪শ’ টাকা দরে মন ক্রয় করছেন ব্যাপারিরা। এছাড়া ভালমানের ১০০ টি পাটকাঠির আঁটির মূল্য ৬শ’ থেকে ৭শ’ টাকায় বিক্রি হচ্ছে বলে জানালেন কৃষকেরা। আর এই কেনাবেচার সাথে সরাসরি জড়িত রয়েছেন অন্তত দশ হাজার মানুষ।
  নড়াইলের লোহাগড়া উপজেলার গাছবাড়িয়া গ্রামের বর্গাচাষি তাপস বিশ্বাস। পরের জমি বর্গা চাষ করেন। এ বছরও তিনি প্রায় তিন একর জমিতে পাটের আবাদ করেছিলেন। কয়েক বছর আগেও তাঁর জমির উৎপাদিত পাটকাঠির বাজারে তেমন কোন মূল্য ছিলনা। তখন তিনি পাটকাঠি গৃহস্থলির কাজে ব্যাবহার করতেন। এ বছর তাঁর উৎপাদিত পাটকাঠি থেকে গৃহস্থলির ব্যবহারের জন্য রেখে রেখে বাকিটা ২০ হাজার টাকা বিক্রি করেছেন।
 কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছর নড়াইল জেলায় ২৩ হাজার ৪ শ’ ৩০ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ হয়েছিল। জেলায় এ বছর এক লক্ষ চল্লিশ হাজার নয় শ’ পঁচাশি মেঃ টন পাটকাঠি উৎপাদন হয়েছে। যার বাজার মূল্য অন্তত এক শত পঁয়ত্রিশ কোটি টাকা। জেলায় যে পাটকাঠি উৎপাদন হয় তার প্রায় ৮০ থেকে ৮৫ ভাগ পাটকাঠি কৃষকেরা ব্যাবসায়ীদের কাছে বিক্রয় করেন। চলতি মৌশুমে এ জেলায় শত কোটি টাকার পাটকাঠি কেনাবেচা হবে বলে আশা সংশ্লিষ্টদের।
   কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, নড়াইল এর অতিরিক্ত উপ-পরিচালক, কৃষিবিদ মোঃ জাহিদুল ইসলাম বিশ্বাস বলেন, কয়েক বছর ধরে পাঠকাঠি বিভিন্ন শিল্পের কাঁচামাল হিসাবে ব্যাবহার করা হচ্ছে। এতে পাটকাঠির চাহিদা বেড়ে গেছে। কয়েকজন কৃষকের সাথে আলাপ করে জানাযায়, ভালোমানের এক কাউন পাটকাঠি ১২০০ টাকা এবং একমন পাটকাঠি ৪শ’ টাকা দরে বিক্রি করেন তাঁরা।
পাটকাঠি বিক্রি করে লাভবান হওয়ায়  নড়াইল জেলায় এখন প্রতিবছর পাটচাষ বৃদ্ধি পাচ্ছে। বর্তমানে কৃষকেরা তাঁদের উৎপাদিত পাঠকাঠি জ্বালানি হিসাবে আর ব্যাবহার করছেন না।

আরো পড়ুন

সর্বশেষ