শুক্রবার, ১৬ই জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ২রা মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ, ২৭শে রজব, ১৪৪৭ হিজরি

যশোরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অডিটের নামে ঘুষগ্রহণ, ফেরৎ চেয়ে শিক্ষকদের স্মারকলিপি

আরো খবর

নিজস্ব প্রতিবেদক:যশোরের মণিরামপুরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অডিটের নামে শিক্ষক-কর্মচারিদের এক মাসের বেতন ঘুষ হিসেবে নেয়া টাকা দুই বছর পর ফেরৎ চেয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের শিক্ষা উপদেষ্টার কাছে স্মারকলিপি প্রদান করা হয়েছে।

বৃহস্পতিবার (১২ সেপ্টেম্বর) মণিরামপুর উপজেলার হাজরাকাঠি দারুল উলুম মহিলা আলিম মাদ্রাসার শিক্ষক সৈয়দ আবুল কালাম আজাদের নেতৃত্বে ভুক্তভোগী শিক্ষকরা যশোরের জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে এ স্মারকলিপি প্রদান করেন।

এতে ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করেন, বেসরকারি শিক্ষকদের পাঠদান ব্যাতিত অন্যকোন কাজে সম্পৃক্ততার সুযোগ নেই। ফলে দুর্নীতি-অনিয়ম করার মতো কোন ক্ষেত্রও নেই। অথচ, ২০২২ সালের মার্চ মাসে শিক্ষা মন্ত্রণালয় অধিনস্ত পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের (ডিআইএ) কর্মকর্তা ড. এনামুল হক নামের এক কর্মকর্তা ‘মিনিস্ট্রি অডিটের’ নামে শিক্ষক-কর্মচারীদের নানাবিধ ভয় দেখিয়ে পুরো একমাসের বেতন ঘুষ হিসেবে দিয়েছেন।

শিক্ষকরা আরও উল্লেখ করেন, অধিকাংশ বেসরকারি শিক্ষকরা যা বেতন পান তা দিয়ে ঠিকমতো সংসার চলে না। তারপরও মাস শেষে হাতে গোনা বেতনের টাকা উত্তোলন করে সংসারের কেনাকাটা, বাচ্চাদের লেখাপড়া, চিকিৎসা ও  ঋণের কিস্তি দেন।

কিন্তু সেই টাকাগুলো জোর পূর্বক ঘুষ দিতে বাধ্য হয়ে অনেকেই অর্থনৈতিক ও মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। এমনকি বিষয়টি শিক্ষা কর্মকর্তাদের জানানোর পরে ওই কর্মকর্তা ফের চাপসৃষ্টি করে ‘আমরা ঘুষ দেয়নি মর্মে প্রস্তুত করা চিঠিতে’ স্বাক্ষর করিয়ে নেন। পরে দুদক ওই কর্মকর্তার কার্যালয়ে অভিযান পরিচালনা করলেও খুব বেশি অগ্রসর হতে দেখা যায়নি।

এছাড়া বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন তদন্তকারী সংস্থার লোক তদন্তে আসলে ওই কর্মকর্তার অনুসারীরা আমাদের পেনশন আটকে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে অস্বীকার করাতে বাধ্য করেন। এসব ভয় উপেক্ষা করে যারা সত্য বলবেন তাদের স্বাক্ষী নেয়নি তদন্তকারীরা।

অভিযোগে বলা হয়, অডিট কর্মকর্তা অডিট করতে এসে ঘুষের ভাগ আওয়ামী লীগের সর্বোচ্চ নেতা এবং মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদেরও দেওয়া লাগে। যা অনেক শিক্ষক গোপনভাবে রেকর্ড করে। ওই কর্মকর্তার গ্রামের বাড়ি মাদারীপুরের কালকিনি উপজেলার শিক্ষকদের মাঝে জানতে পারেন, ড.এনামুলের স্ত্রী মহিলা আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা এবং স্বামীর অবৈধ টাকার জোরে দুইবার ভাইস চেয়ারম্যান হয়েছেন।

এছাড়াও সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারের চাকরি নিয়ে দীর্ঘকাল ডিআইয়ের একই চেয়ারে বসে সারাদেশের শিক্ষকদের জিম্মি করে মিনিস্ট্রি অডিটের নামে কোটি কোটি টাকার মালিক হয়েছেন। ওই টাকায় এলাকায় শত’ শত’ বিঘা আমের বাগান ও মৎস্য খামার,ঢাকায় একাধিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও আলিশান বাড়ি নির্মাণ করেছেন, নামে-বেনামে কোটি কোটি টাকার পাহাড় গড়েছেন।

ওই সময় ড. এনামুলের ফেসবুক হোমপেজে সাবেক শিক্ষামন্ত্রীর সাথে তোলা ছবি দেওয়া ছিল। এতে সাধারণ শিক্ষকরা অবৈধ ক্ষমতার ভয়ে কোন প্রতিবাদ করতে সাহস পায়নি।

বিশেষ করে, সে সময় দেশে দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে কথা বলার কিংবা প্রতিবাদ করার উপযুক্ত পরিবেশ ছিল না বলেও উল্লেখ করা হয়। তবে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মাধ্যমে পাওয়া স্বাধীনতায় দুর্নীতি-অনিয়মের বিরুদ্ধে কথা বলার এবং প্রতিবাদ করার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে জানিয়ে শিক্ষকরা অবিলম্বে তদন্তপূর্বক ঘুষের টাকা ফেরৎ পেতে শিক্ষা উপদেষ্টার কাছে মানবিক আবেদন জানিয়েছেন।

অন্যথায়, কষ্টের বেতনের টাকা আদায়ে তাদের রাস্তায় নামা ব্যাতিত কোন পথ খোলা থাকবে না বলেও উল্লেখ করেন।

প্রসঙ্গত, ২০২২ সালের মার্চ মাসের শুরুতে যশোরের মণিরামপুর পৌর শহরের মণিরামপুর মহিলা আলিম মাদ্রাসা, হাজরাকাঠি মহিলা আলিম মাদ্রাসা, ডুমুরখালি দাখিল মাদ্রাসা, মনোহরপুর দাখিল মাদ্রাসা, বালিধা-পাঁচাকড়ি দাখিল মাদ্রাসা, রোহিতা মাধ্যমিক বিদ্যালয়, হাজীআলী নিন্ম মাধ্যমিক বিদ্যালয়, দেলুয়াবাড়ি মাধ্যমিক বিদ্যালয়সহ ১০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আয়-ব্যয়, শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগসহ আনুষঙ্গিক বিষয়ে অডিট করেন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনস্ত পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের পরিদর্শক ড. এনামুল হক।

পরিদর্শনকালে ওই ১০ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ২০০ শিক্ষক-কর্মচারীর পুরো একমাসের বেতনের প্রায় অর্ধকোটি টাকা ঘুষগ্রহণের অভিযোগের প্রেক্ষিতে ২০২২ সালের ১২ মে দুদক প্রধান কার্যালয়ের সহকারি পরিচালক সিলভিয়া ফেরদৌস ও আবুল কালামের নেতৃত্বে একটি দল শিক্ষাভবনে অভিযুক্ত কর্মকর্তার কার্যালয়ে অভিযান পরিচালনা করেন।

এ প্রসঙ্গে ভুক্তভোগী শিক্ষক সৈয়দ আবুল কালাম আজাদ বলেন, উনি (ড. এনামুল হক) যশোরে এসে একটি রেস্ট হাউজে উঠে ১০ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রধানকে দেখা করতে বলেন। এরপর সরাসরি বলেন, আপনাদের অনেক ফাঁক-ফোকর আছে।

প্রকৃত অডিট হলে কারো বেতন বন্ধ হবে, কারো পেনশন আটকে যাবে, কারো চাকরিটাও যাবে। এজন্য আপনারা সবাইকে (সাধারণ শিক্ষক-কর্মচারীদের) বলে দেন বাড়াবাড়ি না করে এক এমপিও (এক মাসের বেতন) দিতে, বাকিটা আমি ঠিক করে নেব।

এরপর গভীর রাতেও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অডিটের নামে হরেক রকম নাস্তা ও ১০-১২ রকম খাবারের মধ্য দিয়ে আপ্যায়িত হয়ে আজব অডিট সম্পন্ন করেন। তিনি অডিটকালে   ঘুষ কোথায় কোথায় ভাগাভাগি হবে সেটাও বলে গেছেন যা রেকর্ড আছে।

বাধ্য হয়ে শিক্ষকরা ঘুষ দিলেও পরে শিক্ষক সমাজে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়লে সর্বত্র জানাজানি হয়। এতে নিজেকে বাঁচাতে তিনি (ড. এনামুল হক) ঘুষ নেননি মর্মে প্রত্যয়নে স্বক্ষর করাতে বাধ্য করিয়েছেন। এসব অপকর্মে প্রতিষ্ঠান প্রধানরাও সহযোগিতা করায় তারাও কিছু ভাগ পেয়েছেন যা নিরপেক্ষ তদন্ত হলে বেরিয়ে আসবে।

এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, যেকোন মূল্যে এই মহাদুর্নীতিবাজের কাছ থেকে শিক্ষকদের রক্ত ঘামানো আয়ের টাকা আদায় করার জন্য আমরা প্রতিজ্ঞা করেছি। সে যতো বড় ক্ষমতাধর হোক তাকে আইনের আওয়তায় আনতে যা যা করার করা হবে।

অপর একটি সূত্র জানিয়েছে ভালুকঘর ফাজিল মাদ্রাসাসহ কেশবপুরের আরো কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে এমন ঘটনা ঘটেছে। দালাল হিসেবে পরিচিত কামাল নামে একজন শিক্ষক একমাসের বেতন কেটে নেয়ার সাথে সরাসরি যুক্ত ছিলেন বলে অভিযোগে প্রকাশ।

আরো পড়ুন

সর্বশেষ