নিজস্ব প্রতিবেদক : যশোরে ভবদহ অঞ্চলকে মহাবিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষায় পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে উপদেষ্টার
জরুরি হস্তক্ষেপের দাবি জানিয়ে স্মারকলিপি প্রদান করা হয়েছে।
রোববার যশোর ভবদহ পানি নিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটি দুপুর সাড়ে ১২টায় জেলা প্রশাসক আবরাউল হাছান মজুমদারের মাধ্যমে স্মারকলিপি প্রদান করা হয়।
স্মারকলিপিতে উল্লেখ করা হয়েছে, বিগত সরকারের প্রত্যক্ষ পৃষ্ঠপোষকতায় পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়, পানি উন্নয়ন বোর্ড, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সাবেক প্রতিমন্ত্রী, ঠিকাদার ও ঘের মালিক সিন্ডিকেটের ষড়যন্ত্রে ভবদহ স্লুইচ গেট থেকে ৬০ কিলোমিটার নদী হত্যা করা হয়েছে। ফলে যশোর ক্যান্টনমেন্ট থেকে বারোয়াড়িয়া মোহনা পর্যন্ত যশোর-খুলনা-সাতক্ষীরা জেলাধীন নদী অববাহিকার ১০০ কিলোমিটার জনপদের চার শতাধিক গ্রাম, হাট বাজার, রাস্তাঘাট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মসজিদ-মন্দির, বাড়িঘর, আবাদ ফসল স্থায়ী জলাবদ্ধতার শিকার হতে চলেছে। পরিতাপের বিষয় হলো- সাবেক প্রধানমন্ত্রীর কাছে মিছিল ও স্মারকলিপির মাধ্যমে অনুরোধ-উপরোধ জানানো হলেও তিনি জনগণের বিরুদ্ধে সিন্ডিকেটের পক্ষ নিয়ে এই জনপদকে মহাবিপর্যয়কর পরিস্থিতির মধ্যে ফেলে দিয়েছেন।
গত ২৬ মে ২০২৩ ভবদহ পানি নিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটির নেতৃবৃন্দ নদী পরিদর্শনকালে সেই ভয়াবহ চিত্র উঠে আসে। তা হলো- ভবদহ স্লুইচ গেটের ২১ ভেন্টে ৫০ মিটার সামনে নদীর মাঝে গভীরতা ৩ ফুট, ১০০ মিটার সামনে ৪ ফুট, ৯ ভেন্টের সামনে ৩ ফুট, দোহাকোলায় ২ ফুট, নদীর প্রশস্ততা ১২ ফুট, শোলগাতিয়া ব্রিজে ১ ফুট নদীর প্রশস্ততা ২০ ফুট, খর্ণিয়া ব্রিজে ২.৫ ফুট, নদীর প্রশস্ততা ব্রিজের নিচে ৪৮ ফুট, গ্যাংরাইল নদীর উপর শিবনগর ব্রিজে নদীর প্রশস্ততা ৪৮ ফুট, সেখানে গভীরতা ১০ ৫ ফুট। বারোয়াড়িয়া ৪ নদীর মোহনায় ভাটির সময় ধু-ধু চর জেগে ওঠে। মানুষ নদীর মাঝে সুন্দরবন থেকে ভেসে আসা কাঠ কুড়াতে যায়। এক সময় যে মোহনায় ছিল অতল গভীরতা। ৭ বছর আগে আমরা ওখানের গভীরভাবে দেখেছি ২০০ ফুটের মত। বারোয়াড়িয়া মোহনায় ৪টি নদী একটি ভদ্রা গেছে রূপসায়, হাবরখানা নদী গেছে শিবসায়, জিরাবুনিয়া নদী কপোতাক্ষ হয়ে মিলিত হয়েছে শিবসায়, যেটির সংযোগ স্থান বর্তমানে বন্ধ করে রাখা হয়েছে। অপরটি গ্যাংরাইল নদী ভবদহ অঞ্চল থেকে মোহনায় মিশেছে।
গ্যাংরাইল মোহনার মিলনস্থলে ভাটির সময় পানি থাকে ১০৬/১২ ৭ ফুট। সৃষ্ট পরিস্থিতির অবসান না হলে রূপসা-শিবসা নদী ও মোংলা পোর্ট মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে চলে যাবে।
অপরদিকে, ভবদহ স্লুইচ গেট থেকে মোহনা পর্যন্ত নদী গর্ভে ৫টি সরকারি আবাসন প্রকল্প, ২৪/২৫টি ইটভাটাসহ নানা ধরনের স্থাপনা সরকারি নীতিমালা লঙ্ঘন করে স্থাপন করা হয়েছে। পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়, পানি উন্নয়ন বোর্ড রহস্যজনক কারণে নিরব থেকেছে। জেলা প্রশাসকগণ নদী রক্ষা কমিশনের সভাপতি, নদী সম্পদ রক্ষা ও নদীর উপর ব্রিজ নির্মাণের ক্ষেত্রে বিআইডব্লিউটিএ’র নীতিমালার মান্যতা দেখার দায়িত্বে থাকলেও রহস্যজনকভাবে নিরবতা পালন করছেন।
যা সরকার গৃহিত নীতিমালার পরিপন্থি। কোন ক্ষেত্রেই সরকার গৃহিত নদী তট আইন মানা হচ্ছে না। বিগত সরকারের ‘নদী বাঁচলে দেশ বাঁচবে’ এই ঘোষণা এই জনপদের মানুষের কাছে তামাশায় রূপান্তরিত করেছে। বর্তমান পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ। এখন ভবদহ স্লুইচ গেট উপচিয়ে পানি ভেতরে ঢুকছে। বিল, কৃষি জমি, বসতবাড়িসহ বিস্তৃর্ণ এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। জনগণের মতামত উপক্ষে করে দুর্বৃত্ত সিন্ডিকেটের স্বার্থে গৃহিত পানি উন্নয়ন বোর্ডের চলমান সেচ প্রকল্প যে ব্যর্থ ও রাষ্ট্রীয় অর্থ অপচয়- তা প্রমাণিত হয়েছে।
দুঃখজনক হলো- ২০১৮ সালের ১২ই সেপ্টেম্বর আকস্মিকর্ষকভাবে দুর্নীতি সিন্ডিকেট চক্রের হোতা পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব কবির বিন আনোয়ার সেচ প্রকল্প প্রণয়নের নির্দেশ দেয়। পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়, পানি উন্নয়ন বোর্ড সহযোগে সিন্ডিকেটের স্বার্থ রক্ষায় সরকারকে মিথ্যা তথ্য প্রদান করে সেচ প্রকল্পের নামে কোটি কোটি টাকা অপচয় ও নদী হত্যার স্থায়ী ব্যবস্থা করে সিন্ডিকেটের লুটপাট নিশ্চিত করেছে। ফলে এই মহাবিপর্যয়ের পরিস্থিতি উদ্ভুত হয়েছে।
বর্তমান বাস্তবতায় ডেল্টা প্লান-২১০০ ও ও.ড.গ এর সুপারিশ অনুযায়ী অবিলম্বে টিআরএম প্রকল্প বাস্তবায়ন করা সম্ভব। তাতে করে মোহনা ও ভবদহ স্লুইচ গেট থেকে মোহনা পর্যন্ত ৬০ কিলোমিটার নদী নাব্যতা ফিরে পাবে। প্রশস্থতা ও গভীরতা নিশ্চিত হবে এবং অবৈধ দখলদার উচ্ছেদ হবে। যশোর ক্যান্টনমেন্ট থেকে অববাহিকার ১০০ কিলোমিটার এলাকার জনপদ রক্ষা পাবে। ফলে দীর্ঘদিন উজানে মাথাভাঙ্গা-ভৈরবের নদী সংযোগের দাবিতে আন্দোলনের ভেতর দিয়ে উজানে মাথাভাঙ্গা-ভৈরব সংযোগ প্রকল্প প্রণয়নে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় ও.ড.গ কে দায়িত্ব দেয়। ও.ড.গ সরেজমিনে জরিপ করে ভৈরব-মাথাভাঙ্গা নদী সংযোগ প্রকল্প প্রস্তাব দিয়েছে- যা প্রক্রিয়াধীন। যা বাস্তবায়ন হলে দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের নদীসমূহে নাব্যতার ক্ষেত্রে এক ঐতিহাসিক ও সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়বে। ভৈরব নদ অববাহিকার নদীসমূহের পুনর্জাগরণ ঘটবে।
স্মারকলিপিতে যেসব দাবি করা হয়েছে তা হচ্ছে:
১) এই মহাবিপর্যয়ের হাত থেকে নদী, পানি ব্যবস্থাপনা, প্রাণ-প্রকৃতি, জীববৈচিত্র ও জনপদকে রক্ষার জন্য দ্রুত বিল কপালিয়ায় জোয়ারাধার (টি.আর.এম) ও পর্যায়ক্রমে বিলগুলিতে টি.আর.এম চালু এবং উজানে মাথাভাঙ্গা-ভৈরব নদী সংযোগের প্রস্তাবিত প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে হবে ;
২) পানিসম্পদ মন্ত্রাণালয়ের সাবেক সচিব কবির বিন আনোয়ার, পানি উন্নয়ন বোর্ডের দুর্নীতিগ্রস্থ কর্মকর্তা ও সাবেক স্থানীয় সরকারের প্রতিমন্ত্রী সহযোগে সিন্ডিকেটের বিচার, সরকারকে মিথ্যা তথ্য প্রদান, জনপদের দুঃখ-দুর্দশা, নদী হত্যা ও সরকারি নীতিমালা লঙ্ঘনের সাথে জড়িত সংশ্লিষ্ট চক্রকে চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে ;
৩) আমডাঙ্গা খাল দ্রুত সংস্কার করতে হবে ;
৪) নদী সীমানা নির্ধারণ, নদী তট আইন বাস্তবায়ন, অবৈধভাবে নদী গর্ভে নির্মিত ইটভাটা, আবাসন প্রকল্প প্রতিষ্ঠার সাথে সংশ্লিষ্টদের বিচার ও সকল অবৈধ দখলদার উচ্ছেদ করতে হবে। সকল খাল উন্মুক্ত করতে হবে ;
৫) ভারত থেকে আসা ৫৪টি নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা আদায় ও দেশের অভ্যন্তরে সকল নদী-খাল সংষ্কার, নদী সম্পদ উদ্ধার, অবৈধ দখলদার উচ্ছেদ ও নদী তট আইন বাস্তবায়ন করতে হবে ;
স্মারকলিপি প্রদানকালে উপস্থিত ছিলেন- ভবদহ পানি নিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটির প্রধান উপদেষ্টা ইকবাল কবির জাহিদ, আহ্বায়ক রণজিৎ বাওয়ালী, যুগ্ম আহবায়ক বীর মুক্তিযোদ্ধা গাজী আব্দুল হামিদ, সদস্য অনিল বিশ্বাস, শিব পদ, রাজু আহমেদ, তসলিম-উর-রহমান, হাচিনুর রহমান, নাজিমুদ্দিন, জিল্লুর রহমান ভিটু, শাহজান আলী, আমিনুর রহমান হিরু, পলাশ বিশ্বাস, শেখর বিশ্বাস, সিরাজুল ইসলাম প্রমুখ।

