শনিবার, ১৭ই জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ৩রা মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ, ২৮শে রজব, ১৪৪৭ হিজরি

অবৈধ মাটি ব্যবসা:চৌগাছায় হুমকির মুখে কৃষি জমি ও পাকা সড়ক

আরো খবর

জাহিদ হাসান সোহান, (চৌগাছা) যশোরঃ যশোরের চৌগাছায় কোনো ভাবেই থামছে না অবৈধভাবে মাটি কাটার মহা উৎসব। অভিযোগ উঠেছে ফসলি জমি থেকে ও পুকুর খননের নামে অবৈধভাবে মাটি কেটে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে প্রভাবশালী মহল। সড়কগুলোতে দাঁপিয়ে বেড়াচ্ছে মাটি বোঝাই ট্রাক এবং ট্রাকের বগি লাগানো ট্রাক্টার। মাটি উত্তোলন করে ট্রাকে করে বিভিন্ন স্থানে পাঠানো হচ্ছে। এতে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে গ্রামিণ ও শহরের সড়ক ব্যাবস্থা।

মাটি বোঝাই ভারী ট্রাকের বেপরোয়া চলাচলের কারনে ভাঙছে পাকা সড়ক। পথচারীরা বিভিন্ন দুর্ঘটনার সম্মুখিন হচ্ছেন। ভাটার ট্রাকে বহন করা মাটি শহরের সড়কগুলোতে জমে থাকছে ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই চলাচলের অনুপোযোগী হচ্ছে সড়ক। এ সমস্ত ট্রাক ও ট্রাক্টার বেপরোয়া গতিতে চলাচলের কারণে তাদের ঝাপসা করে দেওয়া বালি ঝড়ে সড়ক দিয়ে সাধারণ মানুষের যাতায়াত করা খুবই কষ্টসাধ্য ব্যাপার হয়ে দাড়িয়েছে। মাটি বহনকারী ট্রাকের মালিকরা প্রভাবশালী হওয়ায় স্থানীয়দের প্রতিবাদ করার সাহস নেই।

যার কারণে হুমকির মুখে পড়েছে উপজেলার বিভিন্ন সড়কে যাতায়াতকারী মানুষের বহুকাঙ্খিত সেতু ও ফসলি জমি। একইসাথে বাড়িঘর ভাঙনের দুশ্চিন্তায় দিন পার করছেন রাস্তার দুইধারের বহু পরিবার। চৌগাছা উপজেলা প্রকৌশলী কার্যালয় সূত্র মতে, চৌগাছা উপজেলার ১১ টি ইউনিয়নে বৈধ-অবৈধ প্রায় ১৩ টি ইটভাটা রয়েছে। রাস্তা দিয়ে ইটভাটার মাটি বোঝাই করে চলাচল করে ভারি যানবাহন। এসব মাটি বহনকারি ভারী ড্রাম ট্রাক ও ট্রাক্টার ৩০ থেকে ৩৫ টনের মতো ওজন থাকে অথচ এসব রাস্তার ধারণ ক্ষমতা সর্বোচ্চ ১৭ টন। কিন্তু চালকরা ভারি ড্রাম ট্রাক ও ট্রাক্টারগুলো ইউনিয়নের বিভিন্ন স্থান থেকে মাটির অতিরিক্ত বোঝাই নিয়ে কম ওজন ধারণকারী গ্রাামের রাস্তাগুলো দিয়ে বেপরোয়া গতিতে চলাচল করে। এতেকরে রাস্তাগুলো খুব দ্রুত ভেঙে চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে। এবং দুর্ঘটনার প্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে।

এলাকাবাসীরা জানান, কিছুদিন পূর্বে (২ জানুয়ারি ২০২১)  ইট ভাটার ট্রাকে পিষ্ট হয়ে প্রাণ হারায় ওয়ালিদ হাসান (৯) নামে এক শিশু শিক্ষার্থী। সে উপজেলার ধুলিয়ানী ইউনিয়নের ফতেপুর গ্রামের হবিবর রহমানের ছেলে এবং ফতেপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৪র্থ শ্রেণির ছাত্র ছিল। মৃত ওয়ালিদ হাসান প্রয়োজনীয় কারণে চৌগাছায় যাওয়ার পথে ভাটার ট্র্যকের চাকায়  পিষ্ট  হয়ে প্রাণ হারায়। ভাটার ট্রাকটি চৌগাছা থেকে ঝিকরগাছার দিকে যাওয়ার পথে তাকে চাপা দিয়ে পিষ্ট করেই পালিয়ে যায়।

রাতের আঁধারে অবাধে ভেকু মেশিন দিয়ে মাটি কেটে নিচ্ছে প্রভাবশালী মহল। এসব মাটি বড় ও ছোট ড্রাম ট্রাক যোগে বিভিন্নস্থানে বিক্রি করা হচ্ছে, যাচ্ছে বিভিন্ন ইটভাটা ও স্থাপনার কাজে। প্রতি ট্রাক মাটি বিক্রি হচ্ছে ৭’শ থেকে ৯’শ টাকা।  যদিও মাটি ব্যবসায়ীদের দাবি তারা এলাকার উন্নয়নের কাজের জন্য এসব মাটি বিক্রি করছেন। আর এভাবেই তারা হাতিয়ে নিচ্ছে লাখ লাখ টাকা। স্থানীয় একাধিক ব্যক্তির অভিযোগ, মাটি কাটার সাথে জড়িতরা প্রভাবশালী মহল ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা। তাদের কিছু বলতে গেলেও নানা সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। প্রভাবশালীদের ভয়ে প্রশাসনের কাছে অভিযোগ পর্যন্ত দিতে পারেননি ভূক্তভোগী অসহায় পরিবারের সদস্যরা।

এলাকাবাসীরা অভিযোগ করছেন, এই ড্রাম ট্রাক গ্রামের কাচা বা পাকা সড়কে চলাচলের কোন অনুমতি নাই। সরকারী নিয়ম ভঙ্গ করে ইট ভাটার ড্রাম ট্রাকে মাটি বোঝাই করে রাস্তায় চলাচল করছেন প্রতিদিন। এজন্য সড়কের অনেক অংশ ভেঙ্গে ও দেবে যাচ্ছে। যেখানে ছোট ছোট মাটিবাহী যানবাহন এই সড়কগুরোর জন্য অনুপোযোগী। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও মাস্তানদের ম্যানেজ করে সে রাস্তায় ভাটার ট্রাক চালানো হচ্ছে। অনেকেই আবার দলীয় পদ বলে এসব ব্যবসা পরিচালনা করছেন বলে জানান এলাকাবাসী।

অপরদিকে উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের বেশ কয়েকটি স্থানে ফসলি জমির মাটি অন্যত্র বিক্রি করছে একটি চক্র। ফলে ফসলি জমি নষ্টের পাশাপাশি আবাদ করতে না পারায় ওই এলাকার খেটে খাওয়া কৃষকরা অসহায় হয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছেন।

জানা যায়, উপজেলার সিংহঝুলী ইউনিয়নের পিতাম্বরপুর গ্রামে প্রায় ৩ মাস যাবৎ পুকুর খননের নামে অবৈধ মাটি ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে একটি সেন্টিকেট। সন্ধ্যা থেকে শুরু করে ভোর রাত পর্যন্ত চলছে মাটি কাটার মহা উৎসব। ১০ টির বেশি ট্রাকের বগি লাগানো ট্রাক্টরে ইটভাটায় বহন করা হচ্ছে মাটি। সেন্টিকেটের মূল হোতা উপজেলার সদর ইউনিয়নের লস্করপুর গ্রামের বাবু সরদার।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মুসাব্বির হোসাইন বলেন, কৃষি জমির মাটি কাটার ফলে ফসল উৎপাদন ব্যাপক হুমকির মুখে পড়বে। ফসলি জমির উপরিভাগে টপসয়েল নামক খনিজ পদার্থ থাকে। যা ফসল উৎপদিনের জন্য অত্যান্ত গুরুত্বপূর্ণ। কৃষক সামান্য অর্থের জন্য তার ফসলি জমি থেকে মাটি কাটার কাজে অনুমতি দিচ্ছে। কিন্তু কৃষক আসলে জানেন না যে তিনি তার জমি থেকে ফসল উৎপাদন হুমকির মুখে ফেলছেন।

মাটি কাটা সেন্টিকেট সম্পর্কে উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) গুঞ্জন বিশ্বাসকে জানানো হলে তিনি বিষয়টি থানায় জানাতে বলেন।

এ বিষয়ে থানার অফিসার ইনচার্জ  ইকবাল বাহারকে জানানো হলে তিনি তাৎক্ষণিক ফোর্স পাঠান এবং মাটিকাটা বন্ধের নির্দেশ দেন। পুলিশ ফিরে যাবার দেড় ঘন্টা পরে আবার মাটিকাটা শুরু করে এই সেন্টিকেট।

এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সুস্মিতা সাহাকে জানানো হলে তিনি বলেন, বিষয়টি থানাতে জানান। রাতে ভ্রাম্যমান আদালতের অভিযান পরিচালনা করা অনুমতি নেই।

আরো পড়ুন

সর্বশেষ