জি.এম.বাবু. রাজগঞ্জ (যশোর) অফিস : যশোরের মনিরামপুর উপজেলায় চলতি মৌসুমে পাটের আঁশের চেয়ে পাটকাঠির কদর বেড়েছে বেশ কয়েকগুণ। বানিজ্যিকভাবে পাটকাঠির ব্যবহার বৃদ্ধি ও দাম অনেক বেশি হওয়ায় সোনালী আঁশের চেয়ে পাটকাঠির যতœ নিচ্ছেন কৃষকেরা। বৃহত্তর এ উপজেলার অধিকাংশ চাষিরাই বলছেন, চলতি মৌসুমে তীব্র পানির অভাবে পাটের আঁশে মারাত্মক পরিমাণে ক্ষতি হয়েয়ে। অনেকেই পানি কিনে তারপর পাট জাগ দিয়েছে। এতে কৃষকের অনেকটা বাড়তি টাকা খরচ হয়েছে। সেই খরচের কিছুটা হলেও পাটকাঠি বিক্রি করে পুষিয়ে নিতে চাই ক্ষতিগ্রস্থ এ সকল কৃষকেরা।
মনিরামপুর উপজেলা কৃষি সম্প্রসারন অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, বৃহত্তর এ উপজেলার একটি পৌরসভাসহ ১৮টি ইউনিয়নে বিভিন্ন প্রকারের চাষি রয়েছে ১লাখ ৮ হাজার। এরমধ্যে চলতি মৌসুমে পাট চাষ করেছে প্রায় সাড়ে ৪৪ হাজার কৃষক। এ মৌসুমে দেশি ও তোযা জাতের পাট চাষ হয়েছে ৫হাজার ৫শ ৫০ হেক্টর জমিতে। যা গত মৌসুমের চেয়ে ১৫০ হেক্টর বেশি। পাটের বাম্পার ফলন হওয়ায় চলতি মৌসুমে ১৬হাজার ২৭৫ মেট্রিকটন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল। এছাড়া ক্ষেতে পাটের অবস্থা পূর্বের যে কোন সময়ের চেয়ে অনেকগুণ ভাল হয়েছে। তবে চলতি মৌসুমে পর্যাপ্ত পরিমাণে বৃষ্টি না হওয়ায় উপজেলা ব্যাপি তীব্র পানির সংকট দেখা দেয়। পানির অভাবে কৃষকেরা পাট জাগ দিতে পারেনি। আর ভাল পানিতে পাট জাগ দিতে না পারায় পাটের গুণগতমান এবার মোটেও ভাল হয়নি। এতে করে এবার উপজেলার সাড়ে ৪৪ হাজার কৃষক মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখিন হয়েছেন।
কৃষকেরা জানিয়েছেন, আকাশের বৃষ্টির পানিসহ খালে বিলে পানি না থাকায় তাদের এবার পাট জাগ দিতে অনেকটা সমস্যায় পড়তে হয়েছে। এলাকার অনেক চাষিকে পানি কিনে পাট জাগ দিতে হয়েছে। এতে কয়েকগুণ টাকা বাড়তি খরচ হয়েছে। এছাড়া অনেক চাষি পানির অভাবে পাট না কেটে ক্ষেতেই রেখে শুকিয়ে ফেলেছেন। এলাকার বেশির ভাগ খাল-বিল, পুকুর পর্যাপ্ত পানি না থাকায় পাট নিয়ে বেশি চিন্তিত হয়ে পড়েন তারা। তবে পাটের গনগতমান ধরে রাখতে এ উপজেলার চাষিরা কেটে রাখা পাট পরিবহন করে নিচু জমি, ডোবা ও খাল বিলে নিয়ে জাগ দিয়েছেন। অতিরিক্ত খরচের চাঁপে বৃহত্তর এ উপজেলার সাড়ে ৪৪হাজার চাষি এবার মারাত্মক ক্ষতির সম্মূখিন হয়েছেন।
উপজেলার ঝাঁপা ইউনিয়নের হানুয়ার গ্রামের চাষি গোলাম মোস্তফা, দোদাড়িয়া গ্রামের আব্দুল মজিদ ও আব্দুল আজিজ জানান, পানির সমস্যার কারণে এবার পাট নিয়ে চরম বিপাদে পড়েছি। স্থানীয় ডোবার নোংড়া পানিতে পাট জাগ দিয়ে পাটের রং নষ্ট হয়ে গেছে। যে কারণে বাজারে প্রতিমন পাটে ৭ থেকে ৮শ টাকা কম পেতে হচ্ছে। তবে পাটকাঠির রংয়ের তেমন কোন পরিবর্তন হয়নি। চলতি মৌসুমে পাট কাঠির দাম অনেক বেশি। তাইতো পাট ধুয়ে পাটকাঠির গুরুত্ব দিয়ে রোদে শুকানো হচ্ছে। এবার প্রতি আঁটি পাটকাঠি এলাকায় বিক্রি করেছেন ৪৫ থেকে ৫০ টাকা করে। ইতিমধ্যে পাটের ক্ষতি পাটকাঠিতেই উঠে গেছে। তবে সব মিলিয়ে এবার আমাদের পাটকাঠিই বাঁচিয়ে দিয়েছে বলে জানান এ কৃষকেরা।
চালুয়াহাটি ইউনিয়নের রামনাথপুর গ্রামের কৃষক আব্দুল ওয়াদুদ ও মোবারকপুর ইচানি গ্রামের চাষি টুটুল হোসেন ও রাজগঞ্জ কলেজপাড়া গ্রামের চাষি নজরুল ইসলাম জানান, পাটকাঠি আমাদের গ্রামাঞ্চলে সবচেয়ে বেশি ব্যবহার হয়ে থাকে। মাটির চুলায় রান্নার প্রধান জ্বালানি হিসেবে পাটকাঠির ব্যবহার বেশি হয়ে থাকে। বর্তমানে তারা প্রতি আঁটি পাটকাঠি ৫০টাকা বিক্রি করছেন। পাটকাঠিই তাদের এবার বাঁচিয়ে দিয়েছে বলে জানান এ কৃষকেরা।
এব্যাপারে রাজগঞ্জ অঞ্চলের দিনমজুর আজিজুর রহমান, আফাল উদ্দিন ও মোশারফ হোসেন জানান, চলতি মৌসুমে পাটকাঠির আকাশ ছোঁয়া দাম শুনে বেশ হতাশ হয়ে পড়েছি। পাটকাঠি মাটির চুলায় রান্নার জন্য খুবই দরকার। আর প্রতিটা বাড়িতেই পাটকাঠি না হলেই যেন চুলায় জ্বলে না। সেই পাটকাঠির আকাশ ছোঁয়া দাম শুনে পাটকাঠি কেনার কথা ভুলেই গেছি। তবে চলতি মৌসুমে পাটকাঠির দাম তাদের মত গরীবের ক্রয় ক্ষমতার ভিতরেই থাকলে ভাল হতো। তাহলে বাড়ির গৃহিনীদের সবচেয়ে বেশি পছন্দ সেই পাটকাঠি সবাই ক্রয় করে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করতে পারতো।
রাজগঞ্জ অঞ্চলের পাট ব্যবসায়ী মিজানুর রহমান সরদার ও নজরুল ইসলাম জানান, বাজারে পর্যাপ্ত পরিমানে পাট আসছে। পানির তীব্র সংকটের কারণে পাটের গুণগতমান ভাল না হওয়ায় চলতি মৌসুমে দাম একটু কম আছে। বর্তমান বাজারে নিম্মমানের পাট বিক্রি হচ্ছে ২২ থেকে ২৩০০টাকা মন। আর একটু উন্নত মানের পাট বাজারে বিক্রি হচ্ছে ২৪ থেকে ২৫০০টাকা মন। তবে দ্রুত সময়ের মধ্যে বৃহত্তর এ পাটের বাজারে পাটের দাম আরো বাড়তে পারে বলে জানান এ দুই ব্যবসায়ী।
এব্যাপারে উপজেলা সহকারি উদ্ভিদ সংরক্ষন কৃষি কর্মকর্তা তবিবুর রহমান জানান, বাড়ির গৃহিনীদের জ্বালালি হিসাবে সব সময় চাহিদা থাকে পাটকাঠি। এছাড়া বাড়ি ঘরের বেড়া, পটল ক্ষেত ও সবজি ক্ষেতের বেড়া, মাচা, এলাকার পানের বরজসহ নানান কাজে পাটকাঠির ব্যবহার প্রাচীনকাল থেকে হয়ে আসছে। একারণে এবার পাটকাঠির দাম একটু বেশি বলে মনে করেন এ কৃষি কর্মকর্তা।
রাজগঞ্জ অঞ্চলের চাষিরা পাটের ক্ষতি পুষিয়ে নিলেন পাটকাঠি বিক্রি করে

