অভয়নগর প্রতিনিধি:
অভয়নগর উপজেলায় দুর্বৃত্তদের গুলিতে কৃষক দল নেতা তরিকুল ইসলাম (৫০) নিহত হওয়ার জেরে বিক্ষুব্ধ লোকজন ডহর মশিয়াহাটী গ্রামের অন্তত ২০টি বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ করেছে। বৃহস্পতিার রাতে এ ঘটনা ঘটে। এর আগে সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে উপজেলার ডহর মশিয়াহাটীতে তরিকুল ইসলামকে গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। ঘর মালিকদের পারস্পরিক বিরোধকে কেন্দ্র করে খুনের ঘটনা ঘটেছে বলে বিভিন্ন সূত্রে দাবি করা হয়েছে। তরিকুল ইসলাম (৫০) হত্যার ঘটনায় তিন যুবককে পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়েছে।
শুক্রবার বিকালে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন অভয়নগর থানার ওসি মো. আব্দুল আলীম। বৃহস্পতিবার রাতে তাদের সুন্দলী ইউনিয়নের ডহর মশিয়াহাটী গ্রাম থেকে আটক করা হয়।
নিহত তরিকুল ইসলাম উপজেলার ধোপাদি গ্রামের মৃত ইব্রাহিম সরদারের ছেলে।
এর আগে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় সুন্দলী ইউনিয়নের ডহর মশিয়াহাটী গ্রামে ডহর মশিয়াহাটি গ্রামের পিন্টু বিশ্বাসের বাড়ি থেকে কৃষক দল সভাপতি তরিকুল ইসলামের রক্তাক্ত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এ খবর ছড়িয়ে পড়লে এলাকার বিক্ষুব্ধ জনগণ ও বিএনপির নেতাকর্মীরা রাতেই নওয়াপাড়া শহরে বিক্ষোভ মিছিল বের করেন।
নিহতের বড়ভাই জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের নওয়াপাড়া শিল্পাঞ্চল শাখার সাধারণ সম্পাদক এসএম রফিকুজ্জামান টুলু বলেন, বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে পরিকল্পিতভাবে আমার ভাইকে হত্যা করা হয়েছে। মাথায় গুলি করার পর কুপিয়ে তার একটি হাত বিচ্ছিন্ন করা হয়। তারপর মাথায় ইট দিয়ে আঘাত করে থেঁতলে দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, অস্ত্রধারী ৬ জন মিলে নির্মম ও নৃশংসভাবে আমার ভাইকে হত্যা করেছে। আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে হত্যাকা-ের সঙ্গে জড়িত খুনিদের গ্রেফতারের দাবি জানাচ্ছি।
এ ব্যাপারে অভয়নগর থানার ওসি মো. আব্দুল আলিম বলেন, সন্দেহভাজন তিন যুবককে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। তদন্তের স্বার্থে তাদের নাম ও পরিচয় জানানো সম্ভব হচ্ছে না। পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হচ্ছে। ডহর মশিয়াহাটী গ্রামে বৃহস্পতিবার রাত থেকে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
এদিকে হত্যাকা- ও অগ্নিসংযোগের সাথে জড়িতদের শাস্তি ও ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ দাবি উঠেছে।
হত্যা কান্ডের বিষয়ে স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় উপজেলার সুন্দলী ইউনিয়নের ডহরমশিয়াহাটী গ্রামে বেড়েধা এলাকায় পিন্টু বিশ্বাসের বাড়িতে যান তরিকুল ইসলাম ও তার এক সহযোগী সুমন। সেখানে মৎস্য ঘেরের জমি সংক্রান্ত চুক্তিপত্র নিয়ে পিন্টুর সঙ্গে তরিকুলের তর্ক হয়। এক পর্যায়ে অজ্ঞাত ৬ থেকে ৭ জন দুর্বৃত্ত বাড়িতে ঢুকে তরিকুলকে গুলি করে পালিয়ে যায়। কৃষক দলের নেতার মৃত্যু খবর ছড়িয়ে পড়লে ওই রাতে উত্তেজিত জনতা পিন্টু বিশ্বাসসহ আশপাশে ২০টি বাড়ি ভাঙচুর করে আগুন ধরিয়ে দেয়। পরে সেনাবাহিনী, পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করে।
শুক্রবার আছরের নামাজের পর অভয়নগরের ধোপাদী মাধ্যমিক বিদ্যালয় মাঠে জানাজা শেষে তরিকুল ইসলামের দাফন সম্পন্ন হয়।
অভয়নগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবদুল আলিম বলেন, কী কারণে তাকে হত্যা করা হয়েছে তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। হত্যার কারণ উদ্ঘাটনের চেষ্টা চলছে।
এদিকে অভয়নগর উপজেলার ৯৬ গ্রামের অংশে ঘের মালিকদের পারস্পরিক বিরোধকে কেন্দ্র করে খুন ও পরবর্তী সময়ে ব্যাপক লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন বাংলাদেশের বিপ্লবী কমিউনিস্ট লীগের কেন্দ্রীয় ও জেলা নেতারা।
গতকাল সকাল সাড়ে ৭টায় ঘটনাস্থল পরিদর্শনে যান বিপ্লবী কমিউনিস্ট লীগের সাধারণ সম্পাদক, বাম গণতান্ত্রিক জোটের কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক এবং ভবদহ পানি নিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটির প্রধান উপদেষ্টা কমরেড ইকবাল কবির জাহিদ। তার সাথে ছিলেন কেন্দ্রীয় নেতা কমরেড জিল্লুর রহমান ভিটু, মুক্তিযোদ্ধা কমরেড গাজী আব্দুল হামিদ, জেলা নেতা পলাশ বিশ্বাস, স্থানীয় নেতা সাধন বিশ্বাস, কানু বিশ্বাস ও উত্তম বিশ্বাসসহ সংগঠনের অন্যান্য নেতৃবৃন্দ এবং এলাকাবাসী।
পরিদর্শন শেষে কমরেড ইকবাল কবির জাহিদ সাংবাদিকদের বলেন, “ঘেরের বিরোধের জেরে তরিকুল নামে এক যুবককে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। আমরা এই হত্যাকা-ের বিচার চাই, দোষীদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও শাস্তি চাই।” তিনি আরও বলেন, “এই হত্যাকে কেন্দ্র করে একটি চিহ্নিত মহল ডহর মশিহাটি (বাড়েদা) গ্রামে ১৯ থেকে ২০টি বাড়িতে লুটপাট, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ চালিয়েছে। এমনকি সাগর নামে এক যুবককে অপহরণ ও মোটরসাইকেল লুটের ঘটনাও ঘটেছে। সুন্দলী বাজারেও এ ধরনের লুটপাট হয়েছে।”
তিনি এই ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে বলেন, “সরকার ও প্রশাসনকে আরো জোরালো ভূমিকা নিতে হবে যাতে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট না হয়। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে দ্রুত খাদ্য ও অন্যান্য সহায়তা প্রদান করতে হবে।”
এ বিষয়ে পৃথক এক বিবৃতিতে বাংলাদেশের বিপ্লবী কমিউনিস্ট লীগের যশোর জেলা কমিটির সম্পাদক কমরেড তসলিম উর রহমান বলেন, “তরিকুল হত্যাকা-ের বিচার ও অগ্নিসংযোগ, লুটপাটে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই। প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তায় দুষ্কৃতিকারীরা উৎসাহিত হয়েছে।”
এদিকে, এলাকায় এখনো থমথমে অব¯’া বিরাজ করছে। ঘটনাস্থলে বাড়িঘরের ধ্বংসস্তূপ, ছাই আর ক্ষতিগ্রস্তদের আহাজারি পরিস্থিতির ভয়াবহতা তুলে ধরছে। স্থানীয়রা দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।

