জি.এম.বাবু. রাজগঞ্জ (যশোর) ॥ যশোরের মনিরামপুর উপজেলার একটি পৌরসভাসহ ১৮ ইউনিয়নে দ্রুত গতিতে কমছে তিন ফসলের কৃষি জমি। ইতিমধ্যে শতশত একর আবাদি জমি চলে গেছে বৃহত্তর এ উপজেলার ৪১টি ইট ভাটার পেটে। আর এ কারণে মারাত্মক বিপর্যয়ের মুখে উপজেলার কৃষি ব্যবস্থা ও পরিবেশ। বৃহত্তর মনিরামপুর উপজেলায় যত্রতত্র ভাবে অপরিকল্পিত ভাবে গড়ে উঠেছে অসংখ্য ইটভাটা। ফলে প্রতিনিয়ত কমছে এলাকার কৃষি জমি আর সেই সাথে কয়লার পরিবর্তে কাঠ পোড়ানোয় উজাড় হচ্ছে এ উপজেলার বনাঞ্চল। একটি পৌরসভা ও ১৮টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত দেশের বৃহত্তর মনিরামপুর উপজেলা। যার আয়তন ৪৪৪.৭৩ বর্গ কিলোমিটার বা ১৭১.৭৩ বর্গমাইল। যার জনসংখ্যা প্রায় ৫লাখ। মফস্বল ও পল্লী জনপদ হওয়া সত্বেও বৃহত্তর এ উপজেলায় জনসংখ্যার ঘনত্ব তুলনামুলকভাবেও অনেক বেশি। এই ঘনত্ব জনসংখ্যার মধ্যে ৪১টি ইটভাটায় গিলে খাচ্ছে শতশত একর তিন ফসলের আবাদি জমি। ইটভাটা নির্মাণ ও মাটি কেটে ইট তৈরী করায় দিনদিন এলাকা থেকে আবাদি জমি কমে যাচ্ছে। সেই সাথে কমতে শুরু করেছে কৃষি পন্যের উৎপাদন পাশাপাশি কয়লার পরিবর্তে ইটভাটায় কাঠ পোড়ানোয় নষ্ট হচ্ছে বনায়ন।
সূত্রমতে, এ উপজেলায় ৪১টি ইটভাটা রয়েছে। এর মধ্যে পূর্বাঞ্চলে ২৩টি ও পশ্চিমাঞ্চলে ১৮টি ইটভাটা রয়েছে। প্রশাসনের নাকের ডগায় এসকল ইটভাটাগুলোতে কাঠ পোড়ানো হলেও অদৃশ্য কারণে নিরব ভূমিকায় রয়েছেন প্রশাসন। ফলে মারাত্মক বিপর্যয়ের মুখে উপজেলার কৃষি ব্যবস্থা ও পরিবেশ। প্রশাসন, পরিবেশ অধিদপ্তর, ভ্যাট ও ট্যাক্স বিভাগেকে কৌশলে ম্যানেজ করেই প্রতিবছরের ন্যায় এবারও এ উপজেলার অধিকাংশ ইটভাটায় পুড়ানো হচ্ছে কয়লার পরিবর্তে কাঠ। তবে অধিকাংশ ইটভাটার জেলা পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র নেই বলে খোঁজখবর নিয়ে জানা যায়।
এদিকে যত্রতত্র ইটভাটা গড়ে উঠায় দিনদিন কমতে শুরু করেছে এলাকার কৃষিজমি। ৪১টি ইটভাটার দখলের পর যেটুকু কৃষি জমি অবশিষ্ট রয়েছে পরিবেশ দুষণের ফলে একেবারেই উৎপাদন কমে যাচ্ছে। ক্ষেতে ফলন ভালো না হওয়ায় মারাত্মক ক্ষতির সম্মূখীন হচ্ছেন এলাকার কৃষকরা। ভাটার কালো ধোয়ায় পরিবেশের পাশাপাশি নষ্ট হচ্ছে ক্ষেতের ধান, সীম, পটল, কপি, পিয়াজ, রসুনসহ নানান ধরণের সবজি ও ফল। উপজেলা পৌরশহর এলাকার কৃষক আব্দুল ওয়াদুদ ও ইউসুফ আলী গাজীর অভিযোগ আবাদি জমির পাশে ইটভাটা গড়ে উঠায় ক্ষেতের ফসল নষ্টসহ চাষাবাদ করতে মারাত্মক অসুবিধা হচ্ছে। এছাড়া একটি ইটভাটা নির্মাণ করতে কমপক্ষে ৯ থেকে ১০ একর জমির প্রয়োজন হয়। কারণ কাঁচা ইট শুকানো, ইট তৈরী করা, কাঁদা বানানো, মাটি কেটে পাহাড় তৈরী করে রাখা, ভাটার চিমনি তৈরী করা, ট্রাক ও টলি চলাচল এবং ভাটা শ্রমিকদের যাতায়াতের রাস্তা নির্মাণসহ মেশিন বসানোর কাজে এসব জমির প্রয়োজন হয়। আর এতে করেই কমতে শুরু করেছে এলাকার তিন ফসল ও দুই ফসলের আবাদি জমি। তবে কৃষি জমি রক্ষা করতে হলে এসকল ইটভাটার বিরুদ্ধে এখনই কঠোর পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন ভুক্তভোগী কৃষকসহ এলাকার সচেতন মহল।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবারপরিকল্পনা বিভাগের ডা. তন্ময় কুমার বিশ্বাস বলেন, ইটভাটার নির্গত ধোঁয়া বায়ুমন্ডলে যুক্ত হওয়ার কারণে শিশু ও বয়স্করা মারাত্মক স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে ভুগছে। শ্বাসকষ্ট,হাঁপানি, ক্যান্সারসহ নানা রোগের সৃষ্টি করছে। অপর দিকে গাছপালা উজাড় হওয়ায় প্রতিনিয়ত পরিবেশের মারাত্মক বিপর্যয় হচ্ছে। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, ইটভাটার কারণে শুধু পরিবেশই নয় মারাত্মক ক্ষতির সম্মূখীন হচ্ছে ধানসহ উঠতি ফসল।এব্যাপারে উপজেলা উপসহকারি কৃষি কর্মকর্তা সঞ্জয় কুমার দাশ জানান, তিন ফসলি কৃষি জমিতে ইটভাটা স্থাপন যাতে না হয় সে ব্যাপারে কঠোর পদক্ষেপ নেয়ার জন্য সরকারি নির্দেশ রয়েছে । তার পরেও প্রতি বছরই এ উপজেলায় নতুন নতুন ইটভাটা বৃদ্ধি পাচ্ছে। ইট পোড়ানো নিয়ন্ত্রণ আইনে আবাদি জমিতে কোন ইটভাটা তৈরী করা যাবেনা। এব্যাপারে মনিরামপুর উপজেলা ভাটা মালিক সমিতির সভাপতি বাবর আলীর সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান আইন ও পরিবেশ মেনে চলতি বছরে ইট পোড়ানোর কাজ অব্যাহত রয়েছে। ঝাঁপা ইউপি চেয়ারম্যান সমাজসেবক শামছুল হক মন্টু জানান, উপজেলায় যত্রতত্র ইটভাটা গড়ে উঠায় দিনদিন কমতে শুরু করেছে এলাকার কৃষিজমি। এ সকল ইটভাটার বিরুদ্ধে এখনই ব্যবস্থা গ্রহন করা প্রয়োজন বলে মনে করেন এ জনপ্রতিনিধি।এব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে জেলা পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক হারুন অর রশীদ বলেন, কাঠ পোড়ানোসহ নানাবিধ অভিযোগের কারনে ইটভাটা মালিকদের কঠোর বার্তা দেয়া হয়েছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে বৃহত্তর মনিরামপুর উপজেলার সকল ইটভাটার বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমান আদালত পরিচালনা করা হবে।

