শনিবার, ১৭ই জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ৩রা মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ, ২৮শে রজব, ১৪৪৭ হিজরি

চৌগাছার সেই শিক্ষককে বরখাস্তের দাবিতে ছাত্রীদের বিক্ষোভ মিছিল

আরো খবর

চৌগাছা প্রতিনিধি:যশোরের চৌগাছা ছারা পাইলট বালিকা বিদ্যালয়ের ৬ষ্ট শ্রেণির ৭ছাত্রীকে শারীরিকভাবে নির্যাতনে অভিযুক্ত শরীর চর্চা শিক্ষক তসলিমুর রহমানকে স্কুল থেকে বরখাস্তের দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল করেছে ছাত্রীরা। পরে বিদ্যালয়ে অনাকাঙ্খিত ঘটনা এড়াতে প্রধান শিক্ষককে বিদ্যালয় ছুটি দিয়ে দেয়ার নির্দেশ দেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও বিদ্যালয়ের সভাপতি ইরুফা সুলতানা।
এদিকে শিক্ষক কর্তৃক ছাত্রীদের নির্যাতনের প্রমাণ পেয়েছে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তার নেতৃত্বাধীন এক সদস্যের তদন্ত কমিটি। শিক্ষা কর্মকর্তা এ বিষয়ে অভিযুক্ত শিক্ষকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার সুপারিশ করে তদন্ত প্রতিবেদন সোমবার দুপুরে বিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি ও চৌগাছা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে জমা দিয়েছেন।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মঙ্গলবার এ বিষয়ে নির্যাতিত শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবক এবং অভিযুক্ত শিক্ষকসহ বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্যদের নিয়ে শুনানি করে তদন্ত কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে জানা গেছে।
সোমবার (২১আগস্ট) সকালে স্কুলের প্রাত্যাহিক সমাবেশের পরপরই স্কুলের মধ্যে বিক্ষোভ দেখাতে শুরু করে ৬ষ্ট শ্রেণির শিক্ষার্থীরা। পরে তাদের সাথে যুক্ত হন কয়েকজন অভিভাবক। একপর্যায়ে অভিভাবকরা অভিযুক্ত শরীর চর্চা শিক্ষক তসলিমুর রহমানকে বিদ্যালয় থেকে বের হয়ে যেতে বাধ্য করেন। এরপর বেলা ১১টার দিকে ৬ষ্ঠ শ্রেণির ৩৫ থেকে ৪০ ছাত্রী স্কুল থেকে বের হয়ে চৌগাছা শহরের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে আবারও ছারা পাইলট বালিকা বিদ্যালয়ের মেইন গেইটে গিয়ে বিক্ষোভ করতে থাকে ছাত্রীরা। পরে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আবুল কালাম মোঃ রফিকুজ্জামান শিক্ষার্থীদের বুঝিয়ে ক্লাস রুমে ফিরিয়ে নিতে সক্ষম হন।
এরআগে রোববার বিদ্যালয়ের প্রাত্যাহিক সমাবেশ শুরুর সময় ওই শিক্ষক ৬ষ্ঠ শ্রেণির ১০/১২ জন ছাত্রীর গায়ে লাথি, চড়, থাপ্পড় মারা ছাড়াও দুই শিক্ষার্থীর স্কুল ড্রেস ছিড়ে দেন বলে অভিযোগ করে শিক্ষার্থীরা। এদিন বিদ্যালয় ছুটির পর বিকাল চারটার দিকে ৬ষ্ট শ্রেণির নির্যাতিত ৭ ছাত্রী ও তাদের অভিভাবকরা বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি চৌগাছা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার নিকট এ বিষয়ে প্রতিকার চেয়ে একটি লিখিত অভিযোগ করে।
অভিযোগ দেয়ার সময় বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক গোলাম মোস্তফা, জেষ্ঠ সহকারী শিক্ষক মাসুম কবীরসহ বিদ্যালয়ের ৫/৭ জন নারী ও পুরুষ শিক্ষক এবং নির্যাতিত ছাত্রীদের অভিভাবকরা উপস্থিত ছিলেন।
লিখিত অভিযোগে নির্যাতিত ছাত্রীরা বলে, ‘বিদ্যালয়ের সমাবেশ ক্লাসের সময় আনুমানিক সকাল ৯টার দিকে বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক (শরীর চর্চা) তসলিমুর রহমান আমাদের ৬ষ্ঠ শ্রেণির শ্রেণি কক্ষে ঢুকে আমাদের ৭শিক্ষার্থীর উপর শারীরিকভাবে নির্যাতন করে। আমাদের শরীরের বিভিন্ন অংশে লাথি মারে এবং স্কুল ড্রেস ছিড়ে দেয় এবং অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করে। আমাদের অপরাধ আমরা সমাবেশে অংশ গ্রহণ করি নাই কেন।’ শিক্ষার্থীরা প্রশ্ন রেখে অভিযোগে আরও বলে, ‘স্যার নিয়মিত সমাবেশ করান না, তাহলে কবে সমাবেশ হবে আর কবে হবে না এটা আমরা কিভাবে বুঝবো। তিনি প্রত্যাহিক সমাবেশের জন্য বাঁশি না দিয়ে শ্রেণি কক্ষে ঘুরে ঘুরে দেখেন কে সমাবেশে যায়নি।’ লিখিত অভিযোগে এসব অভিযোগের সুষ্ঠ বিচার এবং শিক্ষক তসলিমুরের অপসারণ দাবিও করেছে তারা।
এদিকে এই লিখিত অভিযোগ দেয়ার সময় শিক্ষার্থীরা আরও অভিযোগ করে ওই শিক্ষক নিয়মিতই শিক্ষার্থীদেরকে হাত দিয়ে পশ্চাৎদেশে মারপিট করেন, বাবা-মা তুলে গালিগালাজ করেন এবং হাতে লাঠি নিয়ে ভয় দেখান তবে লাঠি দিয়ে না মেরে গায়ে হাত দিয়ে মারপিট করেন। এমনকি রোববার তাদের একজনের স্কুল ড্্েরসের একটি হাতা ধরে টেনে ছিড়ে দিয়েছেন এবং একজনের জামা পেছন দিক থেকে টেনে ছিড়ে দিয়েছেন। অন্য ৫জনের গায়ে লাথি মারায় তাদের সালোয়ারে লাথির দাগও ইউএনও এবং উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তাকে দেখায় শিক্ষার্থীরা। শিক্ষকের লাথিতে জাতীয় পর্যায়ে নৃত্য বিভাগে পুরুস্কার পাওয়া এক ছাত্রীর পা-মচকে গেছে বলেও ওই ছাত্রী এবং তার পিতা কর্মকর্তাদের কাছে অভিযোগ করেন। অভিভাবকদের অভিযোগ এই নির্যাতনের সুষ্ঠ বিচার করে ওই শিক্ষককে অপসারণ করতে হবে।
এ বিষয়ে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক গোলাম মোস্তফা বলেন, ওই শিক্ষক প্রায়ই এমন ঘটনা ঘটিয়ে থাকেন। তাকে নিষেধ করলে উল্টো তিনি আমার দিকে রুখে আসেন। এ কারনে শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকরা বিদ্যালয়ের সভাপতি ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে লিখিতভাবে অভিযোগ দেয়।
চৌগাছা উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আবুল কালাম মোঃ রফিকুজ্জামান বলেন, সোমবার সকালে বিদ্যালয়ে গিয়ে তদন্ত সম্পন্ন করেছি। শিক্ষার্থীদের নির্যাতনের বিষয় প্রমাণিত হয়েছে। এ বিষয়ে প্রতিবেদন বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতির নিকট হস্তান্তর করা হয়েছে। ব্যবস্থাপনা কমিটি সভা করে পরবর্তী সিন্ধান্ত নেবেন। তিনি আরও বলেন বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীদের শান্ত করে শ্রেণিকক্ষে ফিরিয়ে নেয়া হয়। পরে অনাকাঙ্খিত পরিস্থিতি এড়াতে বিদ্যালয় ছুটি দিয়ে দেয়া হয়।
এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইরুফা সুলতানা বলেন, শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ মিছিলের পর অনাকাঙ্খিত পরিস্থিতি এড়াতে বিদ্যালয় ছুটি ঘোষণা করা হয়। তিনি আরও বলেন এ বিষয়ে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তার তদন্ত প্রতিবেদন পেয়েছি। মঙ্গলবার নির্যাতিত শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবক এবং অভিযুক্ত শিক্ষকসহ সকল শিক্ষকদের নিয়ে শুনানি করা হবে। এরপর বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটির মিটিং করে শুনানি ও তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ওই শিক্ষকের বিরুদ্ধে বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা নেয়া হবে।

আরো পড়ুন

সর্বশেষ