শনিবার, ১৭ই জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ৩রা মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ, ২৮শে রজব, ১৪৪৭ হিজরি

যশোরে  বেড়েই চলেছে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা,২৪ ঘণ্টায় ২’জনের মৃত্যু

আরো খবর

নিজস্ব প্রতিবেদক: যশোরে  বেড়েই চলেছে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা। গত ২৪ ঘণ্টায় জেলায় ডেঙ্গুতে  আরো দু’জনের মৃত্যু হয়েছে। এনিয়ে জেলায় মোট ৪ জনের মৃত্যু হলো। গতকাল মৃতদের তালিকায় রয়েছেন মণিরামপুর উপজেলার লাউড়ি গ্রামের রফিকুল ইসলামের মেয়ে মার্জিয়া খাতুন (১৫) ও সদর উপজেলার চাঁচড়া এলাকার নাহার বেগম (৪৫)। এরমধ্যে মার্জিয়া যশোর জেনারেল হাসপাতাল ও নাহার খুলনা মেডিকেল কলেজে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন।
এদিন নতুন করে জেলায় আরও ১৪ জনের ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছে। বর্তমানে যশোর জেনারেল হাসপাতাল ও সাতটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৪১ জন চিকিৎসাধীন রয়েছেন। মানুষের সচেতনতার পাশাপাশি এডিস মশার বিস্তার রোধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা না হলে ডেঙ্গু আরও ভয়াবহ রূপ নেবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
স্বাস্থ্য বিভাগের সূত্র বলছে, বেশ কিছুদিন ধরে মণিরামপুরের মার্জিয়া ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাধীন ছিলেন। সেখানে তার অবস্থার অবনতি হলে বুধবার সকালে যশোর জেনারেল হাসপাতালে রেফার করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় কিছু সময় পর তার মৃত্যু হয়। গত ১০ সেপ্টেম্বর চাঁচড়ার নাহার বেগমের ডেঙ্গু শনাক্ত হয়। এরপর তিনি প্রথমে যশোর জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি হন। পরে তাকে খুলনায় রেফার করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বুধবার সকালে তার মৃত্যু হয়েছে। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার সুহাষ রঞ্জন হালদার।
বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ৪১ জনের মধ্যে যশোর জেনারেল হাসপাতালে ১০, অভয়নগরে ২৩, ঝিকরগাছায় ৩ ও কেশবপুরে ৫ জন চিকিৎসাধীন রয়েছেন। চলতি বছরে জেলায় ৪৬০ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন। সুস্থ হয়েছেন ৪১৫ ও মৃত্যু হয়েছে ৪ জনের।
ডেঙ্গু কী?
ডেঙ্গু জ্বর একটি মশাবাহিত ভাইরাল সংক্রমণ। এডিস মশার মাধ্যমে এটি ছড়ায়। ডেঙ্গুর জীবাণুবাহী মশা কোন ব্যক্তিকে কামড়ালে, সেই ব্যক্তি চার থেকে ছয় দিনের মধ্যে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়। আবার, এই আক্রান্ত ব্যক্তিকে কোন জীবাণুবিহীন এডিস মশা কামড়ালে, সেই মশাও ডেঙ্গু জ্বরের জীবাণুবাহী মশায় পরিণত হয়।
ডেঙ্গু জ্বর হওয়ার লক্ষণসমূহ
ডেঙ্গু প্রধানত দুই ধরনের হয়ে থাকে, ক্লাসিক্যাল ডেঙ্গু জ্বর এবং হেমোরেজিক ডেঙ্গু জ্বর। প্রকার অনুসারে ডেঙ্গুর লক্ষণও ভিন্ন হয়ে থাকে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে প্রথমবার ডেঙ্গুতে আক্রান্ত রোগীর বিশেষ কোন উপসর্গ বা লক্ষণ দেখা যায় না। এটিকে ক্লাসিক্যাল ডেঙ্গুই হিসাবে চিহ্নিত করা হয়ে থাকে। শুধু অল্প কিছু ক্ষেত্রেই রোগের প্রভাব গভীর হয়। ডেঙ্গুর সাধারণ উপসর্গগুলো হলো প্রচণ্ড পেট ব্যথা, ক্রমাগত বমি হওয়া, মারি বা নাক থেকে রক্তপাত, প্রস্রাবে এবং মলের সাথে রক্তপাত, অনিয়ন্ত্রিত পায়খানা, ত্বকের নিচে রক্তক্ষরণ (যা ক্ষতের মতো দেখাতে পারে), দ্রুত শ্বাস-প্রশ্বাস, ক্লান্তি, বিরক্তি এবং অস্থিরতা।
ডেঙ্গু হলে করণীয়
বেশি পরিমাণ তরল জাতীয় খাবার খেতে হবে যেমন-লেবুর শরবত, ফলের জুস, খাবার স্যালাইন। সারাদিনে বিশুদ্ধ খাবার পানি ১২ থেকে ১৪ গ্লাস খেতে হবে। ডেঙ্গু জ্বর হলে অবশ্যই সাথে সাথেই চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। মুখে তরল জাতীয় খাবার বা অন্যান্য খাবার যদি খেতে পারে এবং শারীরিক জটিলতা দেখা না দেয় তাহলে বাসায় পরিপূর্ণ বিশ্রামে থাকতে হবে। জ্বরের শেষের দিকে রক্তচাপ কমে যেতে পারে অথবা মাড়ি, নাক দিয়ে রক্তপাত হতে পারে। এক্ষেত্রে ফ্লুইড ম্যানেজমেন্ট সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। হয়ত শিরাপথে স্যালাইন দেয়া লাগতে পারে। এসব ক্ষেত্রে তাই হাসপাতালে ভর্তি হতে হবে।
যা বলছেন বিশেষজ্ঞরা
যশোর জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডাক্তার হারুন অর রশিদ বলেন, যদি এডিস মশা নিয়ন্ত্রণ করা না যায় তাহলে ডেঙ্গুজ্বরের রোগীর সংখ্যাও বাড়তে থাকবে আগামী শীতকাল পর্যন্ত। শীতকালে এডিস মশা থাকে না। সাধারণত সে সময় ডেঙ্গুজ্বর হয় না। মূল সমস্যা হচ্ছে মশার সংখ্যা বাড়ছে। লক্ষণ লেখা দিলেই হাসপাতালে এসে ডাক্তারের পরামর্শ দিতে হবে। ডেঙ্গু রোগীদের জন্য ইতিমধ্যে আলাদা কর্ণার করা হয়েছে। সেখানে পর্যাপ্ত ডাক্তার, নার্স, স্যালাইন ও ওষুধ রয়েছে।
সিভিল সার্জন ডাক্তার মাহমুদুল হাসান বলেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে ঘরের বা অফিসের বা কর্মস্থলের জানালা সব সময় বন্ধ রাখতে হবে, মশার কামড় থেকে বাঁচতে যতটা সম্ভব শরীর ঢেকে রাখতে পারে এমন পোশাক পরিধান করতে হবে। দিনে অথবা রাতে ঘুমানোর সময় অবশ্যই মশারি ব্যবহার করতে হবে। ফুলের টব, প্লাস্টিকের পাত্র, পরিত্যক্ত টায়ার, প্লাস্টিকের ড্রাম, মাটির পাত্র, বালতি, টিনের কৌটা, ডাবের খোসা বা নারকেলের মালা, কনটেইনার, মটকা, ব্যাটারি সেল, ফ্রিজে জমে থাকা পানি তিন দিনের মধ্যে ফেলে দিতে হবে, ডেঙ্গুর লক্ষণ দেখা দিলে নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে দ্রুত যোগাযোগ করতে হবে। ডেঙ্গু নিয়ে যেন মানুষের মধ্যে আতঙ্ক না ছড়ায়। সাধারণ চিকিৎসায়ই এই রোগ সেরে যায়।
উল্লেখ্য, ২০১৯ সালে যশোরে ডেঙ্গু রোগের প্রকোপ দেখা দেয়। এক প্রকার ভয়াবহ রুপ ধারণ করে। জেলায় মোট আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়ায় ৩ হাজার ৪৫১ জন। নারী পুরুষের সাথে আক্রান্তের তালিকায় শিশু ছিল। এছাড়া ছয়জনের মৃত্যু হয়েছিল। ২০২০ সালে ডেঙ্গুর প্রকোপ এক লাফে কমে যায়। যশোর জেলায় মাত্র ৫৬ জন নারী পুরুষ আক্রান্ত হয়েছিলেন। মৃতের তালিকায় কেউ ছিলনা। ২০২১ সালের ৪২ জন ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন। আর ২০২২ সালে ৪৪৬ জনের ডেঙ্গু শনাক্ত হয়। ২০২৩ সালে ডেঙ্গুর চোখ রাঙানি শুরু হয়েছে। ওই বছরে ১৫ ডেঙ্গুতে মারা যান। চলতি বছরের ২ অক্টোবর সেপ্টেম্বর পর্যন্ত জেলায় ডেঙ্গুতে ৪ জন প্রাণ হারিয়েছেন।

 

আরো পড়ুন

সর্বশেষ