নিজস্ব প্রতিবেদক, নড়াইল:
নড়াইলের লোহাগড়া উপজেলর লাহুড়িয়া গ্রামে বিএনপি’র দুই গ্রুপের সংঘর্ষে বীর মুক্তিযোদ্ধা আকবর শেখ হত্যাকান্ডে প্রতিপক্ষের বাড়িতে ব্যপক ভাংচুর ও লুটপাট চলেছে। ঈদের দিন (৩১মার্চ) বিকালে মুক্তিযোদ্ধা আকবর শেখ হত্যার ঘটনাকে কেন্দ্র করে ভেঙ্গে ফেলা হয়েছে শতাধিক বাড়িঘর। নগদ টাকা, স্বর্ণলংকার, গরুসহ কমপক্ষে ১০ কেটি টাকার সম্পদ লুটপাট হয়েছে।
দিনেদূপুরে পুলিশের উপস্থিতিতেই চলেছে এসব লুটপাট। এদিকে, পুলিশের গ্রেফতার এড়াতে এবং নিহত মুক্তিযোদ্ধার পক্ষীয় লোকদের হামলার ভয়ে প্রতিপক্ষের (আসামিরা) যুবতী নারী ও শিশুসহ এলাকা পুরুষশূন্য হয়ে পড়েছে। ঘরছাড়া হয়েছেন কমপক্ষে ৫শ’ মানুষ।

সম্প্রতি সরেজমিনে সংবাদ সংগ্রহের জন্য সাংবাদিকেরা ওই এলাকায় উপস্থিত হলে পালিয়ে থাকা নারীরা সাহস করে নিজ বাড়িতে এসেছেন এক নজর দেখার জন্য। নিজের বাড়িতে আসতে পেরে কিছুটা স্বস্তি হলেও বাড়িঘরের অবস্থা দেখে ডুকরে কেঁদে উঠেন লাহুড়িয়া পশ্চিমপাড়ার খলিল মোল্যার স্ত্রী খাদেজা বেগম বলেন, বাড়িঘর ভাংচুর করেই প্রতিপক্ষ ক্ষান্ত হয়নি। ফলধরা লেবু আর আমগাছগুলো কেটে ফেলে প্রতিহিংসা মিটিয়েছে। বাড়িতে একটি তৈজসপত্রও নেই রান্না করে খাওয়ার মতো। তিনি আরও জানান, স্বামী আর সন্তান দূরে কৃষি শ্রমিকের কাজ করে, ঈদের দিন থেকে পালিয়ে বেড়াচ্ছি। বাড়িতে আসতে গেলে মেরে তাড়িয়ে দিচ্ছে, আমরা কার কাছে বিচার চাইবো।
ইউনুস মোল্যার স্ত্রী নাছিমা বেগম বলেন, প্রবাসী ছেলে আব্দুল্লাহর বিয়ের প্রস্তুত চলছিল। চলতি মাসের ১০ এপ্রিল বাড়িতে আসার কথা ছিল। বাড়িঘর ঠিকঠাক আর বিয়ের কেনাকাটার জন্য জমানো ৭ লক্ষ টাকা পাঠিয়েছিলো সে, ভাংচুর আর লুটপাটের সাথে সেই টাকা ও লুটে নিয়েছে প্রতিপক্ষ। স্বামী সন্তান আর নিজেরা পালিয়ে বেড়াচ্ছেন, ছেলের বিয়ের স্বপ্ন ভেঙ্গে গেলো।
মালয়েশিয়া প্রবাসী আব্দুল্লাহ টেলিফোনে জানান, ১০ এপ্রিল (ফ্লাইটে) আমার দেশে যাওয়ার কথা ছিল। দেশে গিয়ে বিয়ের অনুষ্ঠান শেষ করবো ভেবেছিলাম, এখন আমার সব স্বপ্ন শেষ। বাবা-মার কি অবস্থা হবে তাই নিয়ে টেনশনে আছি। পুলিশ কারো কোন সম্পদই রক্ষা করতে পারছে না, তাহলে আমাদের নিরাপত্তা কে দেবে ? দেশে গেলে তো আমাকেও খুন করে ফেলবে। এভাবেই সাংবাদিকদের জানাচ্ছিলেন তাদের অসহায়ত্বের কথা।
সাংবাদিকদের উপস্থিতিতেই লাহুড়িয়া পশ্চিমপাড়ায় বেলা ১১ টার সময়ও পাশের বাড়িগুলোতে চলছিল লুটপাট। কয়েকজন লোককে ছোটাছুটি করে অবশিষ্ট ছোট মালামালগুলো নিয়ে যেতে দেখা গেলো। সাংবাদিক দেখে কিছুটা সাহস পেয়ে দৌড়ে ভাংগা ঘরে ফিরে আসলেন কয়েকজন নারী। নিজের লুটহওয়া আর ধ্বংসপ্রাপ্ত ঘরেও আসতে পারছেন না ঘরমালিক। নিজের ৩টি সাজানো বাড়িঘর সংসার আর সম্পদ লুট হয়ে যাওয়ায় গড়িয়ে কাঁদলেন লাহুড়িয়া পশ্চিমপাড়ার রাহিলা বেগম। তিনি বলেন, আমার পঁয়ত্রিশ বছরের সংসার কত কষ্ট করে খেয়ে নাখেয়ে ঘরবাড়িগুলো বানিয়েছি, একেবারে মাটির সাথে মিশিয়ে দিয়ে গেলো। আমার সব শেষ, আমরা এখন পালিয়ে বেড়াচ্ছি।
সহায় সম্বল হারিয়ে কাঁদছেন লাহুড়িয়া পশ্চিমপাড়ার রোকসানা, কামনা, রুনা খান, খাদেজা, শিরিনা, রাহিলা, রোকে বেগম, সোহানার মতো শত নারী। হত্যাকান্ডের ঘটনায় পশ্চিমপাড়ার কমপক্ষে শতাধিক বাড়ি ভাংচুর হয়েছে। লুট হয়েছে গরু, সোনা, টাকাসহ প্রায় ১০কোটি টাকার সম্পদ। চরম অনিশ্চয়তা আর হতাশার মধ্যে পালিয়ে দিন কাটছে ৫শ’ মানুষের।
রোকেয়া বেগম, কামনা বেগম, শিরিনা ও জানান, আমাদের বাড়ির মালামাল গুলো নসিমন এনে উঠিয়ে নিয়ে গেছে। আমাদেরকে বাড়িতে আসতে দিচ্ছেনা। বাড়ি আসতে গেলে নারীপুরুষ মিলে বাঁধা দিচ্ছে। সোহানা খনম বলেন, বাড়িঘর লুটপাট করে পরে ভাংচুর করেছে। আমরা পুলিশকে গিয়ে বললাম আমার মালামাল লুট করে নিয়ে যাচ্ছে, পুলিশ আটকালো না শুধু দেখলো।
এ ব্যাপারে নিহত মুক্তিযোদ্ধা আকবার শেখের ভাতিজা শরিফুল ইসলাম বললেন, আমার চাচা অত্যন্ত সৎ মানুষ ছিলেন, তিনি সবসময়ই ঝামেলা এড়িয়ে চলতেন, ঈদের দিন পুলিশের কথামতো তিনি সমঝোতা করতে রাজী হয়েও মারা গেলেন, তারেক তাকে প্রথম কোপ মারে। লুটপাট আর ভাংচুর বিষয়ে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, আমরা কোন মালই লুটপাট করিনি,আমরা আরো পুলিশের সামনে ওদের মালামাল উদ্ধার করে দিচ্ছি।
লাহুড়িয়া পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের ভরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোঃ তুহিন পাটোয়ারী জানান, মাগুরাতে খুনের আসামী ধরতে গেছেন। পুলিশের সামনে ভাংচুর লুটপাট এমন অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ভাংচুর যা হয়েছে তা খুনের পরদিনই হয়েছে আর কিছু চুরি হচ্ছে। আমাদের লোকবল কম,উপরে জানিয়েছি।
লোহাগড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আশিকুর রহমান বলেন, এই এলাকায় নিজের মালামাল লুট করে অন্যের উপর দোষারপ করার চেষ্টা করে। আমরা চেষ্টা করছি পুরো ঘটনা সামাল দেওয়ার। এলাকায় সেনাবাহিনী, পুলিশ তো সবসময়ই টহল দিচ্ছে, পুলিশ আসামী ধরতে ব্যস্ত, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে আছে।
উল্লেখ্য, ঈদের দিন বিকালে লাহুড়িয়া পশ্চিমপাড়ায় মনিরুল জমাদ্দার ও মিল্টন জমাদ্দার গ্রুপের মধ্যে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষে খুন হন বীর মুক্তিযোদ্ধা আকবর শেখ। এসময় উভয় পক্ষের ১০ জন আহত হন। মুক্তিযোদ্ধা আকবর শেখ মনিরুল জমাদ্দারের সমর্থক ছিলেন। এ ঘটনায় ৩ এপ্রিল নিহতের স্ত্রী আকলিমা বেগম বাদী হয়ে ১২ জনের নামে এবং অজ্ঞাত ৪/৫ জনের নামে হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলার প্রধান আসামী লাহুড়িয়া ইউপি চেয়ারম্যান কামরান সিকদার। এদিকে মামলার ৩ নং আসামী মোঃ জাকারিয়া মোল্যা ওরফে জাকির হোসেন (৫৫) ও ১০নং আসামী সাদ্দাম হোসেন ওরফে মোঃ জাহিদুল ইসলাম (৩২) কে গ্রেপ্তার করেছে র্যাব-৬।

