সাতক্ষীরা প্রতিনিধি:বছরে একাধিকবার প্রাকৃতিক দূযোগ মোকাবেলা করতে করতে ক্লান্ত সাতক্ষীরা জেলার উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষ। এর প্রভাবে কর্মসংস্থান সংকটে স্থানান্তর হচ্ছে অনেক পরিবার।
ঘূর্ণিঝড় সিডর-আইলার এক দশক পরে ২০২০ সালের ২০ মে ঘুর্ণিঝড় আম্পানের প্রভাবে উপকূলের বাঁধ ভেঙে লাখ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
উপকূলীয় এই জেলার মানুষ একের পর এক ঝড়, জলোচ্ছ্বাস আর নদীভাঙনে ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার আগেই আবার মুখোমুখি হচ্ছে প্রাকৃতিক দুর্যোগের। এই কারণে উপকূলের মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে।
এদিকে, বিশ্বব্যাংক প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উপকূলে কাজের সংস্থান না হওয়ায় অনেকে পরিবার ছেড়ে চলে যাচ্ছে অন্যত্র। স্বাধীনতার পর থেকে বিভিন্ন সময় বাংলাদেশে যেসব ঘূর্ণিঝড় আঘাত হেনেছে এর প্রভাবে মানুয়ের বাড়িঘর, জমি ধ্বংস হয়েছে। এতে মানুষ কর্মের জন্য ঢাকামুখী হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, জলবায়ুর পরিবর্তনের প্রভাবে বাংলাদেশের সমুদ্র উপকূলের প্রায় ২ কোটি মানুষ বিভিন্ন ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। সমুদ্রের উচ্চবৃদ্ধির ফলে লবণাক্ত পানি উপকূলের আবাসিক এলাকায় প্রবেশ করছে। এতে মিঠা পানির সংকট দেখা দিয়েছে। লবণাক্ত পানি পান করে এসব মানুষ দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ঢাকা শহরে বর্তমানে যত মানুষ বসবাস করে তার ৪০ শতাংশ প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে গ্রাম থেকে কর্মের সন্ধানে ঢাকায় এসেছে। এ রকম প্রায় ১ কোটি ৪০ লাখ মানুষের বসবাস এখন ঢাকায়। এদের মধ্যে ৭০ শতাংশ অর্থাৎ ৯৮ লাখ মানুষ তাদের বাড়িঘর ধ্বংস হওয়ায় শহরে আসতে বাধ্য হয়েছে। বিশেষ ঘূর্ণিঝড়, নদীভাঙন, প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে তারা শহরে এসেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, সমুদ্রের লোনা পানি সুন্দরবনের বিভিন্ন খাল ও নালা দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করছে। এতে সুন্দরবনের প্রাণ সুন্দর গাছ নষ্ট হচ্ছে। এর প্রভাবে সুন্দরবনের অস্বিত্ব হুমকির মুখে পড়েছে। উপকূলীয় এলাকায় আর্থিক সক্ষমতার অভাবে অনেক পরিবারের ছেলেমেয়েদের স্কুলে যাওয়া বন্ধ হচ্ছে। দারিদ্র্য বাড়ছে।
এতে বলা হয়, দারিদ্র্যদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বাস করে গ্রামে। এর মধ্যে উপকূলীয় এলাকায় দারিদ্র্য বেশি। এরপরেই শহরের আশেপাশে দারিদ্র্যদের বসবাস। তবে তুলনামূলকভাবে শহরে দারিদ্র্যদের বসবাস কম। দারিদ্র্যদের একটি বড় অংশ শহরের আশেপাশে থাকে। তারা সেখান থেকে শহরে এসে কাজ করে আবার আবাসস্থলে ফিরে যায়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ঘূর্ণিঝড়ের কারণে ক্ষয়ক্ষতি কমাতে বাংলাদেশের উপকূলে স্কুলগুলোকে কমিউনিটি সাইক্লোন শেল্টার হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এতে অনেক মানুষ ও সম্পদ রক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে। তবে এ খাতে বিনিয়োগ আরও বাড়াতে হবে। দুর্যোগ পরবর্তী সময়ে দ্রুত পুনর্বাসন ও ক্ষতিগ্রস্তদের স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে মেরামত ও পুনর্বাসন প্রক্রিয়া দ্রুত করতে হবে।
এতে বলা হয়, ভবিষ্যতের প্রয়োজন অনুযায়ী দুর্যোগ প্রতিরোধী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এজন্য উপকূলীয় অঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী অবকাঠামো নির্মাণ বাড়াতে হবে, যা ঘূর্ণিঝড়ের সময়ে আশ্রয় কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা সম্ভব হয়।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, উপকূলের পরিবেশ রক্ষায় সরকারকে জরুরি উদ্যোগ নিতে হবে। এজন্য প্লাস্টিকের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।
আশাশুনি উপজেলার কলেজ শিক্ষার্থী শারমিন সুলতানা বলেন, আমরা সাতক্ষীরার উপকূলীয় এলাকার মানুষ। আমাদের খাবার পানির অভাব। লবণাক্ততার কারণে ফসল উৎপাদন কম হয়। আবার বছরে একাধিকবার প্রাকৃতিক দুর্যোগের ফলে এখানকার মানুষ দেশের বিভিন্ন এলাকায় চলে যাচ্ছে কাজের সন্ধানে।
শ্যামনগর উজেলার দাতিনাখালি গ্রামের পরিবেশকর্মী শেফালী বেগম, আমাদের এই উপকূলীয় এলাকায় খাবার পানির অভাব প্রকট। তার উপর পতিত বছর কয়েকবার প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে আমাদের কাজের জায়গা কমে যাচ্ছে। এর ফলে মানুষ দেশের অন্য জায়গায় চলে যাচ্ছে। এবং প্রতি বছর তা বাড়ছে।
শ্যামনগর উপজেলার কালিঞ্চি গ্রমের আদিবাসী জেলে গোবিন্দ মুন্ডা বলেন, আমাদের পূর্বপুরুষেরা সুন্দরবনের নদী ও খালে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করতো। কিন্তু বর্তমানে বিগত এক দশকে কয়েকটি প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে এখন আর আগের মতো মাছ পাওয়া যায় না। এর ফলে আমাদের এখন উপার্জনের জন্য অন্য জেলায় কাজ করতে যেতে হচ্ছে।
তালা উপজেলার রোজিনা আক্তার ঝুমা বলেন, একদিকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ আর সুপেয় খাবার পানির অভাব। অন্য দিকে কর্মস্থান না থাকায় আমার এলাকার অনেক মানুষ অন্য জেলায় চলে যাচ্ছে।
আশাশুনি উপজেলার প্রতাপনগর গ্রামের দিনমজুর সুকুমার দাস বলেন, আমরা প্রতি বছর কয়েকবার নদীভাঙ্ন, ঘূর্ণিঝড়ের কবলে পড়ে অসহায় জীবনযাপন করছি। বর্তমানে কাজ নাই। এখন এলাকা ছেড়ে চলে যাওয়া ছাড়া কোনো উপায় নেই।
মানবাধিকার ও পরিবেশবাদী মাধব চন্দ্র দত্ত বলেন, বছরে একাধিকবার প্রাকৃতিক দুর্যোগের কবলে পড়ে কাজ ও পেশা হারাচ্ছে সাতক্ষীরার উপকূলীয় জনপদের মানুষ। তাদের বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি না হলে এলাকার মানুষের জলবায়ু উদ্বাস্তু হয়ে স্থানান্তরিত বৃদ্ধি পাবে। যা এই এলাকায় বিরূপ প্রভাব ফেলবে।
সাতক্ষীরা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী বলেন, আমরা চেষ্টা করছি সাতক্ষীরার উপকূলীয় আশাশুনি ও শ্যামনগর উপজেলার মানুষের জন্য সুপেয় পানি নিশ্চিত করতে বিভিন্ন প্রকল্প হাতে নিয়েছি।
