রবিবার, ১৮ই জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ৪ঠা মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ, ২৯শে রজব, ১৪৪৭ হিজরি

সেই প্রতিবন্ধী শাহিদাকে চাকরি দিলেন আজিপি পত্নী

আরো খবর

 

নিজস্ব প্রতিবেদক
শারীরিক প্রতিবন্ধী শাহিদার পাশে দাঁড়ালেন পুলিশ নারী কল্যাণ সমিতির (পুনাক) সভানেত্রী পুলিশের আজিপি’র পতœী জীশান মীর্জা। আকিজ গ্রুপের একটি প্রতিষ্ঠানে নওয়াপাড়ায় এক্সিকিউটিভ অফিসার পদে শাহিদার চাকরির ব্যবস্থা করেছেন পুনাক সভানেত্রী। বুধবার যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার শিমুলিয়া গ্রামে শাহিদার বাড়িতে গিয়ে তার হাতে চাকরির নিয়োগপত্র তুলে দেন জীশান মীর্জা।

এর আগে শাহিদা খাতুন পরিচালিত প্রতিবন্ধী শিশু ও নারীদের নিয়ে ‘সৃষ্টিশীল নারী প্রতিবন্ধী কল্যাণ সংস্থার’ শিশুদের সঙ্গে কথা বলেন পুনাক সভানেত্রী। এ সময় অনেক প্রতিবন্ধী শিশুদের বুকে জড়িয়ে ধরে আদর আর কপালে চুম এঁকে দেন। বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশুদের খোঁজ-খবর নেওয়ার সঙ্গে তাদের চকলেট, নতুন পোশাক ও বিভিন্ন উপহার তুলে দেন।

পুলিশ নারী কল্যাণ সমিতি (পুনাক) সভানেত্রী জীশান মীর্জা সাংবাদিকদের বলেন, বিভিন্ন গণমাধ্যমে শাহিদাকে নিয়ে সংবাদ পড়েছি। তার অদম্য প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে অনন্য নজির স্থাপন করা আমাদের কাছে খুব ভালো লেগেছে। তাছাড়া প্রতিষ্ঠার পর থেকেই বাংলাদেশ পুলিশ নারী কল্যাণ সমিতি নিয়মিত কার্যক্রমের পাশাপাশি অসহায় ও দুস্থদের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। সেই ধারাবাহিকতায় শাহিদার কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেছে পুনাক। উচ্চ শিক্ষিত হয়েও সে চাকরি পাচ্ছে না। পুনাক শাহিদার কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হওয়ায় পরিবারটি এখন ঘুরে দাঁড়াতে পারবে।
নিয়োগপত্র পেয়ে শাহিদা খাতুন বলেন, অবশেষে আমার একটা কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হয়েছে। পড়াশুনা শেষ হয়েও চাকরি না হওয়ায় আমি খুব দুঃচিন্তায় ছিলাম। প্রতিবন্ধী হিসেবে বাড়িতে পরিবারের কাছে বোঝা হয়ে ছিলাম। তারপর লেখাপড়া শেষ করেই বোঝাটা আরও কয়েকগুণ বেড়ে যায়। পুনাকের সভানেত্রীর কল্যাণে আমার একটা চাকরি হলো। এখন আমার মা-বাবার পাশে দাঁড়াতে পারবো।
তারা যে আমাকে সীমাহীন শ্রম দিয়েছে। চাকরি হওয়ার ফলে এখন আমি তাদের দুমুঠো ভাত খাওয়াতে পারবো। এটা আমার জীবনে বড় পাওয়া। আমি চাকুরিতে যোগদান করলেও আমার হাতে গড়া সৃষ্টিশীল নারী প্রতিবন্ধী কল্যাণ সংস্থা চলবে তার নিজস্ব গতিতে। কেননা আমি প্রতিবন্ধী এই বোনেদের মধ্যে দিয়ে সামনে নেতৃত্ব দেওয়ার মতো অনেকেই গড়ে তুলেছি।

শাহিদার বাবা মুদি দোকানি রফিউদ্দিন বলেন, অবশেষে পুনাকের সভানেত্রী জীশান মীর্জার সহায়তায় শাহিদার চাকরি হওয়ায় খুবই খুশি। প্রথমেই পুনাকের সভানেত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।
তিনি আরও বলেন, শাহিদার জন্মের পর অনেকে অনেক কটু কথা বলেছে। অনেকে মেরে ফেলতেও বলেছে। তারপরও অনেক কষ্ট করে বড় করেছি। তার কত রোদ, বৃষ্টি, ঝড় পার করে আজ সে উচ্চ শিক্ষিত। দীর্ঘদিন পরে হলেও শাহেদা চাকরি পেয়েছে এটা সমাজের অনুকরণীয় হয়ে থাকবে। শাহিদাকে সমাজের আর দশটা প্রতিবন্ধী ছেলে-মেয়েও তাকে অনুসরণ করতে পারবে। তারাও লেখাপড়া শিখে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করবে, সমাজের বোঝা হবে না।
জানা যায়, যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার শিমুলিয়া গ্রামের মুদি দোকানি রফিউদ্দিনের ছয় সন্তানের মধ্যে চতুর্থ শাহিদা খাতুন। ১৯৯১ সালে শাহিদার জন্ম হলে গোটা পরিবারে যেন আঁধার নেমে আসে। কারণ, মেয়েটির একটি হাত ও দুটি পা নেই। শাহিদার মা শিমুলিয়ার খ্রিষ্টান মিশনে হাতের কাজ করতে সঙ্গে করে নিয়ে যেতেন শাহিদাকে। সেখানেই মিশনের সিস্টার জোসেফ মেরী তাকে হাতেখড়ি দেন। শাহিদার বয়স পাঁচ বছর হলে সেন্ট লুইস প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি করতে নিয়ে যান। কিন্তু প্রতিবন্ধী হওয়ায় স্কুলের শিক্ষকরা তাকে ভর্তি করতে অস্বীকৃতি জানায়।

পরে জোসেফ মেরীর বদৌলতেই সুযোগ হয় স্কুলে পড়ার। কখনো মা-বাবা, কখনো ভাই-বোনের কোলে চড়ে স্কুলে যাতায়াত শুরু হয় শাহিদার। রোদ, বৃষ্টি, ঝড় কোনো কিছুই তাকে স্কুল থেকে দূরে রাখতে পারেনি। এভাবেই ২০০৭ সালে সেন্ট লুইস হাইস্কুল থেকে এসএসসি ও ২০০৯ সালে শিমুলিয়া ডিগ্রি কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। সর্বশেষ যশোর এমএম কলেজ থেকে ২০১৬ সালে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে মাস্টার্স পাস করেন শাহিদা।#

আরো পড়ুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

সর্বশেষ