শনিবার, ১৭ই জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ৩রা মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ, ২৮শে রজব, ১৪৪৭ হিজরি

সোমবার থেকে সুন্দরবনে‌ শুরু হচ্ছে মধু সংগ্রহ

আরো খবর

ফারুক রহমান, সাতক্ষীরা: সোমবার ১ এপ্রিল থেকে শুরু হচ্ছে সুন্দরবনে মধু সংগ্রহের মৌসুম। এজন্য নৌকা সাজানোর কাজ শেষ করেছেন সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকার মৌয়ালরা।
সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার বুড়িগোয়ালিনী স্টেশন ও কদমতলা স্টেশন এলাকার প্রায় দুই হাজার মৌয়ালী সুন্দরবনের মধু আহরণে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে জানিয়েছেন স্থানীয় মৌয়ালরা ও বন বিভাগের কর্মকর্তারা।
আজ সোমবার থেকে দুই মাসের জন্য মৌয়ালরা জীবিকার সন্ধানে সুন্দরবনে মধু আহরণের সুযোগ পাচ্ছেন। এই জন্য সাতক্ষীরার সুন্দরবন এলাকার মৌয়ালরা ব্যস্ত সময় পার করছেন। মহাজনদের কাছ থেকে দাদন নিয়ে বনে যাওয়ার জন্য নৌকা মেরামত ও রঙের কাজসহ শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি চলছে পুরোদমে।
পশ্চিম সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জ কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০২২ সালে ৪১১টি পাস নিয়ে ২ হাজার ৮৯৮ জন মৌয়ালরা ১ হাজার ৪৪৯ কুইন্টাল মধু এবং ৩৩৪ দশমিক ৭০ কুইন্টাল মোম আহরণ করেন। এ থেকে রাজস্ব আয় হয় ৩২ লাখ ৭৪ হাজার ৭০০ টাকা। ২০২৩ সালের মধু ও মোম আহরণের জন্য ৩৬৫টি অনুমতিপত্র (পাস) দেওয়া হয়। এসব অনুমতিপত্রের বিপরীতে ২ হাজার ৪৫০ জন মৌয়াল সুন্দরবনে যান। তাঁরা ১ হাজার ২২৫ কুইন্টাল মধু ও ৩৬৭ দশমিক পাঁচ কুইন্টাল মোম আহরণ করেন। আর এ থেকে ২৭ লাখ ৬৮ হাজার ৫০০ টাকা সরকারের রাজস্ব আসে। চলতি মৌসুমে ১ হাজার ৫০০ কুইন্টাল মধু এবং ৪৫০ কুইন্টাল মোম আহরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
সরেজমিনে সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জের বুড়িগোয়ালিনী, নীলডুমুর, দাতিনাখালি, মুন্সিগঞ্জ, গাবুরা, কদমতলা এলাকা ঘুরে মৌয়ালদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, সুন্দরবনে যাওয়ার শেষ সময়ের প্রস্তুতি সারলেও আশানুরূপ মধু পাওয়া নিয়ে সংশয়ের কথা জানিয়েছেন মৌয়ালেরা। এবার মৌসুম শুরুর আগেই সুন্দরবনে মধু চোর চক্র প্রবেশ করে আগাম চাক কাটা ও বৃষ্টি কম হওয়ার কারণে অন্য মৌসুমের চেয়ে মধু অনেক কম পাওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে এখানকার মৌয়ালদের মধ্যে।
উপজেলার বুড়িগোয়ালিনী ‌ গ্রামের এলাকার রশিদ কয়াল, ইব্রাহিম গাজী, সোলায়মান সরদার বলেন, ‘আমরা  সুন্দরবন থেকে তিনি মধু আহরণ করছি প্রায় ২৫-২৬ বছর। এই বছর মাছ ও কাঁকড়া শিকারের আড়ালে প্রচুর বনজীবী সুন্দরবনে থেকে আগেভাগে চোরাইভাবে মধু কেটেছেন।
এদিকে, স্থানীয় মৌয়ালদের সাথে কথা বলে জানা যায়, বিগত বছরগুলোর তুলনায় এবার মধু কম পাওয়া যেতে পারে।
নীলডুমুর খেয়াঘাটে কথা হয় নৌকার মালিক বুড়িগোয়ালিনীর দাতিনাখালী এলাকার মৌয়াল আমিনুল ইসলামের সাথে। তিনি জানান, হক পহেলা এপ্রিল তারা পাস নিয়ে বনে যাবেন। ইতিমধ্যে মধ্যে নৌকা মেরামতসহ সকল প্রস্তুতি সেরেছেন তিনি। তার নৌকায় আট জন সহযোগী রয়েছেন। মৌসুমে মধু আহরণ করতে গিয়ে একেকজন মৌয়ালের খরচ হয় ১২ থকে ১৫ হাজার টাকা।
অন্যদিকে, মৌয়ালরা বলেছেন, এবার বৃষ্টি কম। মধু কেমন হবে তা বলা যাচ্ছে না। সুন্দরবনে ফুলের সমারোহ বেশি থাকলেও বৃষ্টি না হওয়ায় তা ঝরে যাচ্ছে। ফুল টিকে না থাকলে মধুও কম হয়
গাবুরা গ্রামের মৌয়াল মুকিমুল সরদার বলেন, আমি মহাজনের থেকে টাকা নিয়ে আটজনের একটি বহর নিয়ে বনে যাচ্ছি। বেশি মধু না পেলে চালান মার যাবে। তখন ঋণের বোঝা টেনে বেড়াতি হবে। এলাকায় কাজ না থাকায় বাধ্য হয়ে এ বছর মধু সংগ্রহে যাচ্ছি।
এছাড়াও মৌয়ালদের অভিযোগ, আগে বন বিভাগ তিন মাস (এপ্রিল, মে ও জুন) মধু আহরণের অনুমতি দিত। কিন্তু গত দুই বছর শুধু এপ্রিল ও মে মাস মধু আহরণ করতে দিচ্ছে। এছাড়া সুন্দরবনের প্রায় অর্ধেক এলাকায় মধু আহরণের অনুমতি দেয় না বন বিভাগ। এ কারণে আগের চেয়ে মধু আহরণের পরিমাণ কমে গেছে।
পশ্চিম সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জের সহকারী রেঞ্জ কর্মকর্তা নূরুল আলম বলেন, ১ এপ্রিল থেকে মধু আহরণ শুরু হয়। কিন্তু তার আগেই চুরি করে একাধিক চক্র মধু আহরণ করছে। চুরি বন্ধ করতে হলে মধু আহরণের দুই মাস সুন্দরবনের নদ-নদীতে মাছ ও কাঁকড়া ধরার পাস (অনুমতি) বন্ধ রাখতে হবে। প্রতিটি নৌকায় সর্বোচ্চ ১০ জন মৌয়ালি অবস্থান করতে পারবেন। একজন মৌয়ালি ১৫ দিনের জন্য সর্বোচ্চ ৫০ কেজি মধু ও ১৫ কেজি মোম আহরণ করতে পারবেন। ১৫ দিনের বেশি কোনো মৌয়ালি সুন্দরবনে অবস্থান করতে পারবেন না। এ বছর ১ হাজার ৫০০ কুইন্টাল মধু এবং ৪৫০ কুইন্টাল মোম পাওয়ার আশা কর‌ছে বন বিভাগ।
নূরুল আলম আরও জানান, যে চাকে কমপক্ষে পাঁচ কেজি মধু পাওয়া যেত, এপ্রিলের আগে মধু আহরণ করলে ওই চাকে ৫০০ গ্রামের বেশি মধু পাওয়া যায় না।

আরো পড়ুন

সর্বশেষ