একাত্তর ডেস্ক:সময়ের অতল গহবরে হারিয়ে গেল আরও একটি বছর। আরেকটি নতুন বছরের অভিষেক হলো রেখা বিশ্ববাসীর সামনে। বর্ষপঞ্জির পাতা বদলালেও পেছনে রয়ে গেছে রক্ত, অশ্রু, প্রতিবাদ আর প্রত্যাশার স্মৃতি। ২০২৫ সাল ছিল জাতীয় জীবনে প্রশ্নবিদ্ধ মানবিকতা-ন্যায়বিচার ও গণতন্ত্রের বিষয়ে এক গভীর ক্ষত। এ বছর ৯ জুলাই ঢাকার মিটফোর্ডে পাথর মেরে সোহাগ হত্যাকা- আমাদের বিবেককে নাড়িয়ে দেয়। প্রকাশ্য সহিংসতা, আইনের প্রতি অবজ্ঞা এবং নগরজীবনের নিরাপত্তাহীনতা এই ঘটনায় প্রকট হয়ে ওঠে।
অন্যদিকে ২১ জুলাই উত্তরার মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর প্রশিক্ষণ যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হয়। এতে পাইলটসহ মোট ৩৬ জন শিক্ষার্থী নিহত এবং আহত হন ১৭২ জন। নিষ্পাপ শিশুদের প্রাণহানি রাষ্ট্রীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক অবহেলা, নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সুরক্ষা নিয়ে কঠিন প্রশ্ন তোলে। এসব ঘটনায় শুধু শোক নয়, প্রয়োজন ছিল দায়িত্ব নির্ধারণ, জবাবদিহিতা আদায় ও দৃষ্টান্তমূলক বিচার। যাতে আর কোনো পরিবার এমন ক্ষতির মুখে না পড়ে। ২০২৫ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালে শেখ হাসিনার ফাঁসির রায় ছিল ইতিহাসের এক নাটকীয় সূচনা।
কারও কাছে এটি দীর্ঘদিনের জুলুম-অত্যাচারের করুণ পরিণতি, আবার রাজনৈতিক সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর কাছে প্রতিহিংসার মহকাব্য। তবে যাই হোক, বাংলাদেশের মানবতাবাদী মানুষেরা মনে করেন, এ রায় আগামী দিনের শাসক শ্রেণিকে বারবার মনে করিয়ে দেবে জনগণকে শাসন করা ক্ষমতাসীন দলের কাজ নয়, বরং জনগণের সুখে-দুঃখে পাশে দাঁড়ানোই রাজনীতিবিদদের ধ্যানজ্ঞান হওয়া উচিত।
বিচারপ্রক্রিয়ার পরবর্তী ধাপগুলোও যেন সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা, ন্যায্যতা ও আন্তর্জাতিক মানদন্ডে পরিচালিত হয়। নচেৎ বিচার নিজেই প্রশ্নবিদ্ধ হবে। ইনকিলাব মঞ্চের তরুণ বুদ্ধিদীপ্ত রাজনীতিক শরিফ ওসমান হাদি গত ১২ ডিসেম্বর গুলিবিদ্ধ হয়ে ১৮ ডিসেম্বর সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শাহাদাতবরণ করেন।
এ ঘটনা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ময়দানে ব্যাপক উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে, যা চলমান। হাদির হত্যাকা- তরুণ সমাজের নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক সহনশীলতার সংকটকে সামনে এনেছে। অন্যদিকে প্রায় দুই দশক পর তারেক রহমানের দেশে প্রত্যাবর্তন রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ ও সম্ভাবনার নতুন দিগন্তের ইঙ্গিত দিচ্ছে। দীর্ঘ নির্বাসনের পর তাঁর ফেরা গণতন্ত্রকামী কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে আশাবাদ জাগিয়েছে, পাশাপাশি দায়িত্বশীল রাজনীতির চ্যালেঞ্জও বাড়িয়েছে।
বছরের একেবারে শেষ সময়ে সবচেয়ে বেদনাদায়ক অধ্যায় ছিল সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ইন্তেকাল। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব ও ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন আপোসহীন নেত্রী। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে তাঁর নাম ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লিপিবদ্ধ থাকবে। এই মৃত্যু আমাদের শেখায় সকল রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে মানবিকতা ও দেশের স্বার্থে আমাদেরকে অনুগামী হয়ে সহনশীল হতে হবে।
নতুন বছর ২০২৬-এর ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এই নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হবে এটাই জাতির দেড় যুগের প্রত্যাশা। মহান সৃষ্টিকর্তার কাছে আমাদের প্রার্থনা সামাজিক ন্যায়বিচার, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা, দায়িত্বশীল ও গঠনমূলক রাজনৈতিক চর্চা, আগামী দিনে টেকসই গণতন্ত্রের যাত্রাপথকে সুগম করবে। এমন ন্যায়ভিত্তিক বাংলাদেশ গড়ে তোলাই হোক আমাদের স্বপ্ন।

