আজিবর রহমান। পত্রিকার হকার। মিষ্টভাষী, সবার সাথে হেসে কথা বলেন। জীবনে কষ্ট বলে তার অভিধানে কোন ভাষা সেই। ঝড়-বৃষ্টি ৩০ বছর ধরে তার কাছে হার মেনেছে। সেই ভোর রাতে বাড়ি থেকে বের হয়ে সন্ধ্যায়, কোন কোন দিন রাতে বাড়ি ফেরেন। বছরে যেদিন পত্রিকা বন্ধ থাকে, সেদিন তার ঈদের দিন। স্ত্রী, পুত্র নিয়ে ঘুরতে বের হন। যশোরের অফিস আদালত এলাকার মানুষ তাকে এক নামেই চেনে। বিভিন্ন বাসা-বাড়ি, অফিস-আদালত, স্কুল-কলেজ এবং আদালত পাড়ায় পত্রিকা বিক্রি করেন। জীবন সংগ্রামে কিশোর বয়সে এই কঠিন পেশা বেচে নিয়ে আজিবর সকাল থেকে বিকাল ৫ পর্যন্ত সাইকেল চালিয়ে, পা হেটে পত্রিকা বিলি বন্টন করেন।
পত্রিকার ‘হকার’ পেশা হিসাবে কিভাবে আসলো? ‘পেপার, লাগবে নাকি আপনার পেপার!’ ১৮৩৩ সালে নিউইয়র্ক সিটির বিগ অ্যাপল স্ট্রিটে ১০ বছর বয়সী বার্নি ফ্ল্যাহার্টি যখন কথাটি বলছিল তখন কেউ কি ভাবতে পেরেছিল, ছেলেটিই পৃথিবীর প্রথম পত্রিকার বাহক বা হকার হিসেবে খ্যাতিমান হবে। বার্নি ফ্ল্যাহার্টির এ খ্যাতির কৃতিত্ব অবশ্য ভাগ করে দেওয়া যায় তখনকার নিউইয়র্ক সান পত্রিকার প্রকাশক বেঞ্জামিন ডে-কে। কেননা, তিনিই তরুণ আইরিশ বার্নি ফ্ল্যাহার্টিকে ১৮৩৩ সালের ৪ সেপ্টেম্বর তাঁর পত্রিকার ক্যারিয়ার বা বাহক হিসেবে নিয়োগ দেন। পরে দ্য মিউজিয়াম অব দ্য সিটি অব নিউইয়র্ক ২০১২ সালের সেপ্টেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়োগকৃত প্রথম সংবাদকর্মীর প্রচেষ্টাকে সম্মান জানাতে জাতীয় সংবাদপত্রের বাহক দিবস ঘোষণা করে।
\
সংবাদপত্র আবিষ্কারের পর থেকেই এর বাহক তৈরি হয়েছে। তাঁদের কাজের গুরুত্ব বিবেচনা না করে আমরা অনেকে এটাকে ছোট পেশা মনে করেছি। জেনে রাখা ভালো, অনেক দেশের স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা তাদের জীবনের প্রথম চাকরি হিসেবে এ পত্রিকা বিলি করাকে বেছে নেয়। অনেকে হয়তো জানেন না, জেমস ক্যাগনি, অ্যালবার্ট আইনস্টাইন, এমনকি আইজ্যাক আসিমভ এবং মার্টিন লুথার কিং জুনিয়রের মতো রথী-মহারথীরা তাঁদের জীবনের প্রথম দিকে স্থানীয় পত্রিকা বিলি করেছেন।
পাঠক সকালে ঘুম থেকে উঠে বসে থাকেন কখন কাগজ হকার বাসায় দিয়ে যাবেন। তারা কি একবারও ভাবেন কার মাধ্যমে তার পছন্দের খবরের কাগজটি তিনি সহজেই পেয়ে যান? পাঠক মহল এক নামে চেনেন তার নাম হলো, ‘হকার’। যাকে পত্রিকার হকার বলে চেনেন এমনকি তাকে অনেক সময় ডাকা হয়,‘এই পেপার’,‘ওই পত্রিকা’ ইত্যাদি নামে। একটা পত্রিকার দাম যদি ৭ অথবা ১২ টাকা হয় তবে হকার ৭ অথবা ১২ টাকা বিক্রি করে পত্রিকার এজেন্ট এবং এজেন্ট পত্রিকার মালিককে দিয়ে কত টাকা হকার পায়? সে ক্ষেত্রে একজন হকার অবশ্যই নিরীহ মানুষ যার অঢেল টাকা কামানোর পথ নাই বলেই পত্রিকা বিক্রি করার জন্য নেমে যায়। সময়টা কখন পাঠক জানে? কি দিন কি রাত কি বৃষ্টি কি রৌদ্র, কি গরম কি শীত আকাশ পরিবেশের আবহাওয়া যেমনই থাক হকার তার আরামের ঘুম হারাম করে মোরগ ডাকার আগেই নেমে পড়েন এজেন্টের কাছ থেকে পত্রিকা সংগ্রহ করার জন্য তার পর কুকুরের মতো ছুটে চলেন মানুষের দুয়ারে দুয়ারে। পা ক্ষয় করেন গলা ফাটান শুধু একটা পত্রিকা বিক্রি করার জন্য।
আজিবর বলেন, ১৯৯৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে তিনি কেশবপুরের ভাল্লুকঘর গ্রাম থেকে যশোর শহরে চলে আসেন। বেজপাড়া এলাকায় অল্প টাকায় একটি মেসে উঠেন। এরপর খুলনার দৈনিক প্রবাহ পত্রিকার বিট পিয়ন হিসাবে কাজ শুরু করেন। ওই পত্রিকা বাসে করে মনিহার এলাকায় আসতো, সেখান থেকে তিনি বিভিন্ন জায়গায় ওই পত্রিকা বিলি করতেন। চিন্তা করলেন, এই কাগজ তো অল্প সময়ের মধ্যে বিলি করা হয়ে যায়। তখন ঢাকা এবং যশোরের অন্যান্য পত্রিকা বিলি করতে লাগলেন।
সে সময় আজিবর ২শ’ পত্রিকা বিলি করত। এই পত্রিকা বিলি করেই যশোর শহরের উপকন্ঠ পুলেরহাটে ১২ শতক জমি কিনেছে। সেখানে বাঁশের চাচ এবং উপরে টিন দিয়ে বাড়ি তৈরি করে বসবাস করছে। দুই পুত্রের বড় পুত্র ৯ম শ্রেণিতে এবং ছোট পুত্র তৃতীয় শ্রেণিতে পড়শোনা করে। আজিবর রহমানের বলেন, এখন অনেকে পত্রিকা পড়তে চান না। তারা অনলাইনে পত্রিকা পড়ে ফেলে রাতে। তাই পত্রিকার গ্রাহক কমে যাচ্ছে। প্রতিদিন তার পত্রিকা বিক্রি করে ৬শ’ থেকে ৭শ’ টাকা আয় হয়।
এ টাকা দিয়ে এই দুর্মূল্য বাজারে সংসার চালানো কষ্টকর। হকার হিসাবে কাজ করতে গিয়ে একটি মধুর স্মৃতি আছে আজিবরের। ২০১৭ সালে পত্রিকা বিলি করার সময় যশোর শহরের সিভিল কোর্ট মোড়ে একটি টাকার ব্যাগ কুড়িয়ে পান। সেই ব্যাগে ছিল একটি ডায়েরি। তা দেখে তিনি ফোন করেন ওই নম্বরে। বুঝতে পারেন এটা গাজী টায়ার কোম্পানির। ওই কোম্পানির লোক এসে পরে তার কাছ থেকে ব্যাগটি সংগ্রহ করেন এবং তাকে পুরষ্কার দিতে চাচ্ছিলেন। কিন্তু তিনি টাকা নেননি।
পরে তারা প্রস্তাব দেন ওই কোম্পানি তাকে দেবে। তাতেও আজিবর রহমান রাজী হননি। তিনি বলেছেন, আমি পড়াশোনা করেছি ৮ম শ্রেনি পর্যন্ত। তাই এই পেশা ছেড়ে আমি ঢাকায় গিয়ে কিভাবে থাকব? আজিবরের ইচ্ছা খুব অল্প বয়সে হকার পেশায় আসায় তিনি ছেলেদের উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করবেন।
হকাররা হয়তো শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বাসায় থাকার স্বপ্ন দেখে না তবে একটু ভালো করে বাঁচার আশা করেন। তিন বেলায় অন্তত ডাল ভাত খাবে এমন আশা করতেই পারে।- সাজেদ রহমান (সাংবাদিক ও কলামিষ্ট)

