বুধবার, ৪ঠা ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ২১শে মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ, ১৬ই শাবান, ১৪৪৭ হিজরি

শিশুসন্তানসহ স্ত্রীর মরদেহ যশোর কারাগারে: শেষ বিদায় জানালেন ছাত্রলীগ নেতা সাদ্দাম

আরো খবর

 শহিদ জয়:
বাগেরহাটে ৯ মাসের শিশুসন্তানকে পানিতে চুবিয়ে হত্যার পর নিজে আত্মহত্যাকারী কানিজ সুবর্ণা স্বর্ণালীর মরদেহ ও তার শিশুসন্তানের মরদেহ যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারে আনা হলে কারাবন্দি স্বামী ছাত্রলীগ নেতা জুয়েল হাসান সাদ্দাম স্ত্রী ও সন্তানকে শেষবারের মতো দেখার সুযোগ পান।
শনিবার (২৪ জানুয়ারি) সন্ধ্যার দিকে কঠোর নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে মা ও শিশুর মরদেহ যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারে নেওয়া হয়। কারাগারের ভেতরে মরদেহ দুটি নেওয়া হলে সাদ্দামকে শেষবারের মতো তার স্ত্রী ও শিশুসন্তানকে দেখার সুযোগ দেওয়া হয়।
এ সময় তিনি স্ত্রীকে ছুঁয়ে দেখেন এবং জীবনে প্রথমবার নিজের শিশুসন্তানকে কোলে নেন। তবে তখন শিশুটি মৃত ছিল। পুরো দৃশ্যটি ছিল হৃদয়বিদারক ও বেদনাদায়ক।
এর আগে শুক্রবার (২৩ জানুয়ারি) দুপুরে বাগেরহাট সদর উপজেলার সাবেকডাঙ্গা গ্রামে এই মর্মান্তিক ঘটনাটি ঘটে। নিহত স্বর্ণালী কারাবন্দি সাদ্দামের স্ত্রী এবং নিহত শিশু তাদের ৯ মাস বয়সী সন্তান।
স্বজনদের ভাষ্য, স্বর্ণালী তার স্বামীকে অত্যন্ত ভালোবাসতেন। দীর্ঘদিন ধরে স্বামী কারাবন্দি থাকায় তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। স্বামীর মুক্তির জন্য বিভিন্নভাবে চেষ্টা করেও কোনো অগ্রগতি না হওয়ায় হতাশায় ভুগছিলেন তিনি।
স্বজনরা আরও জানান, চরম হতাশার একপর্যায়ে স্বর্ণালী প্রথমে বালতিতে থাকা পানিতে তার ৯ মাসের শিশুকে চুবিয়ে হত্যা করেন। এরপর নিজেও গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করেন।
পরিবার সূত্রে জানা গেছে, সাদ্দামের বাড়িতে তার মা, বোন, স্ত্রী ও সন্তান একসঙ্গে বসবাস করতেন। কারাবন্দি অবস্থায় সাদ্দাম মাঝে মাঝে স্ত্রীকে চিরকুট পাঠাতেন এবং দ্রুত মুক্তি পাওয়ার আশ্বাস দিতেন। এসব বিষয় স্বর্ণালীর ওপর মানসিক চাপ আরও বাড়িয়ে দেয়।
যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারের জেলার আবিদ আহম্মেদ জানান, সাদ্দামকে গত ১৫ ডিসেম্বর যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারে আনা হয় এবং তিনি বর্তমানে বিভিন্ন মামলায় সেখানে আটক রয়েছেন। সব নিয়ম মেনে সন্ধ্যার পর মরদেহ দুটি কারাগারে আনা হয়। শেষ দেখা শেষে সাদ্দামকে আবার তার নিজ ওয়ার্ডে পাঠানো হয়।

সূত্র জানায়,প্রায় পাঁচ বছর আগে প্রেম করে বিয়ে করেন কানিজ সুবর্ণা স্বর্ণালী ও নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের বাগেরহাট সদর উপজেলা সভাপতি জুয়েল হাসান সাদ্দাম। তাদের দাম্পত্য জীবনে জন্ম নেয় সেহজাদ হোসেন নাজিফ নামে ফুটফুটে একটি পুত্রসন্তান।গত ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে যান জুয়েল হাসান সাদ্দাম। এর মধ্যেই নয় মাস আগে জন্ম হয় তাদের একমাত্র সন্তান নাজিফের।
জন্মের পর বাবার আদর থেকে বঞ্চিত হয় ছোট্ট নাজিফ। এমনকি সন্তানকে একবার কোলে নেওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষাও অপূর্ণ থেকে গেল সাদ্দামের। কারাগার থেকে স্ত্রীকে লেখা একটি চিঠিতে সন্তানকে কোলে নিতে না পারার গভীর বেদনার কথা উল্লেখ করেছিলেন সাদ্দাম। কিন্তু সেই আশা আর পূরণ হলো না তার।
স্বামীকে কারাগার থেকে মুক্ত করতে না পারার হতাশা শেষ পর্যন্ত কেড়ে নেয় কানিজ সুবর্ণা স্বর্ণালী ও তার শিশুসন্তানের জীবন।

শনিবার (২৪ জানুয়ারি) বিকেলে শেষবারের মতো স্ত্রী ও সন্তানকে এক নজর দেখতে মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় যশোর কারাগারের জেলগেটে। তবে স্থানীয় এলাকাবাসী এ মৃত্যুকে রহস্যজনক বলে দাবি করছেন। তারা ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত দোষীদের বিচারের দাবি জানিয়েছেন।

স্থানীয় বাসিন্দা রিবা বেগমসহ অনেকে জানান, হাসি-খুশির একটি পরিবার মুহূর্তেই শেষ হয়ে গেছে। এমন মৃত্যু তারা মেনে নিতে পারছেন না। তাদের ভাষ্য, এটি হত্যা নাকি আত্মহত্যা, তা নিয়ে রহস্য রয়েছে। তারা সঠিক তদন্তের মাধ্যমে ঘটনার প্রকৃত রহস্য উদ্‌ঘাটনের দাবি জানান।

মৃত কানিজ সুবর্ণা স্বর্ণালীর ভাই শুভ হাওলাদার বলেন, আমার বোনের স্বামী সাদ্দামের প্যারোলে মুক্তির বিষয়ে আমরা মৌখিকভাবে বাগেরহাট জেলা প্রশাসনকে জানিয়েছিলাম।
জেলা প্রশাসন থেকে জানানো হয়, যেহেতু তিনি যশোর কারাগারে বন্দি, বিষয়টি যশোর জেলা প্রশাসন দেখবে। সময় স্বল্পতার কারণে আমরা পারিবারিকভাবে সিদ্ধান্ত নিই, শেষবারের মতো জেল গেটে স্ত্রী ও সন্তানের মরদেহ দেখানো হবে।

বাগেরহাট জেলা প্রশাসক গোলাম মো. বাতেন বলেন, যেহেতু সাদ্দাম যশোর কারাগারে রয়েছেন, প্যারোলে মুক্তির বিষয়টি যশোর জেলা প্রশাসনের এখতিয়ার। এ বিষয়ে আমাদের করার কিছু নেই।

বাগেরহাট সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মাসুম খান বলেন, সাদ্দামের স্ত্রী ও সন্তানের মৃত্যুর ঘটনায় বাগেরহাট সদর মডেল থানায় একটি হত্যা মামলা ও একটি অপমৃত্যুর মামলা রেকর্ড করা হয়েছে। নিহত কানিজ সুবর্ণা স্বর্ণালীর বাবা রুহুল আমিন হাওলাদার বাদী হয়ে অজ্ঞাত আসামিদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। এ ছাড়া পুলিশ বাদী হয়ে একটি অপমৃত্যুর মামলা করেছে। ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

গতকাল শুক্রবার বাগেরহাটে ৯ মাসের শিশু সন্তান নাজিম হোসেনকে পানিতে চুবিয়ে হত্যার পর ঝুলন্ত অবস্থায় মা কানিজ সুর্বণা স্বর্ণালীর লাশ উদ্ধার করা হয়। তারা বাগেরহাট সদর উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি জুয়েল হাসান সাদ্দামের স্ত্রী ও সন্তান। তিনি বর্তমানে বিভিন্ন মামলায় কারাগারে রয়েছেন।

আরো পড়ুন

সর্বশেষ