শুক্রবার, ১৬ই জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ২রা মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ, ২৭শে রজব, ১৪৪৭ হিজরি

না ফেরার দেশে পরিবহন শ্রমিক নেতা শ্রীভূষণ ঘোষ

আরো খবর

নিজস্ব প্রতিবেদক:পরিবহন শ্রমিকনেতা শ্রীভূষণ ঘোষ পরলোক গমন করেছেন। শনিবার সকাল ৭টা ৪০ মিনিটে বার্ধক্যজনিত রোগে নিজ বাড়িতেই তিনি শেষ নি:শ্বাস ত্যাগ করেন। বেলা সাড়ে ১১টায় যশোর জেলা পরিবহন সংস্থা শ্রমিক ইউনিয়ন অফিসে তার মরদেহে শেষ শ্রদ্ধা জানায় শ্রমিক নেতৃবৃন্দ।

সেখানে তাঁর প্রতি শেষ শ্রদ্ধা নিবেদন করেন সংসদ সদস্য রণজিত কুমার রায়, জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি শহিদুল ইসলাম মিলন, পরিবহন সংস্থা শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি আজিজুল আলম মিন্টু ও সাধারন সম্পাদক সেলিমরেজা মিঠুসহ নেতৃবৃন্দ, বাস মালিক সমিতির সভাপতি বদরুজ্জামান বাবলু,মিনিবাস মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক অসিম কুন্ডু, গ্রামের কাগজের সম্পাদক মবিনুল ইসলাম মবিন, স্পন্দের নির্বাহী সম্পাদক  মাবুব আলম লাভলুসহ বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন।

যশোরের বাঘারপাড়া উপজেলার দেবীনগর গ্রামে ১৯৩৬ সালের ১৬ এপ্রিল জন্ম গ্রহণ করেন শ্রীভূষণ ঘোষ। ছয় ভাই ও এক বোনের মধ্যে তিনি তৃতীয়। ১৯৬০ সালে তিনি শ্রমিকদের প্রাপ্য দাবি আদায়ে যোগদেন ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রে (টিইউসি)।
শ্রীভূষণ ঘোষ টিইউসিতে ১২ বছর যুক্ত থাকার পর ১৯৭২ সালে গঠন করেন বাংলাদেশ পরিবহন সংস্থা শ্রমিক সমিতি (রেজি নং-২২৭)। এ সময় তার সাথে ছিলেন সাবেক এমপি খালেদুর রহমান টিটো, শ্রমিক নেতা কালীদাস দে, হাবিবুর রহমান হবি, আফসার আহমেদ সিদ্দিকী। ওই সময় সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন আফসার আহমেদ সিদ্দিকী, সাধারন সম্পাদক কালীদাস দে ও সহ সাধারণ সম্পাদক ছিলেন শ্রীভূষণ ঘোষ।
১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মৃত্যুর পর সংগঠনটির সাংগঠনিক কর্মকান্ড কিছুটা এলোমেলো হয়ে যায়। সাধারণ সম্পাদক কালীদাস দে ভারতে চলে যান। ১৯৭৬ সালে সংগঠনের কর্মকান্ড সচল রাখতে নির্বাচন দেয়া হয়। ওই নির্বাচনে সভাপতি পদে প্রয়াত আমিনুল ইসলাম ওরফে পুনোভাই এবং সাধারন সম্পাদক পদে দায়িত্ব পান শ্রীভূষণ ঘোষ। দীর্ঘদিন ধরে এ পদে দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন নড়াইলের এসডিও (মহাকুমার প্রশাসক) সাহেবের নির্দেশে বিভিন্ন স্থানে ইপিআর পুলিশ আনা নেয়ার কাজ করতেন শ্রীভূষণ ঘোষ। ওই সময় বাংলাদেশের লে.কর্ণেল মতিউর রহমান ও ভারতের ক্যাপ্টেন মূখার্জী মিলে ত্যাগী শ্রমিকনেতা শ্রীভূষণকে ভারতের বিভিন্ন ক্যাম্পেও মুক্তিবাহিনীদের আনা নেয়া করাতেন। মুক্তিযুদ্ধকালীন ভারত থেকে এ অঞ্চলের মুজিব বাহিনীর প্রধান যশোরের আলী হোসেন মনির সাথে যোগাযোগ করে বাংলাদেশের নানা প্রান্তে নিজে ট্রাক চালিয়ে মুক্তিবাহিনীদের পৌঁছে দিতেন এই শ্রমিক নেতা। কিন্তু তিনি পাননি মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি।
১৯৮০ সালে সামরিক আইন জারি অবস্থায় যশোর-কেশবপুর সড়কে বাস মালিকদের সাথে শ্রমিকদের বিরোধ হয়। শ্রমিকদের উপর বাস মালিকদের নির্যাতনের প্রতিবাদ করার ঘটনায় মামলা হয়। এতে শ্রীভূষণসহ হাসমত আলী, কানাই মিত্র, পিলু নামে এক পিয়নকেও দেড় মাসের কারাবরণ করতে হয়। ১৯৮২ সালে সামরিক আইন জারি (এরশাদের আমল) অবস্থায় মিথ্যা মামলার কারণে জেলে যেতে হয় তাকে। সে সময় এই শ্রমিক নেতাকে নয় মাস কারাভোগও করতে হয়েছে। এছাড়া তিন দিন চোখ বেঁধে ফেলে রাখা হয় তাকে।
ওই বছর ঢাকার শ্যামলীতে খন্দকার ট্রান্সপোর্টের বাসের চাপায় এক আর্মি অফিসারের মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় মাগুরার ড্রাইভার হারুন-অর-রশিদ, ঝিকরগাছার আজিজুল ইসলাম ও শহরের পুরাতন কসবার হানিফ নামে তিন শ্রমিকের ফাঁসির আদেশ হয়ে যায়। তাদের মুক্তি ও ফাঁসির আদেশ প্রত্যাহারের দাবিতে সারাদেশের শ্রমিক নেতারা আন্দোলন শুরু করেন। মূল আন্দোলন চলে ঢাকায়। এতে বাংলাদেশ পরিবহন সংস্থা শ্রমিক সমিতির খুলনা বিভাগীয় আঞ্চলিক কমিটির সভাপতি নুরু মিয়া ও সাধারন সম্পাদক শ্রীভূষণ ঘোষের নেতৃত্বেও চলে কড়া প্রতিবাদ ও আন্দোলন। এ কারণে তাদের দু’জনসহ বিভিন্ন নেতাদের ঢাকায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা মেজর মতিন ডেকে নিয়ে যান। ওই শ্রমিক নেতাদের নির্দেশ দেয়া হয় ফাঁসি বাতিলের জন্য আবেদন দিতে। যথারীতি আবেদন করেন নেতারা। এতে ওই আসামিদের ৩১ বছর জেল দেয়া হয়। কিন্তু এ সাজা মানতে নারাজ শ্রমিকরা। শ্রমিক ফেডারেশন ও বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশন, বিপ্লবী সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনসহ বিভিন্ন সংগঠন একযোগে আবারো সারাদেশে আন্দোলন শুরু করে। এতে ঢাকার সাথে এ অঞ্চলের টানা তিনদিন বাস চলাচল বন্ধ ছিল। এ ধরণের অনেক ঘটনার সাক্ষী এই বর্ষিয়ান শ্রমিক নেতা। তিনি ওই সময় বিপ্লবী সড়ক পরিবহণ শ্রমিক ফেডারেশনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৬ সাল থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত দুই টার্মে সভাপতি এবং বাকি বছরগুলোয় সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন শ্রীভূষণ ঘোষ।
১৯৭৬/৭৭ সালে ড্রাইভারি পেশা ছেড়ে দেন তিনি। শ্রমিক নেতা অবস্থায় শহরের পুরাতন খুলনা বাসস্টান্ডে ৫ কাঠা জমির উপর দু’তলা বিশিষ্ট ভবন নির্মাণ, ১৯৭৮ সাল থেকে মৃত ও হতাহত শ্রমিকদের মধ্যে অনুদান দেয়ার নিয়ম চালু করেন। ১৯৮৪ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত সার্কভুক্ত দেশগুলোর ট্রান্সপোর্ট শাখার নির্বাহী সদস্য ছিলেন তিনি। এ সুবাদে পরিবহন সংস্থার উন্নয়নে বিভিন্ন সভায় ভারতের দিল্লী, মগা, পাঞ্জাব, সিমলা, যুবভারতী, পশ্চিমবঙ্গ, নেপালের কাঠমুন্ডুসহ অনেক স্থানে গুরুত্বপূর্ণ সভায় অংশ নিয়েছেন।
তিনি জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক শ্রম বিষয়ক সম্পাদক ছিলেন। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সহসভাপতি পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি বিপ্লবী সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের আঞ্চলিক কমিটির সভাপতি ছিলেন ৩০ বছর, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন সংস্থা শ্রমিক সমিতির খুলনা বিভাগীয় সাধারণ সম্পাদক ২২ বছর ও সভাপতির দায়িত্বে ছিলেন ১৫ বছর। তিনি সনাতন ধর্ম সংঘের সভাপতির দায়িত্বও পালন করেছেন।
শ্রীভূষণ ঘোষ সারা জীবন যেমন শ্রমিকদের প্রাপ্য আদায়ে আন্দোলন করেছেন, তেমনি সারাজীবন সংগ্রামী এই মানুষটি পরিবহন শ্রমিকসহ সহযোগী পেশাজীবীদের স্বার্থে নিবেদিতভাবে কাজ করে গেছেন।

আরো পড়ুন

সর্বশেষ