বুধবার, ২৫শে মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ১১ই চৈত্র, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ, ৬ই শাওয়াল, ১৪৪৭ হিজরি

নোনা জলে ডুবছে সাতক্ষীরার আশাশুনি: জলবায়ুর থাবায় বিপন্ন কৃষি ও মৎস্য সম্পদ

আরো খবর

সাতক্ষীরা প্রতিনিধি:
সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলার দিগন্তজোড়া মাঠজুড়ে এখন ধূসরতার ছাপ। যে নদী ও খাল একসময় আশীর্বাদ ছিল, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সেই জলাশয়গুলোই এখন বিষিয়ে উঠছে অতিরিক্ত লবণে। দিন দিন কমছে জমির উর্বরতা, ব্যাহত হচ্ছে কৃষি উৎপাদন, আর হারিয়ে যাচ্ছে দেশি প্রজাতির মাছ। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিতে এই জনপদ এখন অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে।

 

মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট (এসআরডিআই) সূত্রে জানা গেছে, উপকূলীয় ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে জলবায়ু পরিবর্তনের চরম ঝুঁকিতে রয়েছে আশাশুনি। শুষ্ক মৌসুমে সমুদ্রের নোনা পানি অনায়াসেই ঢুকে পড়ছে নদ-নদীতে। সেই পানি খাল বেয়ে ছড়িয়ে পড়ছে ফসলি জমিতে।

 

বিজ্ঞানীরা বলছেন, লবণের প্রভাবে ‘রিভার্স অসমোসিস’ প্রক্রিয়ায় উদ্ভিদ মাটি থেকে পানি গ্রহণ করতে পারছে না, ফলে শুকিয়ে মরে যাচ্ছে ফসল। স্থানীয় কৃষকদের আক্ষেপ, ১০ বছর আগেও চিত্রটা এমন ছিল না। এখন লোনা পানির দাপটে আবাদি জমিগুলো স্থায়ীভাবে অনাবাদি হয়ে পড়ছে।

 

উপজেলার কয়েকজন কৃষকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল চরম সংকটের কথা। মাটিতে জৈব পদার্থ কমে যাওয়ায় ফসল ফলাতে মাত্রাতিরিক্ত রাসায়নিক সার ব্যবহার করতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন খরচ যেমন বাড়ছে, তেমনি দীর্ঘমেয়াদে জমির উর্বরতা হ্রাস পাচ্ছে।

 

বর্ষাকালে বৃষ্টিপাত কমে যাওয়ায় এখন পাট বা আমন চাষেও কৃত্রিম সেচ দিতে হচ্ছে। আবার মৌসুমের শেষে হুট করে অতিবৃষ্টি ও বন্যায় তলিয়ে যাচ্ছে মাঠ। উষ্ণায়নের ফলে শীত দেরিতে আসায় রবি শস্যের আবাদও পড়েছে হুমকির মুখে। “১০ বছর আগে পরিস্থিতি এমন ছিল না।

এখন জমিতে লোনা পানি ঢুকে সব নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। বাড়তি সার দিয়েও আগের মতো ফলন পাওয়া যাচ্ছে না।” প্রকৃতির মেজাজ বদলে যাওয়ায় বিপন্ন হয়ে পড়েছে জীববৈচিত্র্য। বৃষ্টির অভাবে ডিম ছাড়ার মৌসুমে খাল-বিলে পানি থাকছে না।

 

ফলে প্রজনন ব্যাহত হয়ে আশাশুনি থেকে এরই মধ্যে অন্তত ৩৫ প্রজাতির দেশি মাছ হারিয়ে গেছে। মাছের উৎপাদন কমে যাওয়ায় বেকার হয়ে পড়ছেন হাজারো জেলে। জলবায়ুর এই বিরূপ প্রভাবে কেবল কৃষি নয়, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে জনস্বাস্থ্য ও বাণিজ্যও।

লবণাক্ততা ও বিশুদ্ধ পানির অভাবে ডায়রিয়াসহ বিভিন্ন পানিবাহিত রোগের প্রকোপ বাড়ছে। শুষ্ক মৌসুমে নদীর নাব্যতা কমে চর জেগে ওঠায় নৌ-পথ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, ফলে স্থবির হয়ে পড়েছে স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্য। ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় তীব্র সুপেয় পানি সংকট দেখা দিচ্ছে।

 

 

পরিবেশবিদদের মতে, সিডর ও আইলার মতো ঘূর্ণিঝড়ের ক্ষত এখনো বয়ে বেড়ানো এই জনপদে টেকসই বাঁধ ও জলবায়ুসহিষ্ণু কৃষি পদ্ধতি প্রবর্তন না করলে অচিরেই এটি জনশূন্য এলাকায় পরিণত হতে পারে।

আরো পড়ুন

সর্বশেষ