রবিবার, ১৮ই জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ৪ঠা মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ, ২৯শে রজব, ১৪৪৭ হিজরি

নড়াইলে নবগঙ্গা নদী ভাঙনের কবলে অর্ধ শতাধিক বসত বাড়ি

আরো খবর

এনামুল কবীর টুকু, নড়াইল:
চলতি বর্ষা মওসুমে নবগঙ্গা নদীর ভাঙনের কবলে পড়েছে নড়াইলের কালিয়া উপজেলার নদী তীরবর্তী বেশ কয়েকটি গ্রাম। গত ১৫ দিনের অব্যাহত ভাঙ্গনে নদী গর্ভে চলে গেছে অর্ধশতাধিক বসত ভিটার কাঁচাপাকা ঘর, গাছপালাসহ বিভিন্ন স্থাপনা। অন্তত তিন শতাধিক বসতবাড়ি, পাঁকা রাস্তা, কবরস্থান, মসজিদসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ন স্থাপনা ভাঙনের আশংকায় রয়েছে। এতে উদ্বেগ ও আতঙ্কে রয়েছেন নদী পাড়ের বাসিন্দারা। ভাঙ্গনে সর্বত্র হারিয়ে নিজ গ্রাম ছেড়ে আশপাশের বিভিন্ন গ্রামে চলে যাচ্ছেন নদী পাড়ের মানুষ। প্রতিবছর বর্ষা মৌশুমের তিন মাস নবগঙ্গা নদী পাড়ের বাসিন্দারা তীব্র ভাঙ্গনের কবলে পড়েন। এবছরও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। সেপ্টেম্বর মাসের মাঝামাঝির দিকে কালিয়া উপজেলার বিষ্ণুপুর গ্রামে শুরু হয়েছে নবগঙ্গা নদীর তীব্র ভাঙ্গন। প্রতিদিনই নদী গর্ভে চলে যাচ্ছে নদী তীরবর্তী বিভিন্ন স্থাপনা।

 

সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, গ্রামের প্রায় এক কিলোমিটার জুড়ে ভাঙ্গছে নবগঙ্গা নদী। বিষ্ণপুর গ্রামের বৃদ্ধ এমদাদ মাষ্টার বলেন, ছোট বেলা থেকেই জীবনের বেশির ভাগ সময় নবগঙ্গা নদীর সাথে এক প্রকার যুদ্ধ করে বসবাস করছি। প্রতি বছরই সর্বনাশা নদী গিলে খেয়েছে আমার ফসলি জমি, বসত ভিটাসহ বিভিন্ন স্থাপনা। জীবনে আমি তিনটি বাড়ি নির্মান করলেও একটি বাড়িতে ও স্থায়ীভাবে বসত করতে পারিনি। প্রতিটি বাড়িই বিভিন্ন সময় নদী গর্ভে চলে গেছে।

জীবনের শেষ প্রান্তে এসে আমার জীবনের সকল উপার্জন দিয়ে যে বাড়িটি নির্মান করেছিলাম, ভিটা মাটিসহ সেটিও গত সপ্তাহে নদী গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। এখন আমি অসহায় হয়ে পড়েছি। পরিবারের সদস্যদের নিয়ে মাথাগোজার মত এক শতক জমিও আমার নেই। আক্ষেপের সাথে তিনি বলেন, জীবনের বাকি দিনগুলো হয়তো রাস্তার পাশে সরকারি জায়গায় অথবা খোলা আকাশের নিচে থাকতে হবে।

নদী ভাঙ্গনের তিক্ত অভিজ্ঞতা শুধু এমদাদ মাষ্টারের নয়। কালিয়া উপজেলার হাজারো বাসিন্দাদের কাছে নদী ভাঙ্গন একটি চিরচেনা বিষয়। প্রতিবছরই এই এলাকার মানুষকে ভাঙ্গনের কবলে পড়তে হয়। গত তিনসপ্তাহ ধরে একটু একটু করে ভাঙ্গছে নদী তীরবর্তী বিভিন্ন এলাকা। প্রতিদিনই নদী গর্ভে চলে যাচ্ছে ঘরবাড়িসহ বিভিন্ন স্থাপনা। গত দুই সপ্তাহের অব্যাহত ভাঙ্গনে বিলীন হয়েছে একই গ্রামের বিলু ফকির, জনি শেখ, মাহাবুর ফকির, মাকসুদ ফকির, রুকি বেগম, জহুর সরদার, শহিদুল মোল্লা, মহাদাদ শেখসহ অর্ধশত বসত ভিটা। আর ভাঙ্গনের ঝুঁকিতে রয়েছে খোকন মোল্লা, শাহাদাত সরদার, সাইফুল সরদার, কিবরিয়া শেখ, বিল্লাল সরদার, পারভেজ সরদার, আরিফ সরদার, সেতু মোল্লাসহ শত শত মানুষের ঘরবাড়ি, কবরস্থান, মসজিদ, পাঁকা রাস্থাসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা।

ক্ষতিগ্রস্ত মাকসুদ ফকির বলেন, বাড়িতে দু’টি থাকার ঘর, একটি গোয়াল ঘর ও একটি রান্নাঘর ছিল গাছপালা ভিটামাটিসহ সব নদীতে চলে গেছে। রুকি বেগম বলেন, আমার সাজানো সংসারের সব নদীতে নিয়ে গেছে কোন কিছু অবশিষ্ট নেই। নতুন করে বাড়ি করার মত কোন জমি আমার নেই। এখন কি করবো কিছুই বুঝতেছিনা।

বিষ্ণুপুর গ্রামের মুদি দোকানি আল আমিন সরদার বলেন, নদী আমার মুদি দোকানটা গিলে খেয়ে ফেলেছে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই দোকানসহ দোকানের সব মালামাল নদী গর্ভে চলে গেছে। ছেলে মেয়েদের নিয়ে এখন কি করবো কিছু বুঝতে পারছিনা। দোকানটা ছিল আমার একমাত্র উর্পাজনের উৎস। আর এক দোকানদার মিল্লাদ সরদার বলেন, চোখের পলকে আশপাশের বাড়ি ঘরসহ আমার দোকান নদীতে ভেঙ্গে গেল। শুধু চেয়ে চেয়ে দেখলাম। তখন আমাদের কারো কিছু করার ছিলনা।

খোকন মোল্লা বলেন, নদী ভাঙ্গতে ভাঙ্গতে বাড়ির পাশে চলে এসেছে যে কোন সময় আমার ভিটাটা নদীতে চলে যাবে, রাতে ঘুমাতে পারিনা। ছেলে মেয়ে নিয়ে নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছি আমরা। শাহাদাদ সরদার বলেন, প্রতি বছর নদী ভাঙ্গলেও আমাদের খোঁজ নেউ নেয়না।
ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার মানুষের অভিযোগ, বার বার ভোটের সময় জনপ্রতিনিধিরা নদী ভাঙ্গন রোধে স্থায়ী বাঁধ নির্মানের প্রতিশ্রুতি দিলেও সেটির বাস্তবায়ন হয়না।

 

বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (বাপাউবো) যশোর সার্কেলের তত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (অঃ দাঃ) মোঃ সাবিবুর রহমান বলেন, এরই মধ্যে আমি নিজে ভাঙ্গন কবলিত এলাকা সরেজমিনে পরিদর্শন করেছি। ভাঙ্গন রোধে জরুরী ভিত্তিতে জিয়োব্যাগ দিয়ে নদী ভাঙ্গন রোধে প্রাথমিক চেষ্টা করা হবে এবং ভাঙ্গনকবলিত এলাকায় স্থায়ী বাঁধ নির্মানের জন্য প্রকল্প তৈরী করে অনুমোদন সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।## ছবি আছে।

 

আরো পড়ুন

সর্বশেষ