মণিরামপুর প্রতিনিধি: যশোর-৫ মণিরামপুর সংসদীয় আসন প্রার্থীদৈর টার্গেট আ’লীগের ভোট ব্যাংক। প্রতিদ্বন্দ্বী মূল তিন প্রার্থীর মধ্যে যিনি ‘সংখ্যালঘু ভোট টানতে পারবেন, জয় তার সুনিশ্চিত এমন আলোচনা চলছে সেখানকার ভোটের মাঠে। এ আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৪ লাখ ১০ হাজার ৪২৭। যার মধ্যে হিন্দু সম্প্রদায়ের রয়েছে ৭৪ হাজার ৫৩৬। যাদেরকে আ’লীগের ভোট ব্যাংক বলা হয়।
সংখ্যালঘুদের এই ভোট এক সময় আওয়ামী লীগের ভোটব্যাংক হলেও এবার টানতে হবে সেখানকার প্রতিদ্বন্দ্বীদেরই। আর এই ভোট নিজেদের পক্ষে টানতে প্রার্থীরা বারবার তাদের দ্বারে ছুটছেন। ভবদহের সমস্যা সমাধান, সার্বিক নিরাপত্তা প্রদান ইত্যাদিই হচ্ছে তাদের প্রতিশ্রুতি।
এইভোটের পাশাপাশি জয়-পরাজয়ে ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়িয়েছে নারী ও আওয়ামী লীগের সাধারণ ভোটারও। ভোটের মাঠে এসব ভোটারের উপস্থিতি পাল্টে দিতে পারে সব হিসাবনিকাশ।
এবারের নির্বাচনে মণিরামপুর থেকে ছয়জন প্রার্থী লড়াই করছেন। তারা হলেন- ‘দাঁড়িপাল্লা’ প্রতীকে অ্যাডভোকেট গাজী এনামুল হক, ‘ধানের শীষ’ প্রতীকে রশীদ আহমাদ, ‘হাতপাখা’ প্রতীকে জয়নাল আবেদীন টিপু, ‘লাঙ্গল’ প্রতীকে এমএ হালিম, ‘কলস’ প্রতীকে স্বতন্ত্র প্রার্থী শহীদ ইকবাল হোসেন ও ‘ফুটবল’ প্রতীকে কামরুজ্জামান।
আগের নির্বাচনী ফলাফল:
১৯৭৩ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত সংসদ নির্বাচনে বেশির ভাগ সময়েই এ আসনে জিতেছেন আওয়ামী লীগ ঘরনার প্রার্থীরা। ১৯৭৯ সালে বিএনপির আফসার আহমেদ সিদ্দিকী (ধানের শীষ) ও ২০০১ সালে চারদলীয় জোটের প্রার্থী ইসলামী ঐক্যজোটের নেতা মুফতি মুহাম্মদ ওয়াক্কাস (ধানের শীষ) নির্বাচিত হয়েছিলেন। মুফতি মুহাম্মদ ওয়াক্কাস এ আসন থেকে ১৯৮৬ সালে জাতীয় পার্টির বিদ্রোহী নেতা হিসেবেও জয়ী হন। তাঁর ছেলে রশীদ আহমাদই এবার ধানের শীষের প্রার্থী।
এ ছাড়াও আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী নেতা স্বপন ভট্টাচার্য স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে ২০১৪ সাল ও এস এম ইয়াকুব আলী ২০২৪ সালে বিজয়ী হয়েছিলেন। এই নির্বাচনে যেহেতু আওয়ামী লীগ অংশ নিচ্ছে না, সে হিসেবে তাদের এক লাখ ৩৫ থেকে ৪০ হাজার ভোটারই জয়-পরাজয়ে নিয়ামক হয়ে উঠতে পারেন। এখানে হিন্দু ও মতুয়া সম্প্রদায়ের ভোট প্রায় ৭০ হাজার। বিশেষ করে ভবদহ এলাকার ছয়টি ইউনিয়নের মধ্যে ৯৬টি গ্রামে তাদের ভোটব্যাংক রয়েছে। ফলে তাদের হাতেই মূলত ফল নির্ভর করছে বলে স্থানীয় সূত্রগুলো জানিয়েছে।
এ বিষয়ে কথা হয় মতুয়া সম্প্রদায়ের নেতা হরিচাঁদ মল্লিক, সুকৃতি বিশ্বাস, নীল রতন দাসসহ কয়েকজনের সঙ্গে। তাদের ভাষ্য, যে প্রার্থী তাদের নিরাপত্তা দিতে পারবেন, এবার সেই প্রার্থীকেই ভোট দেবেন।
স্থানীয়দের মতে, ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী রশীদ আহমাদ নতুন মুখ। তার বাবা মুফতি ওয়াক্কাসকে সবাই চিনতেন। কিন্তু রশীদ আহমাদকে মানুষ খুব একটা চেনে না। ভোটের লড়াই হবে স্বতন্ত্র প্রার্থী শহীদ মো. ইকবাল হোসেন ও জামায়াতের গাজী এনামুল হকের মধ্যে। তবে স্বতন্ত্র প্রার্থী বিএনপির ভোট কাটতে পারে। জামায়াত সুবিধাজনক অবস্থানে আছে।
সংশ্লিষ্ট ভোটারদের সঙ্গে আলাপকালে বোঝা গেছে, এবার এই আসনে লড়াইটি হবে ত্রিমুখী। দলের বিদ্রোহী প্রার্থী থাকায় মণিরামপুরে বিএনপির ভোটারদের মাঝে একটি বড় বিভক্তি রয়েছে। এই বিভক্তি দাঁড়িপাল্লার নির্বাচনি লড়াই সহজ করে দিয়েছে।
নতুন মুখ হলেও ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে শক্ত অবস্থানে রয়েছেন জমিয়তে ওলামায়ে ইসলামের একাংশের যুগ্ম সম্পাদক রশীদ আহমাদ। ব্যক্তি নয়, দলকে ভালোবাসেন এমন বিএনপির নেতাকর্মী ও সমর্থকরা কাজ করছেন রশীদ আহমাদের পক্ষে। এছাড়া সংখ্যালঘু ও আওয়ামী লীগের সাধারণ ভোটারকে তার পক্ষে টানতে জোর চেষ্টা করে যাচ্ছেন তিনি।
জামায়াতের নারী কর্মীরা দীর্ঘদিন পাড়া-মহল্লায় ঘুরে নারী ভোটারদের বুঝিয়ে দাঁড়িপাল্লার পক্ষে অবস্থান তৈরি করেছেন। নতুন ভোটারের বড় একটি অংশকে দাঁড়িপাল্লার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। অনেক ভোটার মনে করছেন, এবার দাঁড়িপাল্লার সঙ্গে ভোটের লড়াই হবে কলস ও ধানের শীষের।
মণিরামপুরের বিএনপিতে গ্রুপিং-দ্বন্দ্ব দীর্ঘদিনের। একটি অংশের নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন দলের সদ্য বহিষ্কৃত থানা সভাপতি শহীদ ইকবাল হোসেন। অপরটির নেতৃত্বে ছিলেন সদ্য প্রয়াত মোহাম্মদ মুসা। এই প্রবীণ নেতার মৃত্যুর পর তার বড় ছেলে কামরুজ্জামান ও থানা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান মিন্টু গ্রুপের হাল ধরেন। দলে বিভক্তি চরমে থাকলেও ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে শহীদ ইকবাল প্রাথমিক মনোনয়ন পাওয়ায় গ্রুপ ভেঙে অনেকে তার সঙ্গে যোগ দিয়ে ধানের শীষের পক্ষে কাজ শুরু করেন। এরপর মণিরামপুরে বিএনপির চূড়ান্ত মনোনয়ন দেওয়া হয় দলের শরিক জমিয়তে ওলামায়ে ইসলামের একাংশের যুগ্ম সম্পাদক রশীদ আহমাদকে। তখনই বাধে বিপত্তি। প্রথমদিকে কিছুটা আপত্তি জানালেও দলের সিদ্ধান্ত মেনে বিএনপির একটি অংশ ধানের শীষের প্রার্থীকে নিয়ে প্রচারণায় নামেন।
আর ইকবাল হোসেনের অংশ তার সঙ্গে থেকে যায়। তারা কাফনের কাপড় পরে রাস্তায় আন্দোলনে নেমে মনোনয়ন ফিরিয়ে আনতে ব্যর্থ হয়। এরপর দলের নিজের অনুসারীদের নিয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হন ইকবাল হোসেন। দলের অন্য অংশের কয়েকজন ইকবাল হোসেনের পক্ষে অবস্থান নেন।
বিএনপির এই অংশের দাবি, মণিরামপুর আসনে বারবার শরিক দলকে মনোনয়ন দেওয়ায় এ অঞ্চলে বিএনপির নেতাকর্মীরা বঞ্চিত হচ্ছেন। এবার স্বতন্ত্র প্রার্থী জয়ী করে তারা কেন্দ্রীয় বিএনপির কাছে নিজেদের অবস্থান জানান দিতে চান।
তবে ভিন্নকথা বলছেন ধানের শীষের পক্ষের থানা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান মিন্টু।
তিনি বলেন, দলের একটা বড় অংশ নিয়ে শহীদ ইকবাল স্বতন্ত্র প্রার্থী হন; কিন্তু ভোটের দিন যত ঘনিয়ে আসছে, যেই অংশ থেকে অনেকে বেরিয়ে ধানের শীষে ভিড়ছেন। দলের যেসব নেতাকর্মী শহীদ ইকবালের সঙ্গে আছেন, তাদের ছাড়া বিএনপির সাধারণ ভোটাররা স্বতন্ত্র প্রার্থীকে ভোট দেবেন না। আমাদের সঙ্গে হিন্দু ভোটারদের কথা হয়েছে। তাদের অনেককে এখন কলসের সঙ্গে দেখা যাচ্ছে। কিন্তু গোপনে তারা ধানের শীষকেই ভোট দেবেন।
জানতে চাইলে দাঁড়িপাল্লার প্রার্থী গাজী এনামুল হক বলেন, মণিরামপুরে দাঁড়িপাল্লার পক্ষে জোয়ার এসেছে।
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ভোট তার পক্ষেই পড়বে- দাবি করে তিনি বলেন, ৫ আগস্টের পর চাঁদাবাজি, হুমকি, গোয়াল থেকে গরু ধরে নিয়ে যাওয়ার কথা তাদের মনে আছে।
উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা কামরুজ্জামানের দেওয়া তথ্যমতে, যশোর-৫ আসনের ১২৮টি ভোটকেন্দ্রে। মোট ভোটার তিন লাখ ৬৯ হাজার ৮২ জন। এদের মধ্যে পুরুষ এক লাখ ৮৪ হাজার ২১৫ ও নারী এক লাখ ৮২৩ জন।

