পাইকগাছা (খুলনা) থেকে আলাউদ্দীন রাজা: জগদ্বিখ্যাত বিজ্ঞানী আশ্চর্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায় (পিসি রায়)ইংরেজি ১৮৬১ সালের ২ আগষ্ট বাং ১২৬৮ সালের ১৮ শ্রাবণ খুলনা জেলার পাইকগাছা উপজেলাধীন কপোতাক্ষ নদের তীরে রাড়ুলী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা হরিশচন্দ্র রায় ও মাতা ভুবন মোহিনী দেবী। পৃথিবীতে তিনি স্মরণীয় বরণীয় হয়ে আছেন।
আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায় ছিলেন একজন ব্যতিক্রমধর্মী মানুষ। তার ছিল বহুমুখী প্রতিভা। তিনি একজন আদর্শ শিক্ষক, বিজ্ঞান, শিল্প প্রতিষ্ঠান স্থাপনকার, রাজনীতিবিদ, সমবায়ী, সমাজ সংস্কারক, সাহ্যিতিক ও সর্বোপরি বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদের মূল প্রবক্তা। তার জন্ম গৌরবে শুধু তার জন্মভূমি দক্ষিণ খুলনায় অবহেলিত জনপদ পাইকগাছা থানার রাড়ুলী গ্রামই ধন্য হয়নি বরং সমগ্র ভারতবর্ষের মানুষ তাঁর গৌরবে গৌরবান্বিত।
তাঁর বহুমুখী গুণের মধ্যে সমাজ সংস্কারক। ধর্ম ও জাতিগত ভেদাভেদ বা হিন্দু সমাজের জাতিভেদ প্রথা অস্পৃশ্যতা আচার্যদেবকে ব্যাকুল করে তুলত। তিনি লক্ষ্য করেন সমগ্র ভারতে পাশ্চাত্য ভাব ও শিক্ষা বিস্তারের পর পুনা ও মাদ্রাজের ব্রাহ্মণ, বাংলার ব্রাহ্মণ, বৈদ্য, কায়স্থ এবং যুক্ত প্রদেশের অধিবাসী কাশ্মীর পন্ডিতদের মধ্য হতেই সাহিত্য, সমাজ ও রাজনীতি ক্ষেত্রে প্রসিদ্ধ ব্যক্তিদের উদ্ভব হয়েছে।
হিন্দু সমাজে মুষ্টিমেয় লোক ইহার মস্তিষ্ক, কিন্তু বিশাল জনসমষ্টি যারা এই সমাজের দেহ, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ তারা এই মস্তিষ্ক থেকে পৃথক এমন কি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।
নিম্নবর্ণের মানুষও যে অনেক মহৎ কাজ করেছে উদাহরণ দিতে যেয়ে তিনি ঢাকার জগন্নাথ কলেজ, সিলেটের মুরারী চাঁদ কলেজ ও ফরিদপুরের রাজেন্দ্র কলেজ সাহাদের বদান্যতায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বলেছেন । জাতিভেদের কারণে হিন্দুদের পশ্চাদপশারতার কারণ হিসেবে সমুদ্রযাত্রা নিষিদ্ধ একটা বড় কারণ হিসেবে নির্ণয় করেছেন।
তাঁর লেখনীর মাধ্যমে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের মানুষ জাতিভেদ প্রথা উঠিয়ে দিয়ে কিভাবে উন্নতির শিখরে উঠেছে দেখিয়েছেন। ইসলামের উদারতার কারণেই যে বহু হিন্দু এর সুশীতল ছায়ায় আশ্রয় নিচ্ছে একথাও তিনি তুলে ধরেছেন। আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয় সমাবর্তন উৎসবে ভাষণ দিতে যেয়ে তিনি বলেছেন, সমগ্র মানবজাতির ইতিহাসের দিকে তাকালে আমরা দেখি পক্ষপাতিত্ব, ধর্মীয় গোঁড়ামী তথা কারণ হীনতাই মানুষের প্রগতির সবচেয়ে বড় দুষমন এবং কর্তৃপক্ষের অনিষ্টকারক আত্মহননের প্রচেষ্টা এবং ধর্মীয় গোঁড়ামীই মানব চিত্ত বিকাশের প্রধান অন্তরায়।” ১৯৩২ সালে দেশবন্ধুর সভাপতিত্বে ফরিদপুরে কংগ্রেসের সভায় তিনি বলেন, “কুকুর বিড়াল আস্তাকুঁড় থেকে এসে ঘরের ভিতর প্রবেশ করলে আমাদের মনে কোন নীচ ভাব জাগে না, তথাপি অনুন্নত শ্ৰেণীকে আমরা চিরদিনই অধম ও ঘৃণ্য মনে করে পদদলিত ও একঘরে রেখে সমাজকে সবদিক থেকে দুর্বল ও যুগ ধরবার ব্যবস্থা করছি ।
” ১৯৩৩ খ্রিষ্টাব্দে মেদিনীপুর এক বহু পুরাতন মন্দিরে হরিজনদের প্রবেশাধিকার দেওয়ার জন্য এক সভায় তিনি পৌরহিত্য করেন । দৌলতপুর বি.এল কলেজে একবার এসে মুসলমান ছেলেদের হোস্টেলে তাদের ভরকারী চোখে দেখে টিকিধারী অধ্যাপকদের ভ্রুকুটি পড়েন। তার নিজের জন্মস্থান পাইকগাছা থানার নিম্নবর্ণের মেহের মুছল্লী, ইসলামী সাধক জাফর আউলিয়া, রায় সাহেব বিনোদ বিহারী সাধু, এবং ভীম চন্দ্র সরদারকে তিনি ভালবাসতেন। উত্তরবঙ্গের বন্যা পিড়িত মানুষের সেবাকার্যের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে যেয়ে তিনি বলেছেন, “মানুষের মনই তার সবচেয়ে বড় সম্পদ তাই মনের টানে যে বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে হোক সে হিন্দু মুসলমানের বন্ধুত্ব, হোক সে হিন্দু শিখের বন্ধুত্ব, যে বন্ধুত্বের জন্য কোন প্যাক্ট বা আলোচনার প্রয়োজন নেই।

