ফারুক রহমান, সাতক্ষীরা:
চলতি বোরো মৌসুমে জলাবদ্ধতার শিকার হয়ে সাতক্ষীরা জেলার ৫৬ হাজার হেক্টর জমিতে কৃষকের বোরো আবাদ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। বর্তমানে জেলার অধিকাংশ বিল ডুবে রয়েছে। সেখানে এখন থৈ থৈ করছে পানি। পনি নিষ্কাশনের পথ বন্ধ ও অপরিকল্পিতভাবে মাছের ঘের কৃষকের বোরো আবাদ অনিশ্চিয়তায় ফেলে দিয়েছে। এরই মধ্যে আমন বঞ্চিত কৃষক বোরো চাষের প্রস্তুতি নিচ্ছে। জেলার ৭টি উপজেলায় কৃষকরা এখন বীজতলা প্রস্তুত করতে ব্যস্ত সময় পার করছে।
সরজমিনে জানা যায়, জলাবদ্ধতায় জেলার প্রায় ৫৬ হাজার হেক্টর নিচু জমিতে বোরোর আবাদ করা সম্ভব হচ্ছে না। জেলার মোট এক লক্ষ ৭৭ হাজার ৮১৪ হেক্টর জমির মধ্যে আবাদযোগ্য জমির পরিমাণ প্রায় এক লক্ষ ৩১ হাজার ৭৮৮ হেক্টর। স্থায়ী পতিত জমি প্রায় ৪৫ হাজার ১১০ হেক্টর। চাষযোগ্য জমির মধ্যে মাঝারি ও নিচু জমির পরিমাণ ৪৬ হাজার ৮০৪ হেক্টর। এই জমির বেশির ভাগ অংশ এখনও পানির নিচে। চলতি মৌসুমে সাতক্ষীরায় ৭৬ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে কৃষি বিভাগ। জলাবদ্ধতার কারণে ৫৫ হাজার ৭৮৮ হেক্টর জমিতে এবার বোরো চাষ অনিশ্চিত।
সাতক্ষীরা সদর উপজেলার ফিংড়ি গ্রামের কৃষক আবিদুল ইসলাম, নুরুল শেখ ও আসাদুল ইসলাম অভিযোগ করে বলেন, ‘খাল, বিল ও নদীতে বাঁধ দিয়ে মাছ চাষ করায় পানি নিষ্কাশনের পথ বন্ধ হয়ে গেছে। রবি মৌসুমে ধান, আলু, কপি, পেঁয়াজ, বেগুন, টমেটো, গম, খেশারীসহ বিভিন্ন ফসলের চাষ করি। জলাবদ্ধতার কারনে এখন আর রবিশস্য চাষ সম্ভব হচ্ছে না।
ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা জানান, জেলার সর্ববৃহৎ বিল দাঁতভাঙা, মালিনি, হাজিখালি, বুড়ামারা, পালিচাঁদ, চেলারবিল, ডাইয়ের বিল, ঘুড্ডির বিল, কচুয়ার বিল, ঢেপুর বিল, লাবসার বিল, বল্লীর বিল ও পদ্মবিলসহ অর্ধশতাধিক বিল এখনও ফসল শূন্য। এসব বিলের পানি নিষ্কাশনের পথ বেতনা, মরিচ্চাপ ও সীমান্তের ইছামতি নদী। নদীগুলো বিল ছাড়া উঁচু হয়ে গেছে। ফলে প্রতি বছর বিলগুলো জলাবদ্ধতায় ডুবে থাকছে। এতে আমনের পাশাপশি বোরো আবাদও অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে। সাতক্ষীরা জেলা কৃষি বিভাগের হিসাবে জানা গেছে, জেলার মোট ১৪ লক্ষ ৩৪ হাজার ২০০ জন মানুষ সরাসরি কৃষির সাথে জড়িত। বোরো আবাদের সাথে প্রায় ১০ লক্ষ মানুষ জড়িত।
জেলা কৃষি বিভাগ বলছে, সাতক্ষীরা জেলায় ৩ লক্ষ ৮১ হাজার ৭৩০ হেক্টর ফসলি জমি আছে। এসব জমিতে ৩ লক্ষ ৫৮ হাজার ৫৫০টি পরিবার কৃষি কাজ করে থাকে। এর মধ্যে ভূমিহীন চাষি রয়েছে ৬৭ হাজার ২৩০ জন, প্রান্তিক চাষি এক লক্ষ ৩১ হাজার ৩৭টি, ক্ষুদ্র চাষি এক লক্ষ ৯৫৭, মাঝারি চাষি ৪৪ হাজার ৮৪২ এবং বড় চাষি ১৪ হাজার ৪৮৪ জন। মোট ১৪ লক্ষ ৩৪ হাজার ২শ’ ব্যক্তি সরাসরি কৃষির সাথে জড়িত। এসব কৃষকের মধ্যে বর্তমান ােরো চাষের সাথে প্রায় ১০ লক্ষ মানুষ জড়িত।
সাতক্ষীরা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (খামারবাড়ি) সূত্র জানায়, চলতি বোরো মৌসুমে সাতক্ষীরায় ৭৬ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এবাই সবচেয়ে বেশি বোরো আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে সাতক্ষীরা সদর উপজেলায় এবং সবচেয়ে কম লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে শ্যামনগর উপজেলায়। এছাড়া অন্যান্য উপজেলাগুলোতে বোরো আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে যথাক্রমে- সদর উপজেলায় ২৩ হাজার ৪১০ হেক্টর জমিতে, হাইব্রিড জাতের ধানচাষের জন্য ৪ হাজার ৯১০ হেক্টর ও উফশী জাতের ধান চাষের জন্য ১৮ হাজার ৫০০ হেক্টর। কলারোয়ায় ১২ হাজার ৫৫০ হেক্টর। হাইব্রিড ২ হাজার ১৫০ হেক্টর ও উফশী ১০ হাজার ৪০০ হেক্টর। কলারোয়ায় ১৯ হাজার ৪৫০ হেক্টর। হাইব্রিড ৫ হাজার ৮৫০ হেক্টর ও উফশী ১৩ হাজার ৬০০ হেক্টর। দেবহাটায় ৫ হাজার ৯২০ হেক্টর। হাইব্রিড ২ হাজার ৮২০ হেক্টর ও উফশী জাতের ৩ হাজার ১০০ হেক্টর। কালিগঞ্জে ৫ হাজার ৫১০ হেক্টর। হাইব্রিড ১ হাজার ১০ হেক্টর ও উফশী ৪ হাজার ৫০০ হেক্টর। আশাশুনিতে ৭ হাজার ৪০০ হেক্টর। হাইব্রিড ৩ হাজার ৪০০ হেক্টর ও উফশী ৪ হাজার হেক্টর। এবং শ্যামনগর উপজেলায় ১ হাজার ৭৬০ হেক্টর। হাইব্রিড ৩৬০ হেক্টর ও উফশী ১ হাজার ৪০০ হেক্টর জমিতে চাষের জন্য লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। ৭টি উপজেলার ৭৬ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো আবাদের জন্য ৫০৫ হেক্টর জমি বীজতলা হিসেবে ব্যবহৃত হবে। ইতোমধ্যে ৪০০ হেক্টরেরও বেশি জমিতে বীজতলা প্রস্তত হয়েছে। মোট ১০০ হেক্টর বীজতলায় ১ হাজার ৬০০ হেক্টর জমি আবাদ হবে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (খামারবাড়ি) সাতক্ষীরা’র উপ-পরিচালক কৃষিবিদ নুরুল ইসলাম জানান, জেলায় চলতি মৌসুমে ৭৬ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। জলার ৭টি উপজেলার কৃষকদের পাশে কাজ করছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ইউনিয়ন পর্যায়ে দায়িত্বরত কৃষি কর্মকর্তারা। কৃষকদের েেকান প্রয়োজনে কৃষি কর্মকর্তারা পাশে থাকবেন।#

