একাত্তর ডেস্ক:রাজধানী ঢাকাসহ দেশ জুড়ে পুরো বছরে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড অনেকটাই নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ে। অপহরণ, ছিনতাই, ডাকাতি, চুরি, ধর্ষণের ঘটনা প্রকাশ্যেই ঘটেছে। মব সহিংসতা তৈরি নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পাশাপাশি বিভিন্ন গুজব ছড়িয়ে গণপিটুনি এবং পুড়িয়ে মানুষ হত্যার ঘটনায় ভীতি তৈরি হয়েছে।
পাশাপাশি টার্গেট কিলিং ছিল আলোচনার শীর্ষে। এর পাশাপাশি শীর্ষ সন্ত্রাসীদের পুরোনো মাঠ দখলের খেলায় দিনে দুপুরে টার্গেট কিলিং সারা দেশে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাঠে প্রার্থীদের মধ্যে খুনোখুনির ঘটনাও দেশ ছাপিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সমালোচিত হয়। বছর শেষ হয়েছে জুলাই যোদ্ধা, ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ও জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সম্ভাব্য প্রার্থী শরিফ ওসমান হাদিকে টার্গেট করে হত্যার মধ্য দিয়ে।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্য বলছে, ২০২৫ সালে মানবাধিকার পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে দেখা যায় যে, রাজনৈতিক সহিংসতায় মৃত্যু, গণপিটুনিতে নির্যাতন ও হত্যা, নারী নিপীড়ন ও ধর্ষণ, শিশু নির্যাতন এবং সাংবাদিকদের ওপর হামলা বৃদ্ধি পেয়েছে। বাকস্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে ও নির্যাতনে মৃত্যু, শ্রমিকদের উপর হামলা, সংখ্যালঘু নির্যাতন, মাজারে হামলা ও ভাঙচুর, কারাগারে মৃত্যু, সভা-সমাবেশে বাধা প্রদান, আন্দোলনরত বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের উপর পুলিশের হামলার মতো ঘটনা ঘটেছে। এসময়ে চাঁদাবাজি, চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি ও হত্যাসহ বেশ কিছু সামাজিক অপরাধ ঘটেছে যা জনমনে ভয় ও আতঙ্ক তৈরি করেছে।
পুলিশের অপরাধ পরিসংখ্যান বলছে, জানুয়ারি থেকে শুরু করে নভেম্বর মাস পর্যন্ত সারা দেশে ৩ হাজার ৫২৭টি হত্যাকাণ্ডের মামলা হয়েছে। হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মেট্রোপলিটন শহরের মধ্যে ঢাকায় সবচেয়ে বেশি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। ঢাকার পরই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটনের বেশি ঘটেছে। বিভাগীয় পর্যায়ে ঢাকা বিভাগে হত্যার ঘটনা সবচেয়ে বেশি। ঢাকার পরই হত্যার ঘটনায় চট্টগ্রাম বিভাগের অবস্থান দ্বিতীয় পর্যায়ে। পুলিশের অপরাধ পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, চলতি বছর গড়ে ১১ জনের বেশি খুন হয়েছে সারা দেশে। প্রতি মাসে সাড়ে ৩০০ হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এসব হত্যাকাণ্ডের মধ্যে আলোচিত বেশকিছু ঘটনা ছিল।
আলোচিত হত্যাকাণ্ড: গত ১২ ডিসেম্বর রাজধানীর কালভার্ট রোডে হত্যার টার্গেটে ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র এবং ঢাকা ৮ আসন থেকে সংসদ সদস্য প্রার্থী হিসেবে প্রচারণা চালানো জুলাই যুদ্ধা শরিফ ওসমান হাদিকে গুলি করা হয়। মাথায় গুলিবিদ্ধ ওসমান হাদি চিকিৎসাধীন অবস্থায় সিংগাপুরে মারা যায়। ওসমান হাদির কিলিং মিশনে অংশ নেওয়া ছাত্রলীগ নেতা ফয়সাল করিম দাউদ ওরফে মাসুদ এবং স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা আলমগীর শেখকে এখনো গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ। তবে এ ঘটনায় ১২ জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। ওসমান হাদিকে হত্যার ঘটনায় দেশ-বিদেশে ব্যাপক আলোড়ন তৈরি হয়েছে।
গত ১৮ ডিসেম্বর ময়মনসিংহের ভালুকায় একটি কারখানার অনুষ্ঠানে ইসলাম সম্পর্কে অবমাননাকর মন্তব্য করার কথিত অভিযোগে দীপু চন্দ্র দাস নামক এক সনাতন ধর্মাবলম্বী যুবককে নির্মমভাবে প্রহার, গাছে ঝুলিয়ে এবং দগ্ধ করে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় মামলা দায়েরের পর পুলিশ কয়েক জনকে গ্রেফতার করেছে।
গত ৯ অক্টোবর খুলনার দৌলতপুর থানা যুবদলের সাবেক নেতা মোল্লা মাহবুবুর রহমানকে প্রকাশ্য দিবালোকে গুলি করে হত্যা করা হয়। একই দিন রাজধানীর স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজ মিটফোর্ড হাসপাতালের ৩ নম্বর গেটের সামনে চোরাই তারের ব্যবসার নিয়ন্ত্রণকে ঘিরে এবং পূর্ব বিরোধের জেরে মো. সোহাগ চান নামে এক ভাঙারি ব্যবসায়ীকে পাথর দিয়ে মাথায় আঘাত করে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে।
১০ নভেম্বর প্রায় ২৯ বছর আগের একটি হত্যা মামলায় ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-২ এ হাজিরা দিতে যান তারিক সাইফ মামুন। ফেরার পথে বেলা ১১টার দিকে আদালতপাড়ার কাছে ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের সামনে অস্ত্রধারী দুই দুর্বৃত্ত প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করে তাকে।
১৫ নভেম্বর লক্ষ্মীপুরের চন্দ্রগঞ্জের পশ্চিম লতিফপুর এলাকায় ওয়ার্ড বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আবুল কালামকে গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। ১৭ নভেম্বর পল্লবীতে একটি হার্ডওয়্যারের দোকানে প্রবেশ করে মুখোশ ও হেলমেট পরা সন্ত্রাসীরা গুলি করে হত্যা করে পল্লবী থানা যুবদলের সদস্য সচিব গোলাম কিবরিয়াকে। আগের মাসে চট্টগ্রামে চলন্ত প্রাইভেটকার থামিয়ে প্রকাশ্যে দিনদুপুরে বিএনপি সমর্থিত এক ব্যবসায়ীকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এসব হত্যাকাণ্ডে আন্ডারওয়ার্ল্ডের আধিপত্য রয়েছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
‘মব জাস্টিস’ এর নামে গণপিটুনি: ১৮ মার্চ রাত ১১টার দিকে রাজধানীর খিলক্ষেত এলাকায় ধর্ষণের অভিযোগে ‘মব’ তৈরি করে গণপিটুনি দেওয়া হয় এক কিশোরকে।
২৮ ফেব্রুয়ারি রাতে চট্টগ্রামের পতেঙ্গা থানা এলাকার আউটার রিং রোডে ‘ভুয়া পুলিশ’ অপবাদ দিয়ে এসআই ইউসুফ আলীকে মারধর শুরু করেন। রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় গত ৪ মার্চ দিনদুপুরে মব সৃষ্টি করে আক্রমণের সময় ছিনতাইকারী সন্দেহে দুই ইরানি নাগরিকের ওপর হামলা ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে।
চরমপন্থিদের উত্থান: ২১ ফেব্রুয়ারি ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলার রামচন্দ্রপুর গ্রামের শ্মশানঘাট মাঠে চরমপন্থি দুই গ্রুপের মধ্যে গোলাগুলিতে পূর্ববাংলা কমিউনিস্ট পার্টির সাবেক শীর্ষ নেতা, একাধিক হত্যা, চাঁদাবাজি ও ডাকাতি মামলার আসামি হানিফসহ (৫০) তিনজনকে হত্যা করা। হত্যার বিষয়ে চরমপন্থি সংগঠন জাসদ গণবাহিনীর নেতা কালু দায় স্বীকার করে গণমাধ্যমকর্মীদের হোয়াটসঅ্যাপে খুদে বার্তা পাঠান।
গ্রেফতার হয় শীর্ষ সন্ত্রাসী সুব্রত বাইন: ২৭ মে ভোরে কুষ্টিয়া শহরের কালীশংকরপুর এলাকায় তিন ঘণ্টার এক শ্বাসরুদ্ধকর অভিযানে তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী সুব্রত বাইন ওরফে ফতেহ আলী ও তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী মোল্লা মাসুদ ওরফে আবু রাসেল মাসুদকে আটক করে সেনাবাহিনী।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, জুলাই-বিপ্লবের পর দেশে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে পুলিশ এখনো সক্রিয় হতে পারেনি। এর অন্যতম কারণ পুলিশের মনোবলে দুর্বলতা। দ্বিতীয় কারণ, পুলিশ আগে যেভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারত এখন সেভাবে সিদ্ধান্ত নিতে না পারা। এ পরিস্থিতিতে আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশকে রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে সহযোগিতা করতে হবে।
সূত্র:ইত্তেফাক

