একাত্তর ডেস্ক: বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ এবং কমিউনিস্ট পার্টির সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। কমরেড মণি সিংহ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অত্যন্ত প্রিয়ভাজন ছিলেন। কংগ্রেস পার্টির আরেক নেতা মোহাম্মদ ফরহাদ ছিলেন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার অত্যান্ত বিশ্বস্ত। বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি এবং বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ দীর্ঘদিন একসাথে বিভিন্ন আন্দোলন করেছে। এদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামেও বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি আওয়ামী লীগের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করেছে। মুক্তিযুদ্ধের পর বঙ্গবন্ধুর ডাকে সাড়া দিয়ে কংগ্রেস পার্টি দেশ গড়ার সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। ৭৫ -এ বঙ্গবন্ধু যখন বাকশাল গঠন করেছিলেন তখন কংগ্রেস পার্টি তাতে যোগ দিয়েছিল।
পঁচাত্তরের ১৫ আগস্টের পর যখন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা পিতাকে হত্যা করা হয় তখন যে মুষ্ঠিমেয় রাজনৈতিক দলগুলো প্রতিবাদ করেছিল তাদের মধ্যে কমিউনিস্ট পার্টি ছিলো অন্যতম। কিন্তু পঁচাত্তরের পরবর্তীতে রাজনীতি বিনির্মাণ প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন ধাপে কংগ্রেস পার্টি থেকে বেশ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা আওয়ামী লীগে যোগদান করেছিলেন। বিশ্বব্যাপি কমিউনিজমের বিপর্যয় এবং কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে স্থবিরতা ইত্যাদি নানা বাস্তবতার কারণেই হয়তো তারা আওয়ামী লীগে যোগদান করেছিলেন। একটা সময় আওয়ামী লীগে কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যদের বাড়বাড়ন্ত ছিল এবং তারা অনেক প্রভাবশালী হয়ে উঠেছিল বিশেষ করে ওয়ান-ইলেভেনের পর কমিউনিস্ট পার্টির প্রভাব আওয়ামী লীগের মধ্যে অনেকখানি বেড়ে গিয়েছিল। কিন্তু সেই অবস্থা এখন আর নেই। আওয়ামী লীগের যারা কমিউনিস্ট পার্টি থেকে এসেছেন বা কমিউনিস্ট ছাত্রনেতা থেকে এসেছেন তাদের অবস্থা এখন খুব একটা সুবিধার নেই বলেই জানা গেছে। বিশেষ করে দলের নীতিনির্ধারণী ক্ষেত্রে কমিউনিস্ট পার্টি থেকে আসা আওয়ামী লীগারদের খানিকটা কোণঠাসাই মনে করা হয়। কমিউনিস্ট পার্টি, ছাত্র ইউনিয়ন থেকে আসা আওয়ামী লীগে যারা উল্লেখযোগ্য তাদের মধ্যে আছেন:
১. বেগম মতিয়া চৌধুরী: বেগম মতিয়া চৌধুরী আওয়ামী লীগের অত্যন্ত প্রভাবশালী নেতা ছিলেন। ওয়ান-ইলেভেনের সময় তিনি আওয়ামী লীগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নেতায় পরিণত হয়েছিলেন। শেখ হাসিনা সবচেয়ে বিশ্বস্ত এবং আস্থাভাজন ব্যক্তি হিসেবেও তাঁর পরিচিতি ছিলো। কিন্তু ২০১৮ সালের নির্বাচনের পর মন্ত্রিসভা থেকে বাদ পড়েন তিনি। আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়ামের সদস্য হলেও নীতিনির্ধারণী ব্যাপারে তার ভূমিকা অনেক কম বলেই জানা গেছে।
২. নূহ-উল-আলম লেলিন: নূহ-উল-আলম লেলিন কমিউনিস্ট পার্টি থেকে আওয়ামী লীগে এসে আওয়ামী লীগ সভাপতির একজন আস্থাভাজন রাজনীতিবিদে পরিণত হন। তিনি আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য হয়েছিলেন। আওয়ামী লীগের জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থনা ও প্রকাশনার দায়িত্ব তিনি পালন করেছেন। কিন্তু এখন তার প্রভাব প্রতিপত্তি দলের ভেতর নেই বললেই চলে। আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য হিসেবে তিনি টিকে আছে।
৩. নুরুল ইসলাম নাহিদ: বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি থেকে আসা নুরুল ইসলাম নাহিদ দুইদফা শিক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছিলেন। ২০১৯ সালের মন্ত্রিসভায় থেকে তাকে আর মনে রাখা হয়নি। তবে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য হিসেবে তিনি দায়িত্ব পালন করছেন। নুরুল ইসলাম নাহিদ একজন সজ্জন ব্যক্তি হলেও আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে তিনি খুব একটা প্রভাব বিস্তার করতে পারছেন না বলেই রাজনীতিবিদরা মনে করেন। তাছাড়া আওয়ামী লীগের মধ্যেই অনেকে মনে করেন যে, নুরুল ইসলাম নাহিদ কমিউনিস্ট পার্টি থেকে এসে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়ামের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদ কিভাবে পান। এনিয়ে দলের ভেতর নানারকম টানাপোড়েন রয়েছে বলে জানা গেছে।
৪. ইয়াফেস ওসমান: বুয়েটের ছাত্র ইউনিয়নের নেতা হিসেবে ইউকসুর ভিপি নির্বাচিত হয়েছিলেন ইয়াফেস ওসমান। তারপর তাঁর রাজনৈতিক অধ্যায়ে তেমন সরাসরি সম্পৃক্ততা দেখা যায় না। তবে তিনি ছাত্র ইউনিয়িনের রাজনীতির থেকেই এসেছেন। ২০০৯ সালের মন্ত্রিসভায় চমক হিসেবে আসেন এই স্থপতি। টানা তিন মেয়াদে যারা মন্ত্রী থাকছেন সেই বিরল সৌভাগ্যবান ব্যক্তিদের মধ্যে ইয়াফেস ওসমান একজন। তবে রাজনীতিতে বা সরকারে তাঁর ভূমিকা কতটুকু আছে সে নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
৫. আব্দুল মান্নান খান: ওয়ান-ইলেভেনের সময় আলোচনায় আসেন ছাত্র ইউনিয়ন থেকে আসা কমিউনিস্ট নেতা আব্দুল মান্নান খান। কিন্তু ২০০৯ সালের নির্বাচনে তিনি মনোনয়নও পান। নির্বাচনে জয়ের পর তাকে প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বও দেয়া হয়েছিল। কিন্তু এই দায়িত্ব ততটা সুষ্ঠুভাবে পালন করতে পারেননি বলেই অনেকে অভিযোগ করেন। এখন তিনি আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য। তার প্রেসিডিয়ামে থাকে নিয়েও আওয়ামী লীগের মধ্যে তুমুল বিতর্ক আছে। তবে প্রেসিডিয়াম সদস্য হলেও রাজনীতিতে তিনি ভূমিকাহীন এবং কর্তৃত্বহীন বলেই মনে করা মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
এরকম প্রধান ৫ জন নেতার যখন এই অবস্থা, তখন পুরো আওয়ামী লীগে কমিউনিস্ট পার্টি থেকে যেসব ছাত্র নেতা এসেছেন তাদের অবস্থা খুব একটা সুবিধার নেই বলেই রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন।
