সাতক্ষীরা প্রতিনিধিঃ ১৯৮৬ সালে প্রায় ১৫ একর জমি নিয়ে শহরের অদূরে বিনেরপোতায় প্রতিষ্ঠিত হয় সাতক্ষীরা বিসিক শিল্প নগরী। অত্যান্ত সম্ভাবনাময়ী শিল্পনগরীতে তিন যুগেও অবকাঠামোসহ উল্লেখযোগ্য কোন উন্নয়নের ছোঁয়া লাগেনি। এমন অবস্থার জন্য কর্তৃপক্ষের উদাসীনতাকেই দায়ী করছেন শিল্প উদ্যোক্তারা। অবকাঠামো উন্নয়নসহ জলাবদ্ধতা, ড্রেনেজ অব্যবস্থাপনা, যাতায়াতের অসুবিধা, বিশুদ্ধ পানীয় জলের অভাবসহ নানামুখী সংকটে জর্জরিত সাতক্ষীরার এই শিল্প নগরী। ব্যবসায়ীদের সুযোগ সুবিধা না থাকায় গত তিন যুগে ভালো কোনো শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেনি।
তাছাড়া শুরু থেকেই নেই সীমানা প্রাচীর, নেই প্রশস্ত সড়ক ও যথাযথ ড্রেনেজ ব্যবস্থা। সড়কের উন্নয়ন কাজ শুরু হলেও তা থমকে আছে প্রায় দু’বছর ধরে। সীমানা প্রাচীর অভাবে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে উদ্যোক্তারা। এছাড়াও বিল্ডিং,ওয়াটার পাম্প, কোয়াটার,রোড লাইটসহ গড়ে উঠেনি শিল্প নগরীর উদ্যোক্তাদের পর্যাপ্ত সুযোগ সুবিধার দেওয়ার মত প্রতিষ্ঠান। যে কারনে যেসব শিল্প কারখানা রয়েছে তার মধ্যে বেশ কয়েকটি বন্ধ হতে বসেছে। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে নানামুখী সংকটে জর্জরিত শিল্প নগরিতে বড় কোনো উদ্যোক্তা আসতে চান না।খোজ নিয়ে জানা গেছে, সাতক্ষীরার অত্যান্ত সম্ভাবনাময় শিল্পনগরীর করুণ দশা।
প্রাচীর না থাকায় গরু-ছাগল যত্র-তত্র ঘোরাফেরা করছে। নির্দিষ্ট পানি নিষ্কাশনের অভাবে রাস্তার উপরেই পানি জমে আছে। সংস্কারের অভাবে অল্প বৃষ্টিতেই পানি জমে কাদার সৃষ্টি হয়েছে রাস্তার উপর। চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়েছে অভ্যন্তরীণ রাস্তাগুলো। বিসিকের নির্দিষ্ট পানির পাম্পটিও অকেজো হয়ে পড়ে আছে। মাছের প্রক্রিয়াজাত ও বেকারীরমত গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান রয়েছে বিসিকে। এসব প্রতিষ্ঠানের অব্যবহৃত বর্জ্য পানি বদ্ধ ড্রেনের কারণে রাস্তায় জমে আছে। বিসিক অঞ্চলে নির্দিষ্ট সীমানা প্রাচীর না থাকায় বিভিন্ন সময়ে চুরির ঘটনাও ঘটেছে। আবার কিছু কিছু প্লটে কারখানার নাম-ঠিকানা সম্বলিত প্লাকার্ড পুঁতে রাখলেও নেই কোন কার্যক্রম। এমনকি বিসিকের দাপ্তরিক কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে একটি দ্বিতল ভগ্ন ভবনে। মাঝে মাঝে পলেষ্টার খসিয়ে নতুন করে পলেষ্টার করা হয় ভবনটিতে।
আরো দেখা গেছে এখানে শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর কোনো নিরাপত্তা নেই, নেই সিমানা প্রাচীর, বিল্ডিং,পাম্প, কোয়াটার,রোড লাইটও নেই। রাস্তার কাজ শুরু হলেও বন্ধ হয়ে আছে পরিচর্যার অভাবে। ড্রেনেজ ও বজ্য নিষ্কাসনের ব্যবস্থা না থাকায় চারদিকে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার অভাবে প্রসার লাভ করছেনা এই শিল্পনগরীর। অত্যান্ত সম্ভাবনাময় শিল্পনগরীর করুণ দশার সৃষ্টির জন্য শুধুমাত্র বিসিকের দায়িত্বরত কর্মকর্তা ও বিসিক‘র উপব্যবস্থাপক, ব্যবসায়ীদের ঋন প্রদানে স্বজনপ্রীতি দায়ী বলে অভিযোগ জনিয়েছেন উদ্যোক্তারা।
বিসিক উপব্যবস্থাপকের কার্যালয় থেকে প্রাপ্ত তথ্য সুত্র মতে, সাতক্ষীরায় ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটাতে ১৯৮৬ সালে ১৫ একর ২৬ শতক জমির উপর গড়ে তোলা হয় বিসিক শিল্পনগরী। এখানে রয়েছে ৯৬টি প্লট। ওই ৯৬টি প্লটের ৪০টি ইউনিট করা হয়। এর ২৪টি ইউনিটের মধ্যে ২৩ টিতে ক্ষুদ্র ও একটিতে মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। বর্তমানে অধিকাংশ ক্ষুদ্র শিল্পপ্রতিষ্ঠান চলছে নাজুক অবস্থায়। এছাড়া নয়টি ইউনিট বন্ধ রয়েছে এবং সাতটি ইউনিট প্রক্রিয়াধীন আছে।
বিসিকে উৎপাদনরত ব্যবসায়ীরা জানান, বিসিকের পানিতে মাছের উৎপাদন ভালো হয় না। বিসিকের পানির প্লাটি বছরের অধিকাংশ সময়ই নষ্ট থাকে। হ্যাচারির সামনের রাস্তাটিরও বেহাল দশা। যাতায়াতের ব্যবস্থা খুবই নাজুক। হ্যাচারির পানি বের হওয়ার মত ড্রেনের ব্যবস্থাও নেই এখানে। প্রতিনিয়ত অভিযোগ করেও কোন প্রতিকার পাওয়া যায় না। কারখানার সামনের রাস্তা নিজ খরচে করে নেওয়া হয়েছে। বিসিক শুধুমাত্র পিচ দিয়েছে রাস্তার উপর। বিসিকের প্লান্টের পানিতে আয়রণ থাকায় ব্যবহার উপযোগী নয়।
তাই নিজ খরচে ডিপ বসানো হয়েছে। গুণগত মানসম্পন্ন খাদ্য তৈরী করতে গেলে এই প্লান্টের পানির উপর ভরসা করা চলে না।
বিসিক শিল্পনগরীর ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প মালিক সমিতির জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক ও পান্ডে ফাইবার ইন্ডাস্ট্রিজের স্বত্বাধিকারী সুরেশ পান্ডে জানান, সংশ্লিষ্ট বিসিক কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দায়িত্বহীনতা ও অসহযোগিতার কারণেই সাতক্ষীরার বিসিক শিল্পনগরী আজ মুখ থুবড়ে পড়েছে। তিন যুগ পেরিয়ে গেলেও এখানে কোনো অবকাঠামোগত উন্নয়ন হয়নি। তাছাড়া ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের নেই পর্যাপ্ত ঋন সুবিধা। এসব নানামুখী সংকটের কারনে এখানে কোন বড় ব্যবসায়ী আসেনা। দ্রুত সময়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে সমস্যা সমাধানের দাবি জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।বিসিক শিল্পনগরীর ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প মালিক সমিতির জেলা শাখার সভাপতি নুরুল ইসলাম রনি বলেন, বিসিকের সহযোগী মনোভাবের অভাবে উন্নয়নের কাজ বাঁধাগ্রস্ত হচ্ছে। কোন পরামর্শ দিলে তারা তা মেনে না নিয়ে বরং এড়িয়ে চলার চেষ্টা করে। ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে সার্ভিস চার্জ নিলেও সুযোগ-সুবিধার কোন বালাই নেই বিসিকে। সর্বত্র শুধু সমস্যা আর সমস্যা। আমাদের কথা এখন আর বিসিকে মূল্যায়নই হয় না।
তিনি আরো বলেন,শুধু সরকারের পৃষ্ঠপোষকতার অভাবেই অত্যন্ত সম্ভাবনাময় এ শিল্পনগরীর এমন করুণ দশা। সাতক্ষীরার অর্থনীতিকে আরো এগিয়ে নিতে বিসিকের অবকাঠামো উন্নয়ন খুবই জরুরি। দেশের বড় ব্যবসায়ীদের আকৃষ্ট করতে আধুনিকায়ন করতে হবে সাতক্ষীরা বিসিককে।
সাতক্ষীরা বিসিকের দায়িত্বরত উপ-ব্যবস্থাপক গোলাম সাকলাইন বলেন, বিসিক শিল্পনগরীর জন্য ৭ কোটি ৮৯ লাখ ৭৫ হাজার টাকার প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। এ প্রকল্পের রাস্তা ও ড্রেন নির্মাণের জন্য বরাদ্দ ছাড় হয়েছে। সেগুলোর কাজও প্রায় শেষের দিকে। কিন্তু অন্যান্য কাজের বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো টেন্ডার আহ্বান করা হয়নি। কবে নাগাদ হবে তা বলতে পারি না। আমরা উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি সর্ম্পকে অবহিত করেছি। বিসিকের প্রকল্প পরিচালক মিজানুর রহমান জানান, প্রকল্পের ফান্ড না থাকায় আমরা যথাযথ সময়ে কাজ শুরু করতে পারেনি। তাছাড়া আমাদের টেন্ডার প্রক্রিয়ায় জটিলতা ছিল। ইতিমধ্যে আমরা ফান্ড পেয়েছি। টেন্ডার জটিলতাও কাটিয়ে উঠেছি। আশা করছি আগামী মাসের মধ্যে টেন্ডার আহবান করে প্রকল্পের সকল কাজ শুরু করতে পারব।
এবিষয়ে সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক হুমায়ূন কবির জানান, বিসিকের অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও সংস্কার কাজের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। এখানকার শিল্পনগরীকে উৎপাদনমুখী করে তুলতে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সার্বিক তদারকি করা হয়। আশাকরি উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ শেষ হলে দেশের বড় ব্যবসায়ীরাও এখানে এগিয়ে আসবে।

