ওহাবুজ্জামান ঝন্টু
সকাল থেকে অঝরে বৃস্টি হচ্ছে। শহরে জনসমাগম খুবই কম। বর্ষা মৌসুমের বিদায় প্রান্তে আজকের এই বৃস্টির ধারা যেনো আর্শীবাদ হয়ে এসেছে প্রাণীকুলে। বর্ষা নিয়ে অনেক গান,কবিতা এমন কি মাহা কাব্য রচনা হলেও এবারকার চিত্র ছিল একেবারে ভিন্ন। এক দিকে বৃস্টিহীনতা অপর দিকে প্রচন্ড গরমে অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে জনজীবন। দেরিতে হলেও সেই চিত্র পাল্টে গেছে। রুপ পরিবর্তন করে বর্ষার চেহারায় ফিরে এসছে প্রকৃতি। বৃস্টি নিয়ে এত কথা বলার উদ্দেশ্য হচ্ছে এই বৃস্টির ধারার সাথে আমার পরিবার জুড়ে রয়েছে ট্রাজেডি; একটি মর্মস্পর্শী কবিতা একটি মাহা প্র¯া’ানের কাব্য।
যাকে নিয়ে আজকের এই লেখা তিনি কেশবপুর উপজেলার ভালুকঘর ডিগ্রি ফাযিল মাদ্রাসার প্রয়াত ভাইস প্রিন্সিপাল মাওলানা আব্দুল হাই সিদ্দিকী। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি অত্র প্রতিষ্ঠানের ভার প্রাপ্ত প্রিন্সিপালের দায়িত্ব পালন করেছেন। মাত্র দু’বছর আগে এই দিনে তিনি এই সুন্দর পৃথিবী ছেড়ে চির বিদায় নেন। আজ যখন এই লেখাটা লিখছি বা লেখাটা যখন প্রকাশ হবে তখনও আপনার আমার মত বেছে ছিলেন তিনি। নিকট জনদের সাথে কথা বলছিলেন। তিনি আদেও টের পাননি বা পেলেও প্রকাশ করেননি আজরাইল (আঃ) তার দোয়ারে এসে কড়া নাড়ছেন। তিনি কেশবপুর হাসপাতালে আছরের নামাজ আদায় করে সংক্ষিপ্ত মোনাজাত করলেন। এটিই ছিল তার শেষ প্রার্থনা। মাগরিবের নামাজের পর ঈশার ওয়াক্তে তিনি যশোর ২৫০ শর্য্যা হাসপাতালের করোনারী কেয়ার ইউনিটে শেষ নিশ^াস ত্যাগ করেন(ইন্না লিল্লাহে ওয়াইন্না ইলাহী রাজিউন)
আব্দুল হাইয়ের লেখাপড়ার হাতে খড়ি ভালুঘর মাদ্রসায়। তখন প্রতিষ্ঠানটি ফোরকানিয়া ছিল। তাঁর পিতা মরহুম আল হাজ¦ রফিউদ্দিন দপ্তরী মাদ্রসার প্রতিষ্ঠাতা। ৬০ এর দশকে তিনি সুমুদ্র পথে হজে¦ যান এবং ফিরে এসে গ্রামের মুরুব্বিদের নিয়ে মাদ্রসাটি তৈরি করেন। এলাকার এমন কোন পরিবার নেই যারা এই মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠায় সহযোগিতা করেননি। তাদের সকলের অব্যাহত অবদানে প্রতিষ্ঠনটি এখন ডিগ্রি পর্যায়ে উন্নিত হয়েছে। বর্তমানে সেখানে কর্মরত আছেন ৩২ জন শিক্ষক কর্মচারী। তাদের মধ্যে কয়েকজন প্রতিষ্ঠান নিয়ে গুটি চালাচালি করছেন।
মাদ্রাসাটি প্রথম দাখিল মজ্ঞুরির সময় চরম বিপাকে পড়েন কর্তৃপক্ষ। ৩ জন বাদে সব ছাত্র চলে যান কেশবপুর আলীয়া মাদ্রসায়। এঅবস্থায় পিতার গড়া মাদ্রসায় থেকে যান আব্দুল হাইসহ আরো ২ জন ছাত্র। দাখিল(এসএসসি)পরীক্ষায় তারা সুনামের সাথে পাশ করায় প্রতিষ্ঠানটি এমপিও ভুক্ত হয়। এরপর আলিম (এইচ এস সি) পরীক্ষায়ও তিনি এই প্রতিষ্ঠান থেকে দ্বিতীয় বিভাগে উত্তীর্ণ হন। পরবর্তিতে কেশবপুর আলীয়া মাদ্রসা থেকে ৩ বিষয়ে কামিল,সরকারি মাইকেল মধুসূদন কলেজ থেকে দ্বিতীয় বিভাগে ডিগ্রি এবং দৌলতপুর বিএল কলেজ থেকে প্রথম শ্রেনিতে এম এ পাশ করেন। উচ্চতর ডিগ্রি থাকার সুবাদে বিভিন্ন নামি-দামি প্রতিষ্ঠান থেকে চাকরির অফার আসে। কিন্তু তিনি তা উপেক্ষা করে পিতার গড়া মাদ্রসায় কর্মজীবন শুরু করেন। আশা ছিল পিতার স্বপ্ন বাস্তবায়ন। কিন্তু পরশ্রিকাতর এবং দুষ্ট চক্রের রোষানালে পড়ে বেশি দুর এগিয়ে নিয়ে যেতে পারেননি তিনি। যখনি তিনি এগিয়ে যাওয়ার চেস্টা করেছেন তখনি তাকে শুকুনের মত খামছে ধরা হয়েছে। এই শুকুনের দল এতটাই নির্লিপ্ত ছিল যে ভাইস প্রিন্সিúালের শুন্য পদে তার নিয়োগ পেতে ১৩ বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে। ১৮ বার প্রত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি এবং ৩ বার বোর্ড গঠন করা হয়। প্রত্যেকবার আব্দুল হাই প্রথম হলেও তাকে নিয়োগ দেয়া হয়নি। বরং নিয়োগ সংক্রান্ত বিভিন্ন মামলা পরিচালনা করতে তার পৈত্রিক সম্পদ নষ্ট করতে হয়েছে। শেষ পর্যন্ত এলাকাবাসীর তীব্র আন্দোলনের মুখে ভাইস প্রিন্সিপাল পদে নিয়োগ বোর্ড করতে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ। মেধা তালিকায় তিনি প্রথম হয়ে ভাইস প্রিন্সিপাল নিয়োগ পেলেও সেই শুকুনের দলকে দিতে হয় পাঁচ লক্ষাধিক টাকা। নিয়োগ সংক্রান্ত বিভিন্ন ধনের মামলা পরিচালনায় তাকে আরো ৮/৯ লাখ টাকা গুনতে হয়। প্রতিষ্ঠান থেকে এই টাকা দেয়ার কথা থাকলেও তাকে একটি পয়সাও দেয়া হয়নি। এইভাবে পদে পদে তাঁকে অযাথা হয়রানি করা হয়েছে। এই হয়রানির নেপথ্যের কারণ খুজতে গিয়ে জানা গেছে, আব্দুল হাইয়ের সরলতা,সততা এবং নিরপেক্ষতা। যারা পর্দার আড়ালে থেকে এই প্রতিষ্ঠানে কলকাঠি নাড়েন তারা সকলেই উগ্র মৌলবাদ ধর্ম ব্যবসায়ী। এক কথায় স্বধনীনতা বিরোধী চক্র। যাদেরকে আব্দুল হাই কখনও পছন্দ করতেন না। তবে এত কিছুর পরও তাকে থামিয়ে রাখা যায়নি। তিনি ছাত্র জীবনে যেমন ছিলেন শিক্ষকদের প্রিয় তেমনি কর্মজীবনে এসে সকল শিক্ষার্থীর প্রিয় শিক্ষক হয়ে ওঠেন। প্রিয় ছাত্র থেকে হয়ে যান প্রিয় ভাইসপ্রিন্সিপাল/ভারপ্রাপ্ত প্রিন্সিপাল। আর আব্দুল হাই থেকে হয়ে যান মাওলানা সাহেব। ছাত্র জীবন থেকে মসজিদ ঈদগাহে ইমামতি এবং পরবর্তিতে কেন্দ্রীয় মসজিদের খতিবের দায়িত্ব পান। করোনাকালীন শেষ জুম্মা এবং ঈদের নামাজও তিনি পড়িয়েছেন। মসলা মাসায়েল,ইতিহাস,ঐতিয্য এবং ধর্ম তত্ত্বে জ্ঞান সমৃদ্ধ আব্দুল হাই ছিলেন,সদালাপি,ধার্মিক এবং বন্ধুবৎসল।
খুবই অল্প সময় আব্দুল হাই মাদ্রসার ভারপ্রাপ্ত প্রিন্সিপালের দায়িত্ব পেয়েছিলেন। এসময় মাদ্রসায় একডেমিকসহ সার্বিক ক্ষেত্রে আমুল পরিবর্তন হয়। দাখিল ও আলিমের রেজাল্টে সন্তোষ প্রকাশ করে প্রশাসন থেকে থ্যাংস লিটার দেয়া হয়। শিক্ষার সুষ্ঠ পরিবেশ নিশ্চিত করতে কমিটির সহযোগিতায় মাদ্রসার প্রত্যেকটা রুমে বৈদ্যুতি পাখা,চেয়ার,বেঞ্চ ও আলমারি ব্যবস্থা করেন তিনি। শিক্ষক শিক্ষার্থীদের যথা সময় উপস্থিতি এবং জাতীয় পতকা উত্তোলন ও জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশেনর ব্যবস্থা করা হয়। সব মিলে মাদ্রসায় শিক্ষা ও উন্নয়নমুখী নতুন পরিবেশ তৈরী করেন তিনি। কিন্তু আকর্ষিক তাঁর মৃত্যুতে সব কিছু পাল্টে গেছে। পুর্বের চেহারায় ফিরে যাচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। মাথা চাড়া দিয়ে ওঠেছে সেই উগ্রবাদি শুকুনের দল। তারা খোলস ছেড়ে বের হয়ে জোট বেধে নানা তৎপরতায় লিপ্ত হয়েছে। সম্প্রতি গর্ভণিং বডি গঠন নিয়ে ঘটেছে তুল কালাম কান্ড। জাল জালিয়াতি এবং তঞ্চকতার আশ্রয় নিয়ে কয়েক জন বিতর্কিত ব্যক্তিকে কমিাটর সদস্য করা হয়েছে। অবমাননা করা হয়েছে এমপি সাহেবের ডিও লিটার।যাদের কমিটিতে আনা হয়েছে তার মধ্যে দুজন জামায়াতের সক্রিয় সদস্য, অপর একজন বহুবির্তকিত ও চেক জালিয়াতি মামলার আসমি। টি আর সহস্য দুজনের মধ্যে একজন জাল সাটিফিকেটে নিয়োগ নিয়েছেন এবং অপর জনের বিরুদ্ধে ছাত্রীর সাথে ইভটিজিং করার অভিযোগ রয়েছে। টিআর প্রতিনিধি নির্বাচনের ক্ষেত্রে মহসীন কবির ও মোশারফ হোসেনর নাম ছিল না। সর্বসম্মতি ক্রমে টিআর নির্বাচিত হন মুজিবুর রহমান ও রাকিবুল হাসান রানা। পরে কিভাবে তাদের নাম পাল্টানো হলো তা কেউ জানে না। শিক্ষার্থীরা যাদের কাছ থেকে শিক্ষা নিয়ে জীবন আলোকিত করবে তাদের চরিত্র যদি এমন কুপ্রবিৃত্তির হয় তা হলে তাদের কাছ থেকে কি শিখবে আমদের ছেলেরা এমন কথা এখন এলাকাবাসীর মুখে মুখে। মাওলানা আব্দুল হাইয়ের মৃত্যুবার্ষিকী সামনে রেখে এসব প্রশ্ন আরো জোরালো হয়ে উঠছে। কেউ কেউ বলছেন তারা কি শিক্ষক না শিক্ষক নামের কলংক। তাদের কি মৃত্যুর ভয় নেই?
শিক্ষকদের বলা হয় জাতির মেরুদন্ড। মানুষ গড়ার কারিগর। কিন্ত যারা সত্যিকে মিথ্যা আর মিথ্যাকে সত্যি বানিয়ে ব্যক্তি স্বার্থ হাসিল করতে চায় প্রকৃত পক্ষে তাদের নামের আগে কোন বিশেষণ বসবে?
যারা মরহুম হাজী রফিউদ্দিনের স্বপ্ন এবং মাওলানা আব্দুল হাইয়ের নাম মুছে ফেলার চেস্টা করছেন তারা কি জানেন না সত্য সত্যই; সত্য কখনও মরে না, তাকে ঠকনোও যাবেনা। মিথ্যা দিয়ে সাময়িক পরিতৃপ্তি পাওয়া যেতে পারে তা কখনও আনাবিল বা অনন্ত সুখ এনে দিতে পারে না। যে প্রতিষ্ঠানে মাওলানা আবুল হাই শিশু,কিশোর,যৌবন এবং কর্ম জীবনের শ্রেষ্ঠ সময় দিয়ে তিল তিল করে গড়ে রেখে গেছেন সেই প্রতিষ্ঠান কোন ব্যক্তি বিশেষের দ্বারা অপবিত্র হোক তা এলাকাবাসী মেনে নেবে না।
শোকের মাস আগস্ট, এই মাসের ৪র্থ দিনে নেমে আসে আমাদের পরিবারে ট্রাজেডি। আদাদের সকলকে কাঁদিয়ে চির নিদ্রায় শায়িত হন পরম শ্রদ্বীয় বড় ভাই হযরত মাওলানা আব্দুল হাই সিদ্দিকী। সেদিনও ছিল অঝর ধারা বৃস্টি। বিজ্ঞজনরা বলেছিলেন, এতে মন খারাপের কিছু নেই; এটি রহমতের বর্ষন। মাওলানা আব্দুল হাই আজ আমদের মাঝে নাই। আর কোন দিনও আসবেও না। অনেকে হয়ত এই প্রতিষ্ঠানে আসবেন যাবেন। কিন্ত এমন আব্দুল হাই সিদ্দিকীকে আর কখনও পাওয়া যাবেনা। আজকের এই দিনে আমরা তাঁর আতœাআর মাগফিরাত কামনা করছি। আল্লাহপাক তাকে জান্নাতুল ফেরদৌস নসীব করুন। আমিন।##

