জি.এম.বাবু. রাজগঞ্জ ॥ মাত্র ক’বছর আগেও পোল্ট্রি শিল্পো ব্যবসায়ীরা লাভের মুখ দেখলেও এখন মাথায় হাত উঠেছে তাদের। পোল্ট্রি খাদ্যমূল্যর দাম উর্ধ্বগতি, বিরুপ আবহাওয়া, বহুমুখী রোগ বালাই এ শিল্পোকে হুমকির মূখে ঠেলে দিয়েছে। এতে চরম বিপাকে পড়েছেন যশোরের মনিরামপুর উপজেলার রাজগঞ্জ অঞ্চলের সহস্রাধিক পোল্ট্রি ব্যবসায়ী ও তাদের পরিবার। অব্যাহত লোকসানের মুখে এদের অনেকেই সর্বশান্ত হয়ে এ ব্যবসা ছেড়ে দিয়েছে। কেউ কেউ আবার জমিজমা বিক্রি করে ও মহাজনের সুদের টাকা শোধ করতে না পেরে এলাকা ছেড়ে পালিয়ে গেছেন অন্যত্রে।
স্থানীয় পোল্ট্রি ব্যবসায়ীরা জানান, বিগত প্রায় এক দশক ধরে এ ব্যবসার সাথে জড়িত রয়েছেন তারা। শুরুতে পোল্ট্রি খাবারের দাম কম ছিল। তার উপর তুলনা মূলক অনুকূল আবহাওয়া এ ব্যবসাকে আরো গতিশীল করে তুলেছিল। যার জের ধরে ধীরে ধীরে দেশের বৃহত্তর এ উপজেলার প্রায় সহস্রাধিক বেকার যুবকসহ সাধারন মানুষ পোল্ট্রি ব্যবসার সাথে জড়িয়ে পড়েন। শুরুতে তারা বেশ লাভের মুখ দেখলেও বিগত দু’তিন বছর ধরে ধ্বস নেমেছে এ ব্যবসায়।
এব্যাপারে ঝাঁপা ইউনিয়নের হানুয়ার গ্রামের পোল্ট্রি ব্যবসায়ী গাজী শাহ আলম জানান, ২০০৮ সালে প্রতিবস্তা খাদ্যর দাম ছিল ৭শত টাকা। ২০০৯ সালে তার দাম বৃদ্ধি পেয়ে হলো ৯শত টাকা। ২০১০ সালে প্রতিবস্তায় ৫শত টাকা বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ালো ১হাজার ৪শত টাকা। ২০১১ সালে প্রতিবস্তা খাদ্যর দাম ছিল ১হাজার ৭শত টাকা। ২০১২ সালে ওই খাদ্য প্রতিবস্তা বিক্রি হয় ১হাজার ৯শত ৬৫টাকা থেকে ২হাজার টাকা পর্যন্ত। ২০১৩ সালে প্রতি বস্তা খাদ্য বিক্রি হয় ২০০০ টাকা। ২০১৪ ও ২০১৫ সালে প্রতি বস্তা খাদ্য’র দাম হয় ২১০০ থেকে ২২০০টাকা। ২০১৬ থেকে ২০১৯সাল পর্যন্ত পোল্ট্রি খাদ্যর দাম স্বাভাবিক থাকলেও ২০২০ থেকে ২০২১সাল পর্যন্ত করোনাকালিন সময়ে প্রতি বস্তা খাদ্যর দাম ৫০০টাকা করে বৃদ্ধি পেয়েছে।
বর্তমানে নারিশ প্রতিবস্তা পোল্ট্রি খাদ্য বাজারে বিক্রি হচ্ছে ২৬২৫টাকা। আর কোয়ালিটি ফিড প্রতিবস্তা বাজারে বিক্রি হচ্ছে ২২৫০টাকা সোনালী ফিড প্রতিবস্তা বিক্রি হচ্ছে ২৪০০টাকা ও বয়লার ফিড বিক্রি হচ্ছে প্রতিবস্তা ২৬৫০। এছাড়া বাজারে প্রতিনিয়ত খাদ্যসহ ঔষধ পত্রের দাম বৃদ্ধির কারণে পোল্ট্রি খামারে মারাত্মক ধ্বস নেমেছে যা কেটে উঠা আদৌ সম্ভম নয় বলে মনে করেন ক্ষতিগ্রস্থ পোল্ট্রি ব্যবসায়ীরা। আর এসব কারণেই বৃহত্তর রাজগঞ্জ এলাকার অনেকেই এখন পোল্ট্রি ব্যবসা ছেড়ে দেনার বোঁঝা মাথায় নিয়ে অন্য ব্যবসা শুরু করেছে।
ঝাঁপা ইউনিয়নের অপর ব্যবসায়ী রাজগঞ্জ কলেজ পাড়ার মুন্তাজ গাজী, শামীম, শফিয়ার রহমান, মনোহরপুর গ্রামের আবু মুছা, মশ্মিমনগর ইউনিয়নের পারখাজুরা গ্রামের মশিয়ার রহমান ও অরবিন্দু, চাকলা গ্রামের নুরইসলাম, মাস্টার মশিয়ার রহমান, রামপুর গ্রামের শাহদাত হোসেন ও রেজাউল ইসলাম. খেদাপাড়া ইউনিয়নের গালদা গ্রামের ডা,আনোয়ার হোসেন ও আব্দুস সালাম জানান, রোগ বালাইয়ের কারণে মুরগীর অকাল মৃত্যুতে বেশিরভাগই পোল্ট্রি খামার ব্যবসায়ী আজ সর্বশান্ত হয়ে পথে বসেছেন। রোগ বালাইয়ের মধ্যে রয়েছে, বাডফ্লু, রানী ক্ষেত, গাম ব্রো ও রক্ত আমাশা। খামার ব্যবসায়ী হানুয়ার গ্রামের শাহআলম গাজী জানান, প্রচন্ড ঠান্ডার কারণে মুরগী মারা যায়।
এছাড়া অতিরিক্ত ঠান্ডার কারণে বিভিন্ন রোগ বালাই দেখা দেয়। উপজেলার হানুয়ার কলেজপাড়া গ্রামের মুন্তাজ গাজী জানান, বেকারত্ত্ব ঘুচাতে তিনি নেমেছিলেন পোল্ট্রির ব্যবসায়। প্রথম পর্যায়ে কিছু লাভের মুখ দেখলেও আস্তে আস্তে লোকসান হতে থাকে। লোকসানের মাত্রা এতটাই ভয়াবহ ছিল যে পৈত্রিক সম্পত্তি বিক্রয় করে মহাজনের দেনা পরিশোধ করতে হয়েছে।
বর্তমানে তিনি খামার বন্ধ করে পরিবারপরিজন নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। শাহআলম ও মুন্তাজ গাজীর মতো এ গ্রামের অনেকেরই একই অবস্থার কারণে দেনার বোঁঝা মাথায় নিয়ে ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। অনেকেই আবার পাওনাদারের চাঁপে পালিয়ে বিদেশে পাড়ি জামিয়েছেন।
হানুয়ার গ্রামের বেকার যুবক শামীম হোসেন ২০১০ সালে নিজ বাড়িতে একটি পোল্ট্রি খামার করেন। প্রথমে লাভের মুখ দেখলেও পরে লোকসান গুনতে গুনতে সর্বশান্ত হয়ে পড়েন। এরপর ২০১৫ সালে দেনার বোঁঝা মাথায় নিয়ে রাতের অন্ধকারে পাড়ি জমান মালয়েশিয়া। সেখানে দীর্ঘ ৬বছর থাকে পোল্ট্রি দোকানীদের দেনা শোধ করে সম্প্রতি দেশে ফিরে অন্য ব্যবসা শুরু করেছেন। এখন তিনি খুবই ভালো আছেন বলে এ প্রতিনিধিকে জানান।
এব্যাপারে রাজগঞ্জ বাজারের পোল্ট্রি খাদ্য ব্যবসায়ী রফিকুল ইসলাম রাঙ্গা জানান, যেভাবে পোল্টি খাদ্যসহ ঔষধ পত্রের দাম বৃদ্ধির কারণে পোল্ট্রি খামারে মারাত্মক ধ্বস নেমেছে। মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্থ এ অঞ্চলের শতশত পোল্টি ব্যবসায়ীরা এখন পোল্টি ব্যবসা ছেড়ে দেনার বোঁঝা মাথায় নিয়ে অন্য ব্যবসা করছে।
উপজেলা প্রাণী সম্পদ বিভাগের কর্মকর্তা ড. আবুজার ছিদ্দিকি জানান, প্রতিটা খামার ব্যবসায়ী তাদের অফিস থেকে ভ্যাকসিন নিয়ে যান। এছাড়া পোল্ট্রি খামারে কোন রোগ বালাই দেখা দিলে সঙ্গে সঙ্গে তারা ঘটনাস্থলে গিয়ে তা প্রতিশোধকের ব্যবস্থা করেন। শীতের সময় সিআরডি, সিসিআরডি, ঘামব্রো ও রানীক্ষেত নামক রোগবালাই হতে পারে। তবে শীতকালিন সময়ে একটু সর্তক থাকলেই এ রোগ থেকে পোল্টি খামারিরা মুরগী রক্ষা করতে পারেন বলে মনে করেন এ কর্মকর্তা।
বৃত্তহর এ শিল্পের সাথে জড়িত শতশত পোল্ট্রি খামারি ব্যবসায়ী সরকারি ভাবে সার্বিক সহযোগিতা পেলে এ ব্যবসাকে আরো বেশি প্রসার ঘটিয়ে পূর্বের মারাত্মক ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে পারে বলে মনে করেন তারা।

