বিশেষ প্রতিনিধি: স্বাধীনতার ৫৩ বছর পর এই প্রথম যশোরে ভিন্ন আঙ্গিকে স্মরণ করা হচ্ছে ঐতিহাসিক ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোডের সেই দিনগুলি। ১৯৭১ সালে যশোর রোডে কি ঘটেছিল তা নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার জন্য জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নেয়া হয়েছে এই উদ্যোগ। ২২ সেপ্টেম্বর শুক্রবার দিনটি বর্ণাঢ্য আয়োজনে উদযাপন করা হবে। আর এ উপলক্ষে গ্রহণ করা হয়েছে ব্যাপক প্রস্ততি।
কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে শোভাযাত্রা, আলোচনাসভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং যশোর রোডের নাটক। অনুষ্ঠানে মুক্তিযোদ্ধা বিষয়ক মন্ত্রী এবং এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রীর অংশ গ্রহণ করার কথা রয়েছে।
ঐতিহাসিক যশোর রোডের অনুষ্ঠান মালার সর্বশেষ প্রস্ততির বিষয়ে বুধবার বিকেলে জেলা প্রশাসকের সভা কক্ষে এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। জেলা প্রশাসক আবরাউল হাসানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় জানানো হয় মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীনতা সংগ্রামের সাথে যশোর রোডে যে স্মৃতি ছড়িয়ে আছে তা আমাদের ঐতিহাসিক দলিল। কিন্ত সময়ের ব্যবধানে আজ নতুন প্রজন্মের কাছে তা অনেক কিছু অজানা। অথচ তাদেরকে সেই দিনগুলি জানার অধিকতর প্রয়োজন রয়েছে। আর সেই গুরুত্ব বিবেচনা করে সাজানো হয়েছে এবারকার অনুষ্ঠান। যা নতুন মাত্রা রুপ নেবে বলে সভায় উল্লেখ করা হয়।
সভায় অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় সরকার বিভাগের উপ-পরিচালক রফিকুল হাসান,এডিসি জেনারেল তোষার কান্তি পাল, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জুয়েল ইমরান, জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা শহিদুল ইসলাম মিলন, বীর মুক্তিযোদ্ধা আলী হোসেন মনি, জাসদ সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা রবিউল ইসলাম, বীর মুক্তিযোদ্ধা মাযাহারুল ইসলাম মন্টু, প্রেসক্লাব সভাপতি জাহিদ হাসান টুকুন, সংবাদপত্র পরিষদের সভাপতি একরাম উদ্দৌলা, বিটিটিভির জেলা প্রতিনিধি ও প্রজন্ম একাত্তরের সম্পাদক ওহাবুজ্জামান ঝন্টু, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি দীপংকর দাস রতন,সাধারণ সম্পাদক সানোয়ার আলম খান দুলু, ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সভাপতি হারুন অর রশিদ, উদীচীর সাধারণ সম্পাদক সাজ্জাদুর রহমান বিপ্লব, শেঁকড়ের নির্বাহী পরিচালক রওশন আরা রাসু ও শিক্ষিকা শ্রাবনীসুর।
সভায় সিদ্ধান্ত হয় শুক্রবার বিকেল ৪ টায় যশোর রোডের পোলেরহাট বাজার থেকে শোভাযাত্রাটি বের হয়ে তফসীডাঙ্গা স্কুল মাঠে গিয়ে শেষ হবে। ওই স্কুল মাঠে অনুষ্ঠিত হবে আলোচনাসভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও নাটক। শোভাযাত্রায় বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে ৪ শতাধিক শিক্ষার্থী এবং বীর মুক্তিযোদ্ধা ও জনপ্রতিনিধিসহ জেলার সামাজিক সাংস্কৃতিক,সাংবাদিকসহ পেশাজীবী সংগঠনগুলো অংশ গ্রহণ করবে। রাস্তার দু’পাশে থাকবে যশোর রোডের ঐতিহাসিক ছবি সম্বলিত ফেষ্টুন ব্যানার। মূল অনুষ্ঠানে যোগ দেবে আরবপুর ও চাঁচড়া ইউনিয়নের সর্বস্তরের মানুষ। পরদিন শনিবার বিকেলে শিল্পকলায় পরিবেশিত হবে নাটক ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।
এর আগে বিদায়ী জেলা প্রশাসক তমিজুল ইসলাম খানের উদ্যোগে যশোর রোড নিয়ে কয়েকটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। তাঁর সময়ে কলেকটরেটের সিঁড়ির গায়ে পোড়া মাটির শৈলী দিয়ে স্থানপন করা হয় যশোর রোডের টেরাকোটা। তবে এবারই ঐতিহাসিক এই রোডে প্রথম বারের মত অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে নানা অনুষ্ঠান।
গিন্সবার্গ রচিত ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’ পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ট্র্যাজিক কবিতার পংক্তিমালা। কবিতাটির উপজীব্য আমাদের একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ।
মার্কিন কবি গিন্সবার্গ রচিত ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’ ১৯৭১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেনে কনসার্ট ফর বাংলাদেশ-এ গান গেয়েছিলেন নোবেলজয়ী সংগীতকার বব ডিলান। ওই কনসার্টের মহামানবেরা অ্যালেন গিন্সবার্গের এই কবিতাটিকেও মহত্তম সঙ্গীতে রূপান্তর করেছিলেন, নোবেলজয়ী বব ডিলান ছিলেন তাঁদের অগ্রগণ্য।
একটা নতুন জাতিরাষ্ট্রের জন্মবেদনা যে কতটা ভয়াল, ভীতিকর ও ত্যাগের মহিমায় উদ্ভাসিত হতে পারে, তার শ্রেষ্ঠতম উদাহরণ মুক্তিযুদ্ধ। কোটি মানুষ ভারতে শরণার্থী। শিশুরা পর্যাপ্ত বাসস্থান, খাবার ও ওষুধ পাচ্ছে না। তার ওপর প্রতিদিনই পাকিস্তানি মিলিটারিদের বর্বরোচিত হামলায় মারা যাচ্ছে নিরিহ মানুষ। বীর মুক্তিযোদ্ধারা জীবনের শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে লড়ে যাচ্ছে।
যুদ্ধের শেষ সময়ে এসেও বিপন্ন মানুষ যশোর রোড দিয়ে বাঁচার আশায় রুদ্ধশ্বাসে ছুটছে। দানাপানিহীন উদর, শিশুদের কান্না, নারী ও বয়োবৃদ্ধদের আহাজারি, হাড়জিরজিরে সেসব মানুষের দুর্ভোগ চোখে দেখা যায় না।
ওই সময় মার্কিন মুল্লুক থেকে উড়ে এসেছিলেন মানবতার কবি অ্যালেন গিন্সবার্গ। যিনি স্থানীয় পত্রিকায় বাংলাদেশের ভয়াল মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে লিখবেন বলে এসেছিলেন এবং আর্দ্র হৃদয় নিয়ে যশোর রোডের কবিতা লিখে বিশ্ববিবেককে নাড়িয়ে দিয়েছিলেন।

