শুক্রবার, ১৬ই জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ২রা মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ, ২৭শে রজব, ১৪৪৭ হিজরি

হাইকোর্টের আদেশ উপেক্ষা করে যশোরের ৭ নদীতে ৯ সেতু

আরো খবর

বিশেষ প্রতিনিধি: হাইকোর্টের আদেশকে উপেক্ষা করে যশোরের ৭ নদীতে নির্মাণ করা হচ্ছে ৯টি সেতু। যা নিয়ে শুরু হয়েছে ব্যাপক তোলপাড়। অভিযোগ উঠেছে ওই সেতু নির্মাণের ক্ষেত্রে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনের নির্দেশনা মানা হয়নি। অন্য দিকে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন এবং
বিআইডব্লিউটিএ-এর অনাপত্তিপত্রও নেয়া হয়নি বলে অভিযোগে প্রকাশ।
সেতুগুলো যেভাবে নির্মাণ করা হচ্ছে, তাতে নৌপথগুলো সম্পূর্ণরুপে বন্ধ হয়ে যাবে বলে
বিআইডব্লিউটিএ লিখিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে।

যশোরের জেলাপ্রশাসক ও জেলা নদী রক্ষা কমিটির সভাপতি মোহাম্মদ আবরাউল হাছান মজুমদার
সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘বিভিন্ন সোর্স থেকে আমরা বিষয়গুলো জেনেছি এবং
সেভাবে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি। যেভাবে নির্দেশনা আসবে, সেভাবে
আমরা কাজ করব।’
ওয়েস্টার্ন বাংলাদেশ ব্রিজ ইমপ্রুভমেন্ট প্রজেক্টের(ডব্লিউবিবিআইপি) আওতায় ৪৩ কোটি টাকা ব্যয়ে কম উচ্চতার এই ৯টি
সেতু নির্মাণ করছে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) যশোর।

সূত্র জানায়, মনিরামপুর উপজেলার টেকারঘাট এলাকায় টেকা নদীর ওপর পুরানো
সেতু ভেঙে নতুন সেতু নির্মাণ করা হচ্ছে। পানি থেকে এই সেতুর উচ্চতা
খুবই কম। একই উপজেলার হরিদাসকাটি ইউনিয়নে মুক্তেশ্বরী নদীর দেড়
কিলোমিটারের মধ্যে কম উচ্চতার দুটি নতুন সেতুর নির্মাণ কাজ চলছে। এর
মধ্যে সুবলকাঠি সেতুর নির্মাণ শেষে এখন চলছে সংযোগ-সেতু নির্মাণের
কাজ। হাজরাইল সেতুর নির্মাণ চলমান। দুটি সেতু নির্মাণ করতে মুক্তেশ্বরী
নদীতে আড়াআড়িভাবে মাটির বাঁধ দেওয়া হয়েছে। একই উপজেলার নেহালপুর
এলাকায় শ্রী নদীর ওপর সেতু নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে। মনিরামপুর ও চিনাটোলা
এলাকায় হরিহর নদের ওপর পুরোনো সেতু ভেঙে কম উচ্চতায় দুটি সেতু নির্মাণ
করা হচ্ছে।
সদর উপজেলার দাইতলা এবং বাঘারপাড়া উপজেলার ছাতিয়ানতলায় ভৈরব নদের
ওপর নির্মিত পুরানো দুটি সেতু ভেঙে সেখানে কম উচ্চতার দুটি সেতু
নির্মাণ করা হচ্ছে। বাঘারপাড়া উপজেলার খাজুরা ও সীমাখালীতে চিত্রা নদীর ওপর কম
উচ্চতার একটি সেতু নির্মাণকাজ চলছে।

বিআইডব্লিউটিএ সূত্রেমতে, যেসব নদীর ওপর সেতু নির্মাণ করা হচ্ছে নিয়ম
অনুযায়ী সেগুলোর কোনোটির ক্ষেত্রে সেতুর উচ্চতা হওয়ার কথা পানির স্তর থেকে
গার্ডারের নিচ পর্যন্ত ১৬ ফুট, কোনোটির ২৫ ফুট।
কিন্তু যে ৯টি সেতু নির্মাণ করা হচ্ছে তার সবকটির উচ্চতা ৪ দশমিক ৫৯ ফুট থেকে ১১ দশমিক ৫০
ফুট পর্যন্ত। ২০২০ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি তুরাগ নদীর অবৈধ দূষণ ও দখল রোধে
নতুন প্রকল্প প্রণয়নের ক্ষেত্রে হাইকোর্ট রায়ের ৫ নম্বরে এলজিইডিসহ সংশ্লিষ্ঠ
সকলকে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের অনাপত্তিপত্র গ্রহণ করার নির্দেশনা প্রদান করেন।

আর এর আগে থেকেই সেতু নির্মাণ করতে হলে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন
কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) থেকে নেভিগেশনাল ক্লিয়ারেন্স নেয়া
বাধ্যতামূলক রয়েছে। বিআইডব্লিউটিএ থেকে এসব সেতুর উচ্চতা নিয়ে
দফায় দফায় আপত্তি জানানোর পরও তা আমলে নেওয়া হয়নি।
বিআইডব্লিউটিএ-এর বিভিন্ন প্রতিবেদন ও চিঠিপত্রে উল্লেখ করা হয় : ‘যেসব স্থানে সেতু
নির্মাণ করা হচ্ছে, সেগুলো নৌপথের অন্তর্ভুক্ত এবং নৌযান চলাচলের জন্য অত্যন্ত
গুরুত্বপূর্ণ। এসব নৌপথে বর্তমানে ছোট ছোট নৌযান চলাচল করলেও ভবিষ্যতে
বড় বড় নৌযান চলাচল করতে পারবে।

সেতু নির্মাণের জন্য এলজিইডি যশোর কর্তৃক বিআইডব্লিউটিএ কর্তৃপক্ষ হতে কোনো ছাড়পত্র গ্রহণ করা হয়নি, যা
অত্যন্ত দুঃখজনক। বর্তমানে সেতুগুলো যেভাবে নির্মাণ করা হচ্ছে, তাতে এসব
নৌপথগুলো সম্পূর্ণরুপে বন্ধ হয়ে যাবে। নিচু হওয়ার কারণে বর্ষা মৌসুমে
এসব সেতুর নিচ দিয়ে বড় নৌযান চলাচল করতে পারবে না। কার্যত অকার্যকর
হয়ে পড়বে নৌপথগুলো।’ এর আগে, অপরিকল্পিত এসব সেতু নির্মাণ বন্ধ করে নদী
বাঁচানোর দাবি জানিয়েছিল যশোরের পাঁচটি পরিবেশবাদী সংগঠন। তারা
প্রধানমন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্ঠ দপ্তরে স্মারকলিপিও প্রদান করে।
ভৈরব নদ সংস্কার আন্দোলনের উপদেষ্টা ইকবাল কবির জাহিদ বৃহস্পতিবার জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যানের সাথে সরাসরি দেখা করেন এবং লিখিতভাবে উল্লেখ করেন, ‘ভৈরব নদসহ এসব নদী প্রবাহমান থাকার সাথে নৌ-
চলাচল, নওয়াপাড়া বন্দর, মোংলা বন্দর ও সুন্দরবন রক্ষা এবং এলাকার জীববৈচিত্র্যের
প্রশ্ন জড়িত। কিন্তু এলজিইডি-এর নির্বাহী প্রকৌশলী উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে
হাইকোর্টের রায়, গেজেট না মেনে, জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন ও
বিআইডব্লিউটিএ-এর ছাড়পত্র গ্রহণ না করে ঘোষিত নীতিমালার বিরুদ্ধে
কাজ করছে।

এর ফলে পানিপ্রবাহই বাঁধাগ্রস্থ হবে না, নদী সংস্কারের লক্ষ্যও জলাঞ্জলি
হয়ে যাবে। যার ফলে অর্থই শুধু অপচয় হবে না, আবারও ব্রিজগুলো ভাঙার প্রশ্ন
আসবে। এই জাতীয় কার্যক্রম সরকারের ভাবমূর্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যান ড. মনজুর আহমেদ চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেন, একেকটা ব্রিজ ৫০-১০০ বছরের লক্ষ্য সামনে রেখে করা হয়। কারণ পানির উচ্চতা একফুট বাড়লে কী হবে? বিআইডব্লিউটিএ-এর হাইট, লেনথ
মানতেই হবে। আমাদের কমিশনের কাছ থেকেও এনওসি নিতে হবে। কিন্তু যশোরের
৯টি ব্রিজের ক্ষেত্রে এর কিছুই মানা হয়নি। হাইকোর্টের আদেশকেও অবজ্ঞা করা
হয়েছে। আমরা কেবিনেট ডিভিশন এবং এলজিইডি-কে বিষয়টি জানাব।

এলজিইডি-এর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শরিফুল ইসলাম বলেন, এসব ব্রিজের ডিজাইন ঢাকা থেকে করা বলে আমাদের কিছুই করার নেই। আর ব্রিজ নির্মাণের জন্য জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের এনওসি নেয়ার নিয়ম নেই। তবে বিআইডব্লিউটিএ-এর ছাড়পত্র নেয়া হয়নি। এদিকে নিয়ম নীতি না মেনে সেতু নির্মাণ করা জনমনে নানা প্রশ্নের উদ্রেক হয়েছে।

 

 

আরো পড়ুন

সর্বশেষ