ফারুক রহমান, সাতক্ষীরা:সাতক্ষীরার সুন্দরবন সংলগ্ন উপকলে চিংড়ির পোনা আহরণ করে ৫০ হাজার মানুষের জীবিকা করছে। সুন্দরবন সংলগ্ন এই উপকূলের প্রায় ৫০ হাজার মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে চিংড়ির রেণু পোনা আহরণ ও বিক্রির সঙ্গে জড়িত। নদীতে ভেসে আসা ‘হোয়াইট গোল্ড’ খ্যাত বাগদা ও গলদা চিংড়ির রেণু আহরণ ও বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করেন এ উপকূলের মানুষ। তবে রেণু পোনা আহরণ, সংরক্ষণ, পরিবহন ও বাজারজাতকরণ আইনত নিষিদ্ধ জেনেও তারা ধরেন, এই পোনা বিক্রি করেই চাল কিনে কোনোরকমে সংসার চালাতে হয় তাদের।
উপকূলীয় শ্যামনগর উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় সরেজমিনে দেখা যায়, নদীতে অনেক নারী-পুরুষকে পিঠে দড়ি বেঁধে জাল টানতে দেখা যায়, সুন্দরবনের গহিনের নদী থেকে উজানে ভেসে আসা বাগদা ও গলদার রেণু পোনা ধরার জন্য সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত অসংখ্য নারী-পুরুষ নেট দিয়ে তৈরি করা একধরনের জাল পেতে অপেক্ষা করছেন। কেউ নদীতীরের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত পর্যন্ত জাল টেনেই চলেছেন। কেউ আবার নৌকায় বসে মাঝনদীতে জাল পেতেছেন। জালে আটকে পড়া ক্ষুদ্রাকৃতির গলদা ও বাগদা চিংড়ির রেণু পোনা নিয়ে নিবিড় পর্যবেক্ষণ করে নদীর চরে রাখা গামলাতে উঠিয়ে রাখছেন।
শ্যামনগর উপজেলার দীপ ইউনিয়ন গাবুরার সোরা গ্রামের নরিম কয়াল জাল নিয়ে খোলপোটুয়া নদীতে নেমেছিলেন। সেখানে তার সাথে আলাপকালে তিনি বলেন, এলাকায় অন্য কোন কাজ না থাকায় রেণু পোনা ধরা আইনত নিষিদ্ধ জেনেও জীবিকার তাগিদে ধরেন তিনি। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত মাছ ধরে যা আয় হয়, তাতেই চাল কিনে কোনোরকমে চলে তাঁর সংসার। নদী থেকে ধরা চিংড়ির রেণুগুলো খুব ভালো হয়। বড় ঘের ব্যবসায়ীরা সব কিনে নিয়ে যান।
খোলপোটুয়া নদীতীল এলাকায় ডুমুরিয়া গ্রামের আমিনা খাতুন বলেন, ছোটবেলা থেকেই বাগদা ও গলদা চিংড়ির রেণু ধরেন তিনি। চিংড়ির রেণু ধরেই চলছে তাঁর সংসার। এসব ধরে প্রতিদিন ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা আয় হয়। শুধু তিনি নন, খোলপোটুয়া ও কপোতাক্ষ নদের তীরে এমন হাজারো মানুষ চিংড়ির রেণু ধরে জীবিকা নির্বাহ করছেন। তিনি আরও বলেন, এগুলো বিক্রি করতে বাইরে কোথাও যেতে হয় না। ফুড়ীয়ারা (ব্যাপারী) এখান থেকেই কিনে নিয়ে যান। পরে তাঁরা বিভিন্ন আড়ত ও ঘের ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করেন।
উপকূলীয় শ্যামনগর উপজেলার বিভিন্ন এলাকার মানুষদের কাছ থেকে রেণু পোনা কিনে এনে তা জড়ো করেন ফুড়ীয়ারা। সেখান থেকে অন্য ফুড়ীয়ারা পোনা কিনে মাছের ঘেরে পৌঁছেদেন। ঘের মালিকেরাও আবার সরাসরি রেণু কিনে নিয়ে যান। রেণু আহরণকারী জেলেদের থেকে ঘেরমালিকদের কাছে পৌঁছানো পর্যন্ত দামের পার্থক্য হয় ২০০ থেকে ৩০০ টাকা। আবার দূরে কোথাও রেণু পৌঁছাতে দামের তারতম্য দ্বিগুণ হয়।
স্থানীয় পরিবেশকর্মী আনারুল ইসলাম বলেন, ‘এখানে বিকল্প কর্মসংস্থান না থাকায় মাছ শিকারই আমাদের জীবিকার একমাত্র অবলম্বন’। তাই রেণু পোনা ধরা অবৈধ জেনেও উপকূলের প্রায় ৫০ হাজার মানুষ তারা জীবিকার তাগিদে ধরেন। তিনি বলেন, মাঝে মধ্যে মৎস্য বিভাগ বা প্রশাসনের পক্ষ থেকে অভিযান হয়, তখন তাদের জরিমানা বা গ্রেপ্তার হতে হয়। তবে পেটের তাগিদে আবারও শুরু করতে হয় এই কাজ।
পরিবেশবাদী শাহিন আলম বলেন, সাতক্ষীরার উপকূলীয় আশাশুনির শ্রীউলা, প্রতাপনগর, আনুলিয়া ও শ্যামনগরের কাশিমাড়ী, কৈখালী, রমজাননগর, মুন্সীগঞ্জ, বুড়িগোয়ালিনী, আটুলিয়া, পদ্মপুকুর ও গাবুরার প্রায় ৫০ হাজার মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে চিংড়ির রেণু আহরণ ও বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করছেন। সুন্দরবনের পার্শ্ববর্তী গ্রামগুলোর প্রায় ৭০ শতাংশ পরিবার রেণু ধরা ও ক্রয়-বিক্রয়ের ওপর নির্ভরশীল। এর ফলে সুন্দরবনের ওপর চাপ কিছুটা কমেছে। অভাব-অনটনের এ জনপদের মানুষের সচ্ছলতা ফিরে আসার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে এসব চিংড়ির রেণু।
শ্যামনগর উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা তুষার মজুমদার বলেন, শ্যামনগর উপজেলায় ২৩ হাজার ৫৩৫ জন জেলেকে মৎস্যজীবী কার্ড দেওয়া হয়েছে যারা মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করেন। তবে সুন্দরবনসংলগ্ন এলাকার নদ-নদীতে এভাবে অপরিকল্পিত পন্থায় মাছের পোনা আহরণ মৎস্য সম্পদের জন্য অনেকটা হুমকি মুখে। কারণ হিসেবে মৎস্য কর্মকর্তা বলেন, বেড়িবাঁধের গাঘেঁ বাগদা ও গলদার পোনা আহরণের সময় ১০০ প্রজাতির মাছসহ অন্যান্য জলজ প্রাণি ধংস করা হয়। এ জন্যই রেণু পোনা আহরণ আইনত নিষিদ্ধ। উপকূলে বিকল্প কর্মসংস্থান তৈরি হলেই কেবল মৎস্য সম্পদ রক্ষা করা সম্ভব।

