নুসরাত জামান:
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের সকল প্রস্ততি সম্পন্ন করা হয়েছে। সারাদেশের ন্যায় যশোরের ৬ টি সংসদীয় আসনে এক যোগে ভোট গ্রহণ করা হচ্ছে। আজ ভাগ্য নির্ধাণ হবে জেলার ৩৪ প্রার্থীর। সকাল ৭ টা থেকে ভোট গ্রহণ শুরু এবং তা বিরতিহীনভাবে চলবে বিকাল ৪ টা পর্যন্ত। নির্বাচন অবাদ সুষ্ঠু ও শান্তিপুর্ণ পরিবেশে শেষ করার জন্য নেয়া হয়েছে নজিরবিহীন নিরাপত্তা ব্যবস্থা। নির্বাচনী মাঠে সার্বক্ষনিক নজরদারিতে থাকছে সামরিক আধা সামরিক ও র্যাবের সমন্বিত টহল দল। এছাড়াও থাকছে ভ্রাম্যমান আদালতে একাধিক টিম।
যশোরের ৬টি আসনে প্রতিদ্বন্ধি ৩৪ প্রার্থীর মধ্যে ৩৩ জনই নতুন মুখ। এর আগে তারা কেউই সংসদে পা রাখেননি।একমাত্র প্রার্থী নাজিম উদ্দিন আল আজাদ এরশাদ সরকারে আমলে যশোর-৪ আসন থেকে এমপি এবং মন্ত্রী হয়েছিলেন। তিনি এবার স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে লড়ছেন। অপর ৩৩ প্রার্থীর মধ্যে প্রতিদ্বন্ধিতায় রয়েছেন ১৩ জন প্রার্থী। যশোর-৫ মণিরামপুরে ত্রিমুখী লড়াই এবং অপর ৫ টি আসনে ধানের শীষ দাড়িপাল্লার মধ্যে হড্ডা হাড্ডি লড়াইয়ের আভাস পাওয়া গেলেও সদর আসনের চিত্র ভিন্ন।
এ আসনে ধানের শীষের প্রার্থী অনিন্দ ইসলাম অমিত সুবিধাজনক আবস্থানে রয়েছেন বলে দাবি করেছেন তার সর্মাথকরা। অপর দিকে জামায়াত সমার্থিতদের দাবি শহরে তাদের যাই থাকুক ইউনিয়ন পর্যায়ে তাদের অবস্থান সুদৃঢ়। জামায়াতের মুল ভরসা নারী ভোটার।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে দীর্ঘকাল জোটে থাকা বিএনপি জামায়াত আলাদাভাবে নির্বাচন করায় তাদের পুরোন জোটের ভোট দুই শিবিরে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। এমন অবস্থায় জয় নিশ্চিত করতে ভাসমান বা অন্য শিবিরের ভোট অত্যাবশ্যকীয় হয়ে দাড়িয়েছে তাদের। তাই উভয় পক্ষের নজর আওয়ামী লীগের ভোট ব্যাংকে। সেই বিবেচনায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ বা তাদের দোসররা বিএনপি-জামায়াতের জয় পরাজয়ের নিয়ামক হয়ে উঠেছে। উভয় পক্ষই তাদের কাছে ধর্ণা দিচ্ছেন ভোটের জন্য।সূত্র মতে যারা কেন্দ্রে আওয়ামী লীগের ভোট বেশী তুলতে পারবেন এবার তাদের জয় সুনিশ্চিত।
যশোর-১ (শার্শা) আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন বিএনপির নুরুজ্জামান লিটন, জামায়াতে ইসলামীর মুহাম্মদ আজীজুর রহমান, জাতীয় পার্টির জাহাঙ্গীর আলম চঞ্চল ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের বখতিয়ার রহমান।
যশোর-২ (ঝিকরগাছা-চৌগাছা) আসনে রয়েছেন বিএনপির সাবিরা সুলতানা, জামায়াতে ইসলামীর মোহম্মদ মোসলেহ উদ্দিন ফরিদ, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের ইদ্রিস আলী, বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ) প্রার্থী ইমরান খান, স্বতন্ত্র প্রার্থী মেহেদী হাসান, বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট ফ্রন্ট (বিএনএফ) প্রার্থী শামছুল হক এবং আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি) প্রার্থী রিপন মাহমুদ।
যশোর-৩ (সদর) আসনে আছেন বিএনপির হেভিওয়েট প্রার্থী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, জামায়াতে ইসলামীর আব্দুল কাদের, জাতীয় পার্টির খবির গাজী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মুহাম্মদ শোয়াইব হোসেন,জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা) প্রার্থী নিজামদ্দিন অমিত ও বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টি (বাসদ) প্রার্থী রাশেদ খান।
যশোর-৪ (বাঘারপাড়া-অভয়নগর) আসনে লড়ছেন বিএনপির মতিয়ার রহমান ফারাজী, জামায়াতে ইসলামীর গোলাম রসুল, স্বতন্ত্র এম নাজিম উদ্দীন আল আজাদ, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের বায়েজীদ হোসাইন, খেলাফত মজলিসের মাওলানা আশেক এলাহী, জাতীয় পার্টির জহুরুল হক ও বাংলাদেশ মাইনরিটি জনতা পার্টি (বিএমজেপি) প্রার্থী সুকৃতি কুমার মন্ডল।
যশোর-৫ (মণিরামপুর) আসনে বিএনপির রশীদ ওয়াক্কাস। জামায়াতে ইসলামীর গাজী এনামুল হক, জাতীয় পার্টির এম এ হালিম, ইসলামী আন্দোলনের জয়নাল আবেদিন, স্বতন্ত্র শহীদ মো. ইকবাল হোসেন।
যশোর-৬ (কেশবপুর) আসনে বিএনপির আবুল হোসেন আজাদ, জামায়াতে ইসলামীর মুক্তার আলী, জাতীয় পার্টির জি এম হাসান, এবি পার্টির মাহমুদ হাসান, ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের শহিদুল ইসলাম।
জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যশোর জেলার ৬টি আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ২৪ লাখ ৭১ হাজার ৯০৮জন। জেলার ৯৩ টি ইউনিয়ন ও ৮টি পৌর সভায় ৮২৪ ভোট কেন্দ্রের ৪ হাজার ৬৭৯ ভোট কক্ষে ১৪ হাজার ৮৬১ ভোট গ্রহণকারী কর্মকর্তা দায়িত্ব পালন করবেন। এর মধ্যে প্রিজাইডিং অফিসার ৮২৪, সহপ্রিজাইডিং অফিসার ৪ হাজার ৬৭৯ ও পোলিং অফিসার ৯ হাজার ৩৫৮।
এদিকে ভোটারদের নির্বিঘেœ শান্তিপুর্ণ পরিবেশে ভোট প্রদানের জন্য নিরাপত্তা বলায়ের পাশাপশি জেলার ছয়টি আসনে ৮২৪টি ভোট কেন্দ্রে সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। সেইসাথে কেন্দ্রে দায়িত্বে থাকা পুলিশ সদস্যদের বডি ক্যামেরা রাখার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। তবে অতি গুরুত্বপূর্ণ ৭১টি কেন্দ্রসহ মোট ৩০২টি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে বাড়তি নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছেন প্রশাসন। জেলায় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় দায়িত্ব পালন করবে ১৪ হাজার ৬২ পুলিশ, আনসার সেনাবাহিনী ও এয়ারফোর্সের সদস্য। এর সাথে থাকবে র্যাবের পেট্রোল টিম, বিজিবির প্লাটুন। সেই সাথে থাকবে ২০০ স্ট্রাইকিং ফোর্স ও মোবাইল টিম।
যশোর নির্বাচন অফিস সূত্রে জানাযায়, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৮২৪ কেন্দ্রের ৪ হাজার ৬৭৯ কক্ষে ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। ৮২৪ প্রিজাইডিং অফিসার দায়িত্ব পালন করবেন। এতে ৪ হাজার ৬৭৯ সহপ্রিজাইডিং অফিসার, ৯ হাজার ৩৫৮ পোলিং অফিসার।
এর মধ্যে যশোর-১ (শার্শা) আসনে ১০২ কেন্দ্রের দায়িত্বে থাকবেন ১০২ প্রিজাইডিং অফিসার, ৫৭৭ কক্ষে ৫৭৭ সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার ও ১ হাজার ১৫৪ পোলিং অফিসার দায়িত্ব পালন করবেন।
যশোর-২ (চৌগাছা-ঝিকরগাছা) আসনে ১৭৫ কেন্দ্রের দায়িত্বে থাকবেন ১৭৫ প্রিজাইডিং অফিসার, ৯০৫ কক্ষে ৯০৫ সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার ও ১ হাজার ৮১০ পোলিং অফিসার দায়িত্ব পালন করবেন।
যশোর-৩ (সদর) আসনে ১৯০ কেন্দ্রের দায়িত্বে থাকবেন ১৯০ প্রিজাইডিং অফিসার, ১ হাজার ১৮৩ কক্ষে ১ হাজার ১৮৩ সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার ও ২ হাজার ৩৬৬ পোলিং অফিসার দায়িত্ব পালন করবেন। যশোর-৪ (বাঘারপাড়া-অভয়নগর) আসনে ১৪৮ কেন্দ্রের দায়িত্বে থাকবেন ১৪৮ প্রিজাইডিং অফিসার, ৮৬৯ কক্ষে ৮৬৯ সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার ও ১ হাজার ৭৩৮ পোলিং অফিসার দায়িত্ব পালন করবেন।
যশোর-৫ (মণিরামপুর) আসনে ১২৮ কেন্দ্রের দায়িত্বে থাকবেন ১২৮ প্রিজাইডিং অফিসার, ৭২০ কক্ষে ৭২০ সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার ও ১ হাজার ৪৪০ পোলিং অফিসার দায়িত্ব পালন করবেন। যশোর-৬ (কেশবপুর) আসনে ৮১ কেন্দ্রের দায়িত্বে থাকবেন ৮১ প্রিজাইডিং অফিসার, ৪২৫ কক্ষে ৪২৫ সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার ও ৮৫০ পোলিং অফিসার দায়িত্ব পালন করবেন।
যশোরের পুলিশ সুপার সৈয়দ রফিকুল ইসলাম বলেন, পুলিশের পক্ষ থেকে সকল প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। প্রত্যেক ভোট কেন্দ্রে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাথে তিনজন করে পুলিশ সদস্য উপস্থিত থাকবেন। দুই শতাধিক স্ট্রাইকিং ফোর্স থাকবে। গুরুত্বপূর্ণ ভোট কেন্দ্রগুলোতে তিনজন করে অস্ত্রধারী পুলিশ সদস্য থাকবে। প্রত্যেকটি ভোটকেন্দ্রে ১৩জন করে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা থাকবেন। ভোট শেষ না হওয়া পর্যন্ত তারা কেন্দ্রগুলোতে দায়িত্ব পালন করবেন। ৭১ জন পুলিশ সদস্যের শরীরে স্থাপন করা থাকবে ক্যামেরা। সুরক্ষা অ্যাপসের মাধ্যমে ওই ক্যামেরায় ধারণকরা ফুটেজ সকল সদস্য দেখতে পারবে। কোথায় কোন গোলযোগ হলে রিজার্ভ ফোস সেখানে দ্রুততার সাথে পৌঁছাবে। ১১ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৬ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে মোবাইল কোর্ট কাজ করবে।
যশোর জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং অফিসার আশেক হাসান বলেন, ভোটকেন্দ্রগুলোতে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। এই প্রথম শতভাগ ভোটকেন্দ্র নজরদারির আওতায় এসেছে। অতি গুরুত্বপূর্ণ ও গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে নেওয়া হয়েছে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা। ভোটকেন্দ্রে স্বশস্ত্র পুলিশ, আনসার, নির্বাহী ও বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেটসহ স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে সেনাবাহিনী, র্যাব ও বিজিবি দায়িত্ব পালন করবে। পাশাপাশি বডি ক্যামেরা নিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা মাঠে থাকবে।
তিনি আরও বলেন, যশোর ৬টি আসনে ভোট কেন্দ্রের নিরাপত্তা ও ভোটের কাজে নিয়োজিত থাকবে ১৫ হাজারের বেশি কর্মকর্তা কর্মচারী। ১১ ডিসেম্বর থেকে ১১ জন এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট কাজ করে যাচ্ছেন, আজ থেকে আরও ৪০ জন এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট ঢাকা থেকে এসেছে। তারাও সোমবার থেকে কার্যক্রম শুরু করবে। ৬টি আসনের বিপরীতে ২ জন করে ১২ জন জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট কাজ করবে।

