একাত্তর ডেস্ক সরকার এ মুহূর্তে সেন্ট মার্টিনের হারিয়ে যাওয়া জীববৈচিত্র্য পুনরুদ্ধারে জোর দিচ্ছে বলে জানিয়েছেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান।
তিনি আরও বলেন, সেন্ট মার্টিনে পর্যটন হবে স্থানীয় জনগোষ্ঠীকেন্দ্রিক। সেন্ট মার্টিন ও পর্যটন ব্যবসা সমার্থক হতে পারে না।
মঙ্গলবার (৬ জানুয়ারি) রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে সেন্ট মার্টিন নিয়ে মহাপরিকল্পনার ওপর আয়োজিত এক কর্মশালায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে পরিবেশ উপদেষ্টা এ কথা বলেন।
রিজওয়ানা হাসান বলেন, এই মুহূর্তে দ্বীপের সংরক্ষণ ও এর জীববৈচিত্র্য আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনাকে সরকারের অগ্রাধিকার বলে উল্লেখ করেন রিজওয়ানা হাসান। একই সঙ্গে এ দ্বীপের বাসিন্দাদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করার ওপরও জোর দেন তিনি।
পরিবেশ উপদেষ্টা বলেন, ‘৮ হাজার মানুষের এ দ্বীপে প্রতিদিন যদি ১০ হাজার পর্যটক যায়, স্বাভাবিকভাবেই চিন্তা করেন দ্বীপের মানুষের খুশি হওয়ার কোনো কারণ নাই। কারণ, পর্যটকেরা স্থানীয়দের প্রাইভেসির ওপর একটা প্রভাব ফেলবে।’
দ্বীপের বাসিন্দাদের বিকল্প কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে কৃষি মন্ত্রণালয় এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় একটা ভূমিকা রাখবে বলে আশা প্রকাশ করেন রিজওয়ানা হাসান। বিকল্প কর্মসংস্থান তৈরিতে হস্তশিল্প, মাছ ধরার পাশাপাশি পর্যটন ব্যবস্থাপনাও একটি বিকল্প হতে পারে বলে জানান তিনি।
তবে পরিবেশ উপদেষ্টা বলেন, ‘ট্যুরিজম হবে নিয়ন্ত্রিত এবং অবশ্যই নিয়ন্ত্রিত। দ্বীপটাকে বাঁচিয়ে রাখার স্বার্থে এ কাজগুলো করতে হবে। এ দ্বীপের একটা অংশ এর মধ্যে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের মুখে এমনিতে এ দ্বীপ অস্তিত্ব সংকটে আছে। আর অনিয়ন্ত্রিত অর্থনৈতিক কার্যক্রম এ সংকটকে ত্বরান্বিত করছে।’
সেন্ট মার্টিন বিভক্ত হবে চার এলাকায়
সেন্ট মার্টিন নিয়ে খসড়া মহাপরিকল্পনা তৈরি করেছে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীন সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সার্ভিসেস (সিইজিআইএস)। কর্মশালায় খসড়া মহাপরিকল্পনার উপস্থাপনা তুলে ধরেন সিইজিআইএসের জ্যেষ্ঠ বিশেষজ্ঞ এইচ এম নুরুল ইসলাম।
নুরুল ইসলাম বলেন, সেন্ট মার্টিনকে চার ভাগে ভাগ করার সুপারিশ করা হয়েছে খসড়া মহাপরিকল্পনায়। এর মধ্যে একটি হবে ‘জেনারেল ইউজ জোন’। এখানে পর্যটনসহ অন্যান্য সাধারণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড চালানো যাবে। এ জোনে সব হোটেল, রিসোর্ট চলে আসবে। এরপর আছে ‘ম্যানেজড রিসোর্স জোন’। এ জোনে কচ্ছপের প্রজনন হয়। এখানে দিনে পর্যটকেরা ঘুরে বেড়াতে পারবেন। রাতে থাকতে পারবেন না। স্থানীয় লোকজন এখানকার কোনো প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহার করতে পারবেন না।
আরেকটি হলো ‘সাসটেইনেবল ইউজ জোন’। এ জোনে প্রাকৃতিক ঝোপঝাড় (বুশল্যান্ড), লেগুন (জলাধার) ও ম্যানগ্রোভ বন আছে। স্থানীয় লোকজন এ জোনের প্রাকৃতিক সম্পদ টেকসই পদ্ধতিতে কতটুকু ব্যবহার করতে পারবে, সেটা সরকার নির্ধারণ করে দেবে। এখানেও পর্যটকেরা দিনে ঘুরে দেখতে পারবেন, কিন্তু রাতে থাকতে পারবেন না। সর্বশেষ হলো ‘রেস্ট্রিক্টেড জোন’। এ জোনের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় কাউকে এখানে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হবে না।
কর্মশালায় পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের সচিব ফারহিনা আহমেদ বলেন, ‘সেন্ট মার্টিন রক্ষায় কী করতে হবে, সেটা বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। এ দ্বীপের টেকসই ব্যবস্থাপনার জন্য মূলত এ মহাপরিকল্পনা। মনে রাখতে হবে, ন্যাচার অব কোর্সে (প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মে) এ দ্বীপ গড়ে উঠেছে। এ দ্বীপের ক্ষতি করার কোনো অধিকার আমাদের কারোরই নেই।’
সেন্টমার্টিনের সৈকতে ভেসে এসেছে মৃত মা কচ্ছপ। ছবি: ইত্তেফাকসেন্টমার্টিনের সৈকতে ভেসে এসেছে মৃত মা কচ্ছপ। ছবি: ইত্তেফাক
পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. কামরুজ্জামান গত সপ্তাহে সেন্ট মার্টিনে তার ভ্রমণ অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন, ‘আমি ঘুরে দেখে যেটা বুঝলাম, এ দ্বীপের জীববৈচিত্র্য ফিরে আসছে।’ এ দ্বীপে প্রকৃতিবান্ধব স্থাপনা নির্মাণের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
এ মহাপরিকল্পনায় সহায়তা দেওয়া জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) বাংলাদেশের ডেপুটি রেসিডেন্ট রিপ্রেজেন্টেটিভ সোনালী দায়ারত্নে বলেন, ‘সেন্ট মার্টিনের মতো জীববৈচিত্র্যসমৃদ্ধ একটি দ্বীপের সংরক্ষণ পরিকল্পনায় আমরা সহযোগিতা দিতে পেরে আনন্দিত।’
সূত্র:ইত্তেফাক

