নিজস্ব প্রতিবেদক: ভবদহ পানি নিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটির দাবি পানি উন্নয়ন বোর্ড, ঠিকাদার ও ঘের মালিক সিন্ডিকেটের ষড়যন্ত্রে ভবদহ স্লুইচ গেট থেকে ৬০ কিলোমিটার নদী হত্যা করা হয়েছে।
ফলে যশোর ক্যান্টনমেন্ট থেকে বারোয়াড়িয়া মোহনা পর্যন্ত যশোর-খুলনা-সাতক্ষীরা জেলাধীন নদী অববাহিকার ১০০ কিলোমিটার জনপদের চার শতাধিক গ্রাম, হাট বাজার, রাস্তাঘাট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মসজিদ-মন্দির, বাড়িঘর, আবাদ ফসল স্থায়ী জলাবদ্ধতার শিকার হতে চলেছে।
গত ২৬ মে ভবদহ পানি নিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটির নেতৃবৃন্দ নদী পরিদর্শনকালে সেই ভয়াবহ চিত্র উঠে আসে। তা হলো- ভবদহ স্লুইচ গেটের ২১ ভেন্টে ৫০ মিটার সামনে নদীর মাঝে গভীরতা ৩ ফুট, ১০০ মিটার সামনে ৪ ফুট, ৯ ভেন্টের সামনে ৩ ফুট, দোহাকোলায় ২ ফুট, নদীর প্রশস্ততা ১২ ফুট, শোলগাতিয়া ব্রিজে ১ ফুট নদীর প্রশস্ততা ২০ ফুট, খর্ণিয়া ব্রিজে ২.৫ ফুট, নদীর প্রশস্ততা ব্রিজের নিচে ৪৮ ফুট, গ্যাংরাইল নদীর উপর শিবনগর ব্রিজে নদীর প্রশস্ততা ৪৮ ফুট, সেখানে গভীরতা ১০ ফুট। বারোয়াড়িয়া ৪ নদীর মোহনায় ভাটির সময় ধু-ধু চর জেগে ওঠে। মানুষ নদীর মাঝে সুন্দরবন থেকে ভেসে আসা কাঠ কুড়াতে যায়। এক সময় যে মোহনায় ছিল অতল গভীরতা।
৭ বছর আগে আমরা ওখানের গভীরভাবে দেখেছি ২০০ ফুটের মত। বারোয়াড়িয়া মোহনায় ৪টি নদী একটি ভদ্রা গেছে রূপসায়, হাবরখানা নদী গেছে শিবসায়, জিরাবুনিয়া নদী কপোতাক্ষ হয়ে মিলিত হয়েছে শিবসায়, যেটির সংযোগ স্থান বর্তমানে বন্ধ করে রাখা হয়েছে। অপরটি গ্যাংরাইল নদী ভবদহ অঞ্চল থেকে মোহনায় মিশেছে। গ্যাংরাইল মোহনার মিলনস্থলে ভাটির সময় পানি থাকে ১০/১২ ফুট। সৃষ্ট পরিস্থিতির অবসান না হলে রূপসা-শিবসা নদী ও চালনা পোর্ট মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে চলে যাবে।
অপরদিকে, ভবদহ স্লুইচ গেট থেকে মোহনা পর্যন্ত নদী গর্ভে ৫টি সরকারি আবাসন প্রকল্প, ২৪/২৫টি ইটভাটাসহ নানা ধরনের স্থাপনা সরকারি নীতিমালা লঙ্ঘন করে স্থাপন করা হয়েছে। পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়, পানি উন্নয়ন বোর্ডের ভূমিকা নেই। জেলা প্রশাসকগণ নদী রক্ষা কমিশনের সভাপতি, নদী সম্পদ রক্ষা ও নদীর উপর ব্রিজ নির্মাণের ক্ষেত্রে বিআইডব্লিউটিএ’র নীতিমালার মান্যতা দেখার দায়িত্বে থাকলেও রহস্যজনকভাবে নিরবতা পালন করছেন। যা সরকার গৃহিত নীতিমালার পরিপন্থি এবং সরকারকেই প্রশ্নবিদ্ধ করছে। এক্ষেত্রে সরকার গৃহিত নদী তট আইন মানা হচ্ছে না। ওই চক্র আপনার ঘোষণা- ‘নদী বাঁচলে দেশ বাঁচবে’ এই ঘোষণা এই জনপদের মানুষের কাছে তামাশায় রূপান্তরিত করেছে।
রোববার বেলা সাড়ে বারোটায় জেলা প্রশাসকের কাছে দেয়া এক স্মারক লিপিতে এসব অভিযোহরা হয়। জেলা প্রশাসকের পক্ষে স্মারকলিপি গ্রহণ করেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মাসুদ আলম। এ সময় উপস্থিত ছিলেন ভবদহ পানি নিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটির প্রধান উপদেষ্টা ইকবাল কবির জাহিদ, আহ্বায়ক রনজিত বাওয়ালি, অধ্যাপক অনিল বিশ্বাস, তসলিমুর রহমান, পলাশ বিশ্বাস প্রমুখ।
স্মারক লিপিতে বলা হয় ভবদহ জনপদের পানিবন্দি মানুষের দীর্ঘ আন্দোলনের পর ১৯৯৮ সালে পানিসম্পদ মন্ত্রীর উপস্থিতিতে সরকার আয়োজিত এক কনভেনশনে নীতিগতভাবে পর্যায়ক্রমের বিলগুলোতে টি.আর.এম প্রকল্প গ্রহনের সিদ্ধান্ত হয়। সে সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ২০০২ সালে বিল কেদারিয়ায় এবং পরবর্তী বিল হিসাবে ২০০৬ সালে বিল খুকশিয়ায় টি.আর.এম এর সফলতায় স্রোতের ভরবেগ বৃদ্ধি পাওয়ায় দ্রুত নদীগর্ভের পলি কেটে কাট পয়েন্ট থেকে নদী ২৫/৩০ ফুট গভীর ও মোহনা সচল হয়েছিল। সরকার পরবর্তী নির্ধারিত বিল কপালিয়ায় টি.আর.এম কার্যকর করার উদ্যোগ গ্রহণ করে।
দুঃখজনক হলো- সরকারি দলের একাংশ সরকারবিরোধী, রাজনৈতিক শক্তির সাথে জোটবদ্ধ হয়ে সশস্ত্র আক্রমণে ২০১২ সালে হুইপ ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা আহত হন এবং সরকারি গাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া হয়। সরকার তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে টি.আর.এম প্রকল্প বাতিল করে দেয়। ফলে ওই চক্র ও সিন্ডিকেট স্থায়ী লুটপাটের সরকারি মদদ পেয়ে বসে।
জোয়ার-ভাটা নদী ব্যবস্থাপনা/ জোয়ারাধার (টিআরএম) অববাহিকার কার্যক্রম বন্ধ হওয়ার কারণে হরি নদীতে ব্যাপকহারে পলি সঞ্চয়ন হয়। মাঠ পর্যায়ের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায় যে, ফেব্রুয়ারি হতে এপ্রিলের মধ্যে হরি-তেলিগাতি নদীতে প্রায় ১২ লাখ টন হারে পলি জমা হয়। নিষ্কাশন ক্ষমতা বজায় রাখতে ও পলি ব্যবস্থাপনার উদ্দেশ্যে ৪০ বছর ধরে এই ৬টি বিল টিআরএম অববাহিকার কাজ করবে। হরি নদীতে পর্যায়ক্রমে জোয়ারাধার অববাহিকার ক্রিয়াকলাপ প্রস্তাব করার পেছনে কারণ হলো, বিদ্যমান ৬টি বিল প্রয়োজনীয় পরিমাণ জোয়ার-ভাটার প্রবাহ (টাইডাল প্রিজম) সৃষ্টি করতে সক্ষম। একইভাবে ভদ্রা নদীর উদ্ধাংশে, গ্যাংরাইল ও হামকুড়া নদীর যথাক্রমে ৪টি, ৫টি ও ৫টি বিল জোয়ারাধার হিসেবে ব্যবহার করে পর্যাপ্ত নিষ্কাশন ক্ষমতা বজায় রাখা সম্ভব হবে।”
টি.আর.এম প্রকল্প বাতিল করে উপরোক্ত সরকার ঘোষিত নীতিমালা অস্বীকার করা হয়েছে।
স্মারক লিপিতে নদী, প্রকৃতি ও জনপদকে রক্ষার জন্য আপনার দ্রুত হস্তক্ষেপে প্রস্তাবিত টিআরএম প্রকল্প চালু এবং
নদী হত্যা, সরকারি নীতিমালা লঙ্ঘনের সাথে জড়িত সংশ্লিষ্ট চক্রকে চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করার জন্য জোর দাবি জানানো হয়েছে।

