শুক্রবার, ১৬ই জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ২রা মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ, ২৭শে রজব, ১৪৪৭ হিজরি

মণিরামপুরের যাত্রা শিল্পের ঐতিয্য এখন রুপ কথার গল্প

আরো খবর

 সুমন চক্রবর্তী মণিরামপুর:গ্রাম বাংলার ঐতিহ্য সাংস্কৃতিক বিনেদোন পিপাসুদের মূল আকর্ষণ যাত্রা শিল্প।এক সময় গ্রামের মাঠে বিভিন্ন মেলার দর্শনার্তীদের মূল আকর্ষণ ছিলো যাত্রা পালা। আজ কালের বিবর্তনে সেই সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য বিলুপ্তপ্রায় যে কারনে  আর দেখা মেলে না যাত্রা পালা। যাত্রা পালা নামটি এখন নতুন প্রজন্মের নিকট রূপকথার গল্প নামক কিছু শব্দ।

গ্রাম বাংলার বিনেদোন পিপাসুদের  হারানো ঐতিহ্য  যাত্রা পালা নামটি নতুন প্রজন্মের নিকট রূপকথার গল্পের কোন বিষয় বস্তু না এটা একসময়ের বিনোদনের মূল আকর্ষণ ছিলো। আর সেই হারানো ঐতিহ্য কে তুলে ধরার জন্য প্রয়োজন সরকারি ভাবে আবারও  মেলার দর্শনার্রথীদের সামনে উপস্থাপনের জন্য পদক্ষেপ গ্রহনের। চলতি বছর যাত্র পালার ভরা মৌসুম চললেও কোথাও দেখা মেলে না যাত্রা পালা নামক বিনেদোনের নামটি।তেমনি যশোর জেলার যাত্রা শিল্পের সঙ্গে জড়িত সংশ্লিষ্টরা দিন গুনছে কবে তারা আবারও মঞ্চে উঠে যাত্রা পালা দর্শকদের মন জয়ের মধ্য দিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতে পারবেন।
একটি সময় ছিল যখনশক্তিশালী গণমাধ্যম হিসাবে যাত্রাপাল শিল্প ছিলো মূল গণমাধ্যম।আর এ শিল্প একসময় যশোরের মনিরামপুর উপজেলার পূর্ব অঞ্চলের ৭০ভাগ মানুষের জীবন জীবিকার একমাত্র অবলম্বন ছিলো। দেশের যাত্রা দলের ৮০ ভাগ দল মণিরামপুর উপজেলা থেকে দেশব্যাপী মানুষের মাঝে বিনোদন দিয়ে প্রশংসা কুড়িয়েছিল।আজ সেই মনিরামপুর উপজেলার যাত্রাশিল্পী ও কলাকৌশলীদের জীবন চলছে অনাহারে। সরকারি ভাবে যাত্রা শিল্পীদের মাঝে সহায়তা প্রদান করা হলেও সেগুলো প্রকৃত অর্থেই অপেশাদার শিল্পীদের মাঝে বন্টনের অভিযোগ করেন। মণিরামপুর উপজেলার যাত্রাশিল্পী, অনিতা,বন্ধনা,সুচিত্রা, তুষার মল্লিক সহ শতশত শিল্পীরা অভিযোগ করে বলেন, আমরা ছোটবেলা থেকে মানুষের মাঝে বিনোদন দিয়ে আসছি বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করে।
আমাদের নেশা ও পেশা যাত্রা শিল্প এবং যাত্রা শিল্পর বাইরে আমাদের কোন কাজ জানা নাই। পেশাদার যাত্রা শিল্পীদের মাঝে সরকারি ভাবে যে সাহায্য করা হয় তা অদৃশ্য কালো হাতের ইশারায় অপেশাদার শিল্পীদের মাঝে বন্টন হয়ে যায়। সরকারের নিকট একটা দাবী সরকারি ভাবে সাহায্য,  সহয়তা দিলে সেটা প্রকৃত পেশাদার শিল্পীদের সাহায্য নিয়ে প্রদান করা দাবী জানাই। পাশাপাশি আমাদেরকে নিজ পেশায় ফিরে যাওয়ার জন্য যাত্রা শিল্প কে আবারও দেশব্যপী মঞ্চায়নের জন্য বিশেষ পদক্ষেপ গ্রহন করতে জোর অনুরোধ করেন।যাত্রাইতি কথা কিছুটা তুলে ধরার জন্য বিশেষ অনুরোধও করেন তারা।আর সেই ইতি কথা তলে ধরার জন্য ফিরে দেখা ১৮৮৯-১৯৫৯ সালে ততকালিন নাট্যাচার্য শিশির কুমার ভাদুড়ি বলেছিলেন , জাতীয় নাট্য বলিয়া যদি কিছু থাকে তাহাই যাত্রা।’ নাট্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক জিয়া হায়দার (১৯৩৬-২০০৮) বলেন ‘যাত্রাই হতে পারে আমাদের জাতীয় নাট্য।’ তবে দুঃখজনক যে আজও, এ সম্ভাবনা আদৌ আমাদের দৃষ্টিগোচর হয়নি সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তাদের মাঝে ।
বরাবরই এ মাধ্যমটাকে এড়িয়ে চলার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন রাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট দপ্তর। যেকারণে বিভিন্ন  বিধিনিষেধ জারি করে সরকারিভাবে যাত্রার যাত্রাপথ বন্ধ করে রাখা হয়েছে। অথচ চিরায়ত সত্য এটাই যে, যাত্রা বা যাত্রাগান যুগে যুগে সকল শ্রেণী পেশার মানুষের মাঝে  আনন্দ দিয়েছে।একসময় গ্রাম গঞ্জে  যাত্রার আসরে শোনা যেত মহামানব, বীর পুরুষদের কাহিনি, রাজা-বাদশাহর যুদ্ধের গল্প।গ্রামের লেখাপড়া না-জানা মানুষ যাত্রাগানে সেই অভিনয় দেখে শুনে অনেক কিছু শিখতে ও বুঝতে পারত।যে কারণে দেশপ্রেম ও অসাম্প্রদায়িক চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে উঠতো হাজার হাজার নারী, পুরুষ, কিশোর, কিশোরী ।তবে যাত্রাপালার জন্মকথা বড়ই চমৎকার।এমনিকি গবেষকদের মাঝে যাত্রাপালা জন্মকথা নিয়ে বিভিন্ন  মতভেদ দেখা মেলে। যেমন বৈদিক যুগে বিভিন্ন স্থানে হিন্দু সম্প্রদায়ের দেব-দেবীর উৎসব হতো, ভক্তরা ঢাকঢোল নিয়ে নেচে গেয়ে  উৎসবে যোগ দিত। এক জায়গায় এক দেবতার বন্দনা ও লীলাকীর্তন শেষ করে আরেক জায়গায় আরেক দেবতার উৎসবে গান-বাজনা করতে করতে যাত্রা শুরু করত।
সূর্যদেবকে উপলক্ষ করে সৌরোৎসব, শ্রীকৃষ্ণের জন্মাষ্টমীতে কৃষ্ণযাত্রা, জগন্নাথ দেবের উদ্দেশে রথযাত্রা, দোল পূর্ণিমায় দোল যাত্রা এবং মনসামঙ্গলে ভাষান যাত্রা।’ এই যে, দেবদেবীদের উৎসবে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যাওয়া-আর এ ‘যাওয়া’ থেকেই ‘যাত্রা’ কথাটির উৎপত্তি বলে একদল গবেষক মনে করেন। অন্য দিকে ড. আশরাফ সিদ্দিকীর মতে যাত্রা শব্দটি দ্রাবিড় থেকে এসেছে। কারণ দ্রাবিড়দের মধ্যে এখনো এমন অনেক উৎসব আছে যাকে বলা হয় ‘যাত্রা’ বা ‘যাত্র।’ অন্যদল মনে করেন মধ্যযুগে এ দেশে যে পাঁচালী গান প্রচলিত ছিল, তা থেকেও যাত্রার উদ্ভব।
১৮৮২সালে যাত্রা বিষয়ে গবেষণা করে সুইজারল্যান্ডের জুরিখ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রথম ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেন বিক্রমপুরের সন্তান নিশীকান্ত চট্টোপাধ্যায়। তিনি গবেষণায় আবিষ্কার করেছেন খ্রিষ্টপূর্ব দ্বিতীয় শতক থেকেই কৃষ্ণ যাত্রার অভিনয় হতো। গবেষক গৌরাঙ্গ প্রসাদ ঘোষের মতে খ্রিষ্টপূর্ব তৃতীয় শতাব্দীতে সম্রাট অশোক তার অষ্টম শিলালিপিতে উৎসব অর্থে যাত্রা ব্যবহার করেছেন। বহু শতাব্দীব্যাপী উৎসবের ঘেরাটোপে বন্দি থাকার পর অভিনয় অর্থে যাত্রার প্রথম নিদর্শন দেখি মহাপ্রভূ শ্রীচৈতন্য দেবের আমলে ষোড়শ শতাব্দীর প্রথম দশকে। ১৫০৯ সালে অভিনীত পালাটির নাম ‘রুক্ষ্মিণী-হরণ।’ মহাপ্রভূ স্বয়ং এই পালায় অভিনয় করেন। এটি ছিল শ্রীকৃষ্ণের মাহাত্ম্য প্রচারের জন্য একটি উদ্দেশ্যমূলক ধর্মীয় প্রয়াস। তবে যাত্রাভিনয়ের ধারাবাহিক ইতিহাসের জন্য আমাদের আরও প্রায় আড়াইশ বছর অপেক্ষায় থাকতে হয়।শুধু সনাতন ধর্মাবলম্বীদের উৎসব থেকে নয় নবাব সিরাজউদ্দৌলার পতনের সাড়ে তিন দশক পর ইংরেজশাসিত বঙ্গদেশে বাংলা নাট্যাভিনয়ের সূচনা করেন রুশ নাগরিক হেরাসিম লেবেডেফ। সে সময়ে গ্রামে-গঞ্জে সারারাত যাত্রাগানের আসর বসত। অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে বীরভূম জেলার কেঁদুলী গ্রামের শিশুরাম অধিকারী যাত্রাগানে শোনালেন এক নতুন বার্তা। ভক্তি রসাত্মক ভাবধারার মধ্যে তিনি নিয়ে এলেন নতুন জাগরণ।
যাত্রাগানের ইতিহাসে তিনি ‘নবযাত্রার পথিকৃৎ’ হিসাবে খ্যাত। শিশুরামের পর পরমানন্দ অধিকারী ও গোবিন্দ অধিকারী (১৭৯৮-১৮৭০) বিভিন্ন আঙ্গিকে, বিন্যাসে ও রূপকল্পে যাত্রাকে আরও সময়োপযোগী করে তোলেন। ভাব-বিন্যাসে এবং হৃদয়ের গভীরতায় কৃষ্ণযাত্রার নতুন রূপায়ণ দেখতে পাই উনিশ শতকের মাঝামাঝিতে এবং এ ধারার কৃতিত্বের অধিকারী নবদ্বীপের কৃষ্ণকমল গোস্বামী (১৮১০-১৮৮৮)। সে সময়ে ঢাকায় তার ৩টি পালা- স্বপ্নবিলাস, দিব্যোন্মাদ ও বিচিত্র বিলাস খুব সুনামের সঙ্গে মঞ্চায়ন হয়। এগুলো প্রকাশিত হয় ১৮৭২, ’৭৩ ও ’৭৪ সালে। উল্লেখ করা যায়, কৃষ্ণকমলের আগে আর কারও পালা মুদ্রিত আকারে প্রকাশিত হয়নি এবং এ ৩টি যাত্রাপালা নিয়েই সুইজারল্যান্ড থেকে পিএইচডি ডিগ্রি নিয়েছিলেন নিশীকান্ত চ্যাটার্জি।
বিশেষভাবে আরও উল্লেখ করতে হয় যাত্রা বিষয়ে গবেষণা করে বাংলা ভাষাভাষীদের মধ্যে তিনিই প্রথম ডক্টরেট হওয়ার গৌরব অর্জন করেন। দীনবন্ধু মিত্রের ‘নীলদর্পণ’ যেমন ঢাকার প্রথম নাটক তেমনি ঢাকা শহরের প্রথম যাত্রাপালা কৃষ্ণকমল গোস্বামীর স্বপ্নবিলাস (১৮৬১)।
সুরুচিসম্পন্ন উন্নতমানের পালার পাশাপাশি উনিশ শতকের ৫০ ও ৬০-এর দশকে এক শ্রেণির সস্তা ও বিকৃতির প্রাদুর্ভাব ঘটেছিল যাত্রাপালায়। সেই অশ্লীলতা ও ভাঁড়ামি থেকে যাত্রাকে মুক্ত করে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য করে তুললেন আরেক বিশিষ্ট পালাকার মতিলাল রায় (১৮৩২-১৯০৮)। বিভিন্ন পালায় তিনি কথকতা, সংলাপ, অভিনয় ও সংগীতের অপূর্ব সমন্বয় ঘটিয়েছেন।
গানের ছন্দ ও অনুপ্রাস ব্যবহারের কৌশল তিনি নিয়েছেন দাশরথির পাঁচালী থেকে। নট ও নাট্যকার গিরিশচন্দ্র ঘোষের (১৮৪৪-১৯১২) হাতে পৌরাণিক যাত্রাপালা নতুন দৃষ্টিভঙ্গিতে স্বতন্ত্র মাত্রা পায়। যাত্রা ও নাটকে তার ভাষারীতি যেমন নতুনত্বের দাবি রাখে, তেমনি এক সুললিত ছন্দ আবিষ্কার করে বিশেষ খ্যাতি লাভ করেন। এটাই ‘গৈরিশী ছন্দ’ নামে পরিচিত। মিত্র, অমিত্রাক্ষরের সঙ্গে গৈরিশী ছন্দের ব্যবহারও যাত্রায় অনেকদিন ছিল।

৫০-৬০ দশকের অশ্লীলতার ছোয়া লাগে ৮০-৯০ দশকে আবারও কিছু অসাধু ব্যাবসায়ী ও যাত্রা সংশ্লিষ্টদের মাঝে। শুরু হয় অশ্লীলতার মহাউৎসব আর সেই উৎসবে মুখ ফিরিয়ে নিতে শুরু করে প্রকৃত যাত্রাপ্রেমী মানুষ। তবে ঝুকে পড়ে স্কুল, কলেজগামী কোমলমতি কিশোর, যুবক ও বিকৃত রুচির মানুষ। যাত্রার নামে রাতভর চলে বিভিন্ন সঙ্গীতের নামে অশ্লীল নিত্য। যার ফলে যাত্রা শিল্প নামের অধ্যায়ের বিলুপ্তি ঘটে।

আর মূল যাত্রা শিল্পীদের জীবন জীবিকার  মাঝে নেমে আসে অনাহারে অর্ধহারে দিন যাপনের আমাবস্যা। ৮০- ৯০ দশকে অশ্লীলতার কালো অধ্যায়ের কারণে রাষ্ট্র যাত্রা শিল্পকে বিভিন্ন বিধিনিষেধের মধ্য দিয়ে মঞ্চায়নের অনুমতি দিলেও অসাধু ব্যাবসায়ী ও মাঠ পরিচালনাকারীদের বেশী মুনাফা অর্জনের নেশা বন্ধ হয়না।যেকারণে একেবারে বন্ধ হয়ে যায় এ শিল্প। তবে যাত্রা শিল্পী,সংশ্লিষ্ট,এবং দর্শকদের সাথে কথা হলে তারা জানান,সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা সরকারি ভাবে এ শিল্প কে নিয়ন্ত্রণ করেলে আবারও সাধারণ মানুষের মাঝে বিনোদনের মূখ্য শিল্প হবে।পাশাপাশি বর্তমান  সমাজে মাদক,সন্ত্রাস,হত্যার মতে অপরাধ কর্মকাণ্ড থেকে ফিরে আসবে।

আরো পড়ুন

সর্বশেষ