শুক্রবার, ১৬ই জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ২রা মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ, ২৭শে রজব, ১৪৪৭ হিজরি

ঘূর্ণিঝড় মোখা নিয়ে উৎকন্ঠায় সাতক্ষীরার উপকূলর মানুষ

আরো খবর

সাতক্ষীরা প্রতিনিধি:ঘূর্ণিঝড় মোখার আঘাত নিয়ে উদ্বেগ আর উৎকন্ঠায় রয়েছে সাতক্ষীরার উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষ। বিশেষ করে শ্যামনগর, আশাশুনি ও কালিগঞ্জ উপজেলার মানুষ। এসব এলাকার বিস্তীর্ণ এলাকার বেঁড়বাঁধ এখনো অরক্ষিত ও ক্ষতিগ্রস্ত থাকায় এলাকাবাসী বিনিদ্র সময় পার করছেন। এদিকে, জেলা প্রশাসন, দূর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটি, স্থানীয় বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা পরিস্থিতি মোকাবেলায় প্রস্তুত রয়েছে।

প্রতি বছর একাধিক প্রাকৃতিক দূর্যোগের কারনে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সাতক্ষীরা উপকূল। ২০০৯ সালের আইলার পর গত ১৪ বছরে ডজনেরও অধিক বড় ধরণের প্রাকৃতিক দূর্যোগের কবলে পড়েছে এই জেলার মানুষ। ২০০৯ সালে ঘূর্ণিঝড় আইলা, ২০১৩ সালের মহাসেন, ২০১৫ সালে কোমেন, ২০১৬ সালে রোয়ানু, ২০১৭ সালে মোরা, ২০১৯ সালে ফনি, ২০১৯ সালে বুলবুল, ২০২০ সালে আমফান, ২০২১ সালে ইয়াস, ২০২২ সালে অশনি ও ঘূর্ণিঝড় সিত্রাং মোকাবেলা করেছে এই জেলার ক্ষতিগ্রস্ত অসহায় মানুষ।

এদিকে, প্রতিবছরই ছোট-বড় মিলিয়ে ৩ থেকে ৪টি প্রাকৃতিক দূর্যোগ হানা দেয় উপকূলবর্তী জেলা সাতক্ষীরায়। ফলে উপকূলবর্তী তিন উপজেলা (শ্যামনগর-কালিগঞ্জ ও আশাশুনি) সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বছরের বিভিন্ন সময় প্রাকৃতিক দূর্যোগে সৃষ্ট নদীভাঙনে গত কয়েক বছরে সহস্রাধিক ঘরবাড়ি, মসজিদ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ কৃষিজমি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। ধীরে ধীরে ছোট হয়ে আসছে এসব উপজেলার উপকূলবর্তী অধিকাংশ গ্রাম। ফলে একদিকে নি:স্ব হয়েছে উপকূলীয় জনপদেদর মানুষ। অপরদিকে সব হারিয়ে বাস্তুচ্যুত হয়ে জলবায়ু উদ্বাস্তু হচ্ছে অনেক মানুষ। বিগত কয়েক বছরে প্রাকৃতিক দুর্যোগের মাত্রা বৃদ্ধি পাওয়ায় দিশেহারা হয়ে পড়েছে উপকূলের মানুষ। একিট দূর্যোগের ক্ষত কাটিয়ে উঠতে না উঠতে আর একটি দূর্যোগ এসে পড়ছে।

এই মুহূর্তে চোখ রাঙাচ্ছে ঘূর্ণিঝড় মোখা। ভাবাচ্ছে উপকূলবর্তী এ জেলার ২২ লক্ষ মানুষকে। ইতিমধ্যে আবহাওয়া অধিদপ্তর ঘূর্ণিঝড় মোখাকে কেন্দ্র করে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, মংলা ও পায়রা সমুদ্র বন্দরকে ৮ নম্বর দূরবর্তী হুশিয়ারি সংকেট দেখিয়েছে।’

আবহাওয়া অধিদপ্তরের এই পূর্বাভাসের পর থেকে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন সাতক্ষীরা উপকূলের কয়েক লাখ মানুষ। যদিও উপকূলে এখনও নির্মিত হয়নি টেকসই বেড়িবাঁধ। ফলে ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে ভারী বর্ষণ আর জোয়ারের পানি বেড়ে গেলে উপকূলের জরাজীর্ণ ও দুর্বল বাঁধগুলো কত সময় টিকে থাকবে তা নিয়ে আশঙ্কায় রয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

উপকূলবাসীরা বলেন, ঝড়ে যত ক্ষতি করে তার চেয়ে বেশি ক্ষতি হয় নদীরক্ষা বাঁধ ভাঙ্গার কারণে। দূর্বল বাঁধের কারণে জলোচ্ছ্বাসে ভেসে যায় ফসল, সম্পদ ও ঘরবাড়ি। জীবন বাঁচানোর তাগিদে প্রতিকূল পরিবেশের সঙ্গে যুদ্ধ করতে হয় তাদের। দূর্যোগের হাত থেকে রক্ষা পেলেও বাঁচার জন্য নতুন করে শুরু করতে হয় সংগ্রাম। বসতভিটাসহ গবাদি পশু ও আবাদি জমি হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পথে বসতে হয় বহু পরিবারকে। প্রতিবছর জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বন্যার হার, তীব্রতা এবং স্থায়িত্ব সাতক্ষীরা উপকূলে বেড়েই চলছে। এতে এখানকার মানুষের জীবন ও জীবিকার সঙ্গে বিভিন্ন অবকাঠামোর ক্ষতি হচ্ছে দাবি করে তারা বলেন, সরকারি ও বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা সেই সময় তাদের সাহায্য করলেও দুর্যোগ-পরবর্তী সময় সবকিছু হারিয়ে তারা নি:স্ব হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করে। স্থায়ীভাবে যদি বাঁধ মেরামত করা হয় তাহলে স্বস্তি ফিরবে উপকূলী জনপদে।

সাতক্ষীরার ভাঙন কবলিত শ্যামনগর, আশাশুনি ও কালিগঞ্জ উপজেলাতে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, লবণাক্ততা এবং প্রন্ড গরমে বেড়িবাঁধ ফেটে চৌচির হয়ে গেছে। বালুযুক্ত জরাজীর্ণ বাঁধে বৃষ্টির পানি পড়লেই তা গলে যেতে শুরু করে। জোয়ারের পানির চাপ বাড়লে বাঁধ ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা। বেড়িবাঁধের বিভিন্ন স্থানে সংস্কারের কাজ চললেও বেশ কিছু স্থান এখনো মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে সৃষ্ট জোয়ারের চাপ মোকাবিলায় সক্ষম না।
শ্যামনগর উপজেলার দ্বীপ ইউনিয়ন গাবুরার বাসিন্দা রহিম কয়াল, আবদুল আলিম, হালিমা খাতুন, মনিরা বেগম বলেন, এই ইউনিয়নের চকবারা, লেবুবুনিয়া, হরিষখালীসহ কয়েকটি এলাকার বেড়িবাঁধের ৮টি পয়েন্ট ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। ঝড়ের পূর্বে যদি ওই বাঁধ সংস্কার করা না হয় তাহলে ওই ইউনিয়নের একাধিক গ্রাম প্লাবিত হবে।

বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়নের আবদুর রহিম সানা বলেনন, বর্তমানে বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়নের দুর্গাবাটির তিনটি পয়েন্ট ও দাতিনাখালীর একটি পয়েন্ট মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে এসব এলাকার বেড়িবাঁধ ভেঙে প্লাবিত হতে পারে। ইতিমধ্যে স্থানীয়দের মাঝে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে।

আশাশুনি উপজেলার প্রতাপনগর ইউনিয়নের কোলা গ্রামের সুকুমার দাস, অনুকূল রঞ্জন, আনারুল ইসলাম বলেন, আমাদের ইউনিয়নের রুইয়ারবিল, কুড়িকাউনিয়া, সুভদ্রাকাটি, চাকলা, মাদারবাড়িয়া এলাকার বেশ কিছু পয়েন্ট অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। দ্রুতসময়ের ভিতরে যদি ওইসমস্ত এলাকার বাঁধ মেরামত করা না হয় তাহলে বড়ধরণের ক্ষতির সম্ভাবনা রয়েছে।

সাতক্ষীরা পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো-১) নির্বাহী প্রকৌশলী সালাউদ্দীন বলেন, আমাদের ডিভিশনের ৩৮০ কিলোমিটার বেড়িবাঁধের মধ্যে তিন কিলোমিটার অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে আমরা চিহ্নিত করেছি। ইতোমধ্যে ওই ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধের সংস্কার কাজ শুরু হয়েছে। বড় কোন ধরণের দূর্যোগ না আসলে বাঁধ ভাঙার কোন আশঙ্কা নেই।

আরো পড়ুন

সর্বশেষ