সাতক্ষীরা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আমিনুল ইসলাম টুকুর বিরুদ্ধে ভূয়া ভাউচার তৈরি করে প্রায় অর্ধ কোটি টাকা আত্মসাত, শিক্ষকদের হয়রানি ও শাস্তিমূলক বদলী করতে ষড়যন্ত্র এবং নৈতিক স্খলনের অভিযোগ উঠেছে। এই ঘটনায় ফুঁসে উঠেছে বিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা।
শিক্ষকরা অনিয়ম দুর্নীতির প্রতিবাদ করায় কয়েকজন শিক্ষককে জেলার বাইরে বদলি করতে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ ও হুমকি দেওয়ায় প্রধান শিক্ষক আমিনুল ইসলাম টুকুর বিরুদ্ধে বিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষক জিডি করেছেন।
তথ্য অনুসন্ধ্যানে জানা গেছে, সাতক্ষীরা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে বিগত ২০২৪ সাল পর্যন্ত আইসিটি বিভাগে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে আদায়কৃত নয় লক্ষ এবং ২০২৫ সালে একই বিভাগের শিক্ষার্থীদের নিকট আদায়কৃত আনুমানিক পাচ লক্ষ টাকাসহ মোট ১৪ লক্ষ টাকা ব্যাংকে জমাকৃত ছিল। এই টাকা থেকে ৪৪ হাজার টাকা জমা রেখে বাকি টাকা বিভিন্ন খরচ দেখিয়ে ভুয়া ভাউচারের মাধ্যমে তুলে আত্মসাৎ করেছেন প্রধান শিক্ষক আমিনুল ইসলাম টুকু ।
এদিকে, ২০১৯ সালে আমিনুল ইসলাম টুকু অধিদপ্তরে পরিচালক হিসেবে কর্মরত থাকা অবস্থায় তৎকালীন প্রধান শিক্ষককে বাধ্য করে সাতক্ষীরা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের ফান্ড থেকে তিন লাখ টাকা নিয়ে গ্রামের বাড়ি খুলনা জেলার পাইকগাছায় তার পিতার নামে/স্মরণে ‘চেতনা ‘৭১’ মামে অনুষ্ঠানের আয়োজন করার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
প্রকাশ না করার শর্তে বিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষক জানিয়েছেন, ২০২৪ সালে বিদ্যালয়ের নামে ব্যাংক পুরাতন হিসাবে থাকা ১০ লক্ষাধিক টাকা ভূয়া বিল-ভাউচার তৈরি করে ব্যাংক থেকে উত্তোলন করে আত্মসাতের অভিযোগ করেছেন বর্তমান প্রধান শিক্ষক আমিনুল ইসলাম টুকু।
অপরদিকে, ২০২৪ সাল ও ২০২৫ সালে শিক্ষা অধিদপ্তর থেকে বরাদ্দকৃত টাকা বিদ্যালয়ের কল্যাণে খরচ না করে আনুমানিক ১০ লক্ষ টাকা আত্মসাৎ করার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে । এখানেই শেষ নয় তার ক্ষমতার দাপট এতটা লাগামহীন ছিলো যে তিনি ২০১৯ সালে শিক্ষা অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক থাকাকালীন সময়ে দাফট দেখিয়ে সাতক্ষীরা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষককে চাপে ফেলে বিদ্যালয়ের তিন লক্ষ টাকা নিয়ে তার গ্রামের বাড়ি পাইকগাছা উপজেলায় পিতার নামে ‘ চেতনায় ৭১’ নামে অনুষ্ঠানে করে । ওই অনুষ্ঠানে সাতক্ষীরা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পাইকগাছায় নিয়ে যাওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
আমিনুল ইসলাম টুকুর ভাই তারিকুল ইসলাম উজ্জ্বল নাটোর জেলায় পুলিশ সুপার হিসেবে কর্মরত থাকাকালীন সময়ে ৫টি হত্যা মামলায় বর্তমানে পলাতক। তার পিতা পাইকগাছায় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ছিলেন।
অভিযোগকারী শিক্ষকরা জানিয়েছেন, প্রধান শিক্ষক আমিনুল ইসলাম টুকু দুর্নীতি ও আত্মসাতের মাধ্যমে অর্জিত টাকা দিয়ে সাতক্ষীরা শহরের মধ্যকাটিয়া এলাকায় তিনতলা আলীশান বাড়ি নির্মাণ করেছেন। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে খুলনায় দুই কোটি টাকা দিয়ে জমি কিনেছেন। এছাড়া, ঢাকায় তিনি একাধিক জমির প্লট ও ফ্লাটের মালিক।
অপরদিকে, বিগত সরকার ক্ষমতায় থাকাকালীন সময়ে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক থাকাকালীন সমেয় দুর্ণীতি করার কারণে দুদকের তিনটি মামলার তদন্তে প্রমাণিত হওয়ায় শাস্তিমূলক বদলী হিসেবে বাগেরহাটের ফকিরহাট সৈয়দ মহল্লা খোদেজা খাতুন সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক হিসেবে তাকে শাস্তিমূলক বদলী করা হয়।
সম্প্রতি প্রধান শিক্ষক আমিনুল ইসলাম টুকুর বিরুদ্ধে বিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থী তার সাথে অনৈতিক যৌন সসম্পর্ক করার অভিযোগ তুলে গণমাধ্যমের বক্তব্য দেয়।
শিশু শিক্ষার্থীকে ওষুধ খাইয়ে অনৈতিক যৌন সম্পর্ক এবং অর্থ আত্মসাতের বিষয়ে বিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষক মুখ খুললে তাদের মধ্য থেকে ১০ জনের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরে অভিযোগ করেন।
এদিকে, শিক্ষকের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ ও বদলির চেষ্টা করার প্রতিবাদে শিক্ষকরা প্রতিবাদ করলে তাদেরকে বিভিন্নভাবে হুমকি দিচ্ছেন প্রধান শিক্ষক আমিনুল ইসলাম টুকু।
সাতক্ষীরা জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার আলমগীর কবির বলেন, সাতক্ষীরা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে দুর্নীতি অনিয়ম সংক্রান্ত অভিযোগ হাতে পেলে কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা করা হবে।
সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক ও বিদ্যালয় ব্যবস্থা কমিটির সভাপতি মিজ, আফরোজা আক্তারের সাথে এসব বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, সাতক্ষীরা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে কোনভাবেই শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট করা যাবে না। প্রধান শিক্ষক আমিদুল ইসলাম টুকুর বিরুদ্ধে অভিযোগ পেলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
খুলনা বিভাগীয় মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের পরিচালক বলেন, এ বিষয়ে আমাদের হাতে কোন অভিযোগ এখনো আসেনি। অভিযোগ পাওয়া গেলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
অভিযুক্ত সাতক্ষীরা সরকারি উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আমিনুল ইসলাম টুকু তার বিরুদ্ধে আনীত দুর্নীতি, অর্থ আত্মসাৎ, অনিয়ম ও নৈতিক স্খলনঞ্জলিত বিষয়ে
অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, বিদ্যালয়ের অসৎ কয়েকজন শিক্ষক ও তার প্রতিপক্ষরা সামাজিকভাবে তাকে হেয় প্রতিপন্ন করার জন্য এসব প্রপাগান্ডা চালাচ্ছে।

