শনিবার, ১৭ই জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ৩রা মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ, ২৮শে রজব, ১৪৪৭ হিজরি

নড়াইলে হত্যাকান্ডের জের: শতাধিক একর জমির পাঁকা ধান ঘরে তোলা নিয়ে অনিশ্চয়তা

আরো খবর

শাহরিয়ার কবীর সৈকত, নড়াইল:
নড়াইলের কালিয়া ও লোহাগড়া উপজেলায় সম্প্রতি দু’টি হত্যাকা-ের জেরে কমপক্ষে শতাধিক একর জমির পাঁকা ধান ঘরে তোলা নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।

জানা যায়, সিলিমপুর ও গাজীরহাট এলাকার আধিপত্য বিস্তার ও ব্যবসা নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে সিলিমপুর গ্রামের হাসেম মোল্যা ও মফিজুল ইসলাম ঠান্ডু গ্রুপের সাথে জনি মোল্যার গ্রুপের দ্বন্দ্বের জেরে সংঘর্ষে গত ১৫ মার্চ কালিয়ার হামিদপুর ইউনিয়নের সিলিমপুর গ্রামের হাসেম মোল্যা নিহত হন। এ ঘটনায় নিহতের পিতা কাদের মোল্যা বাদী হয়ে কালিয়া থানায় নড়াইল-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য আওয়ামী লীগ নেতা কবিরুল হক মুক্তিকে পরিকল্পনাকারী হিসেবে এবং গাজীরহাট ইউপি চেয়ারম্যান মফিজুল ইসলাম ঠান্ডুকে প্রধান আসামি করে ৩১ জনের বিরুদ্ধে কালিয়া থানায় মামলা দায়ের করেন। হত্যাকান্ডের পর আসামি পক্ষের ১০টি বাড়িতে আগুন এবং ৩০টি বাড়ি ভাংচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। পরবর্তীতে হাসেম মোল্যা হত্যাকান্ডে আসামি পক্ষের লোকেরা পাঁকা বোরো ধান কাটতে গেলে হাসেম মোল্যার লোকজন তাঁদের বাঁধা দিচ্ছেন। ধান কাটতে হলে তাঁদের মোটা অংকের চাঁদা দিতে হবেও অভিযোগ রয়েছে।

 

আসামি রউফ শেখের ছেলে আউলিয়া শেখ বলেন, সিলিমপুর ও গাজীরহাটের প্রায় ৪০টির মতো মাছের ঘের ও পুকুরের মাছ লুট করে নিয়ে গেছে। আমাদের বংশের লোকদের কমপক্ষে ৪০ একর জমির পাঁকা বোরো ধান কাটতে পারছি না। ধান কাটতে কৃষি শ্রমিক পাঠালে বাদি পক্ষের মুস্তাক মোল্যাসহ অনেকে তাঁদেরকে জমি থেকে উঠিয়ে দিচ্ছে। বলছে, জমির ধান কাটতে গেলে বিঘা প্রতি ১০ হাজার টাকা করে চাঁদা দেওয়া লাগবে। যে কোন মূহুর্তে ঝড়-বৃষ্টিতে পাঁকা ধান নষ্ট হয়ে যেতে পারে।

 

নিহত হাসেমের বাবা মামলার বাদী কাদের মোল্যার সঙ্গে মুঠোফোনে কথা বলতে চাইলে এক মহিলা ফোন রিসিভ করে পরে কথা বলবেন বললেও আর কথা বলেননি।
কালিয়া থানায় ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘জমি থেকে ধান কাটার বিষয়টি নিয়ে কোন মতামত দেওয়া সম্ভব নয়।’

 

অপরদিকে, লোহাগড়া উপজেলার লাহুড়িয়া ইউনিয়নের লাহুড়িয়া গ্রামের মনিরুল জমাদ্দার ও একই গ্রামের মিল্টন জমাদ্দার গ্রুপের মধ্যে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে গত ৩১ মার্চ (ঈদুল ফিতরের দিন) মুক্তিযোদ্ধা আকবর শেখ (৭৫) নিহত হন। এ ঘটনায় ৩ এপ্রিল নিহতের স্ত্রী আকলিমা বেগম বাদী হয়ে লাহুড়িয়া ইউপি চেয়ারম্যান কামরান সিকদারকে প্রধান আসামি করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। হত্যাকান্ডের পরে শতাধিক বাড়ি ভাংচুর, মালামাল ও গবাদিপশু লুটপাটের ঘটনা ঘটে। এখন বোরো ধান কাটা শুরু হলেও আসামি পক্ষের কাউকে গ্রামে ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না বলে অভিযোগ উঠেছে। আসামি পক্ষের কমপক্ষে ৬০ একর জমির বোরো ধান কাটা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। এ ছাড়া প্রায় ৩০ একর জমির পাট পরিচর্যার অভাবে বিনষ্টের পথে।

 

লাহুড়িয়া (পশ্চিমপাড়া) গ্রামের ভূক্তভোগী নুরুল ইসলাম বলেন, তার আপন ভাই আকবর হত্যা মামলার আসামি জাকির হোসেন মাষ্টারের ৫০ শতাংশ জমিতে বোরো ধান পাকলেও তা কাটা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। ২ একরের পাটের জমিতে সেচ ও পরিচর্যার অভাবে নষ্টের পথে। প্রতিবেশী ফারুক হোসেন তার ভাইয়ের ৫ শতাংশ জমিতে কয়েকটি গাছ কেটে এখন শুনছি সেখানে ঘর তৈরি করবে।

 

লোহাগড়া উপজেলার সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান বীর মুক্তিযোদ্ধা এস এম আব্দুল হান্নান রুনু বলেন, বোরো ধান কাটা শুরু হয়েছে। তবে আসামি পক্ষের কাউকে এলাকায় ঢুকতেই দেয়া হচ্ছে না, ধান কাটবে কিভাবে। হত্যাকান্ডসহ বাদী পক্ষের ৪ টি মামলায় দেড় শতাধিক ব্যক্তিকে আসামী করা হয়েছে। ফলে, কমপক্ষে শতাধিক পরিবারই বাড়ি ছাড়া। সে কারণে জমির ধান কাটা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে।

 

তবে নিহত মুক্তিযোদ্ধা আকবর শেখের ভাতিজা শরিফুল ইসলাম বললেন, আমাদের পক্ষের কেউ কোন বাড়ি ভাংচুর বা মালামাল লুটের সাথে জড়িত নয়। এলাকায় আসতে কাউকে বাঁধাও দেয়া হচ্ছে না। যার ধান সেই কাটবে সেখানে আমাদের বাঁধা দেওয়ার কি আছে।

 

এ বিষয়ে লোহাগড়া থানার লাহুড়িয়া পুলিশ ক্যম্প ইনচার্জ ইন্সপেক্টর তুহিন বলেন, এলাকার পরিস্থিতি আগের চেয়ে ভালো। যাদের নামে মামলা রয়েছে তারাতো এলাকায় ঢুকতে পারছে না। এ ছাড়া আসামি পক্ষের এলাকায় প্রবেশ এবং জমির ধান কাটার বিষয়ে স্থানীয়ভাবে দু’পক্ষের সমঝোতা হলে ভালো হয় বলে মন্তব্য করেন।

আরো পড়ুন

সর্বশেষ