শাহাজান শাকিল/ আরিফুল ইসলাম আরিফ, মণিরামপুর :
একসময় ভবদহ মানেই ছিল জলাবদ্ধতা, কর্মহীনতা আর দীর্ঘশ্বাসের গল্প। বছরের পর বছর পানিবন্দী অবস্থায় মানুষের জীবনে নেমে এসেছিল সীমাহীন দুঃখ। তবে সেই দুঃখের ভেতরেই আজ জন্ম নিচ্ছে কিছুটা প্রশান্তি। বর্ষা মৌসুমে ভবদহ অঞ্চলের জলাভূমি, বিল ও খাল থেকে শামুক সংগ্রহ করে জীবিকা নির্বাহের নতুন পথ খুঁজে পেয়েছে যশোরের মণিরামপুর উপজেলার শতশত নি¤œ ও মধ্যবিত্ত পরিবার।
একসময় গ্রামের হাতে গোনা এক-দুই জন মানুষ শামুক কুড়িয়ে জীবন চালালেও এখন এটি ভবদহ অঞ্চলের মানুষের আয়ের অন্যতম উৎসে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে যশোরের অভয়নগর, মণিরামপুর ও কেশবপুর উপজেলা এবং পার্শ্ববর্তী এলাকায় মাছের ঘেরে উৎকৃষ্ট খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে শামুকের ভেতরের শাঁস। এই শামুক ভেঙে শাঁস বিক্রি করে সংসারের হাল ধরছেন অসংখ্য মানুষ।
সরেজমিনে দেখা গেছে, মণিরামপুর উপজেলার ঢাকুরিয়া, হরিদাসকাঠি, দূর্বডাঙ্গা, নেহালপুর, কুলটিয়া, শ্যামকুড় ও মনোহরপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় প্রতিদিন শত শত বস্তা শামুক কেনাবেচা হচ্ছে। জ্যান্ত শামুক প্রতি কেজি ১০ থেকে ১২ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আর শামুক ভেঙে ভেতরের শাঁস প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে প্রায় ২৫ টাকায়। এতে করে পানিবন্দী এলাকার মানুষজন প্রতিদিন গড়ে ৫০০ থেকে এক হাজার টাকা পর্যন্ত আয় করতে পারছেন।
স্থানীয়রা জানান, ছোট ছোট নৌকায় করে উপজেলার বিভিন্ন বিল, খাল ও ধানের ক্ষেত থেকে শামুক কুড়িয়ে আনা হচ্ছে। একজন শ্রমিক দিনে গড়ে ৩ থেকে ৪ বস্তা শামুক সংগ্রহ করতে পারেন। মাছের ঘের, বিলের পাড় এবং বিলসংলগ্ন সড়কের পাশে এসব শামুক কেনাবেচা করা হয়। পরে স্থানীয় পাইকারেরা শামুক সংগ্রহ করে বস্তাবন্দী করেন।
হরিদাসকাঠি ইউনিয়নের ঘের ব্যবসায়ী বিদ্যুৎ বলেন,আমার অধীনে সাত-আটজন লোক বিলে শামুক কুড়ান। আমি আস্ত শামুক প্রতি কেজি ১২ টাকায় কিনি। মাছের খাবার উপযোগী করতে শামুক ভাঙার জন্য প্রতি কেজিতে ২ টাকা মজুরি দিই। প্রতিদিন গড়ে ৪০০ থেকে ৪৫০ কেজি শামুক কেনা হয়। যারা আমার কাছে শামুক বিক্রি করেন, তারা একেকজন দৈনিক ৫০ থেকে ৬০ কেজি শামুক বিক্রি করে ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা আয় করেন।
হাজিহাট এলাকার ব্যবসায়ী রবিন দাস জানান, এসব শামুক ট্রাকে করে খুলনা জেলার বিভিন্ন চিংড়ি ঘের মালিকদের কাছে পাঠানো হয়। তারা এগুলো প্রক্রিয়াজাত করে চিংড়ির খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করেন।তিনি বলেন, বর্ষা মৌসুমে এলাকায় তেমন কাজ না থাকায় শামুকের বাণিজ্য আমাদের বাঁচার পথ হয়ে উঠেছে।
স্থানীয়দের মতে, শামুক সংগ্রহে তেমন কোনো পুঁজি লাগে না। ফলে বিনা পুঁজিতে অনেক মানুষ জলাশয় থেকে শামুক কুড়িয়ে সংসারের বাড়তি আয় করছেন। দীর্ঘদিনের দুঃখ আর জলাবদ্ধতায় জর্জরিত ভবদহ অঞ্চলের মানুষের জীবনে তাই শামুকের এই বাণিজ্য এনে দিয়েছে অন্তত কিছুটা স্বস্তি ও প্রশান্তি।

