শনিবার, ১৭ই জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ৩রা মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ, ২৮শে রজব, ১৪৪৭ হিজরি

মনিরামপুরে শিমুল হত্যা মামলার পূনঃতদন্তের দাবি এলাকাবাসির

আরো খবর

সুমন হোসাইন: যশোরের মনিরামপুর থানার সরশকাটি গ্রামে স্কুল ছাত্র শিমুল হত্যা মামলার পুনঃতদন্তের দাবি জানিয়েছে এলাকাবাসি।তাদের অভিযোগ নিরপেক্ষ তদন্ত না হওয়ায় অনেক বিষয় অজানা রয়েগেছে। যা নিয়ে সৃস্টি হয়েছে নানা প্রশ্ন।

 

মামলার সূত্রে জানা যায়, ২০১৮ সালে ১০ অক্টোবর রাত ৮ টার দিকে শিমুলকে তার মোবাইল ফোনে কে বা কারা (অজ্ঞাত) র‌্যাকেট খেলার জন্য বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে যায়। কিন্তু অনেক সময় ধরে শিমুল বাড়িতে না আসলে তার মা রাত সাড়ে ১১টার দিকে ফোন করলে তার মোবাইল বন্ধ পায়। পরের দিন ১১ ডিসেম্বর-২০১৮ তারিখে সকালে সরশকাটি গ্রামস্থ স্বরনপুর থেকে রাজগঞ্জ গামী পাঁকা রাস্তার পার্শ্বে তার গলাকাটা ক্ষতবিক্ষত লাশ পাওয়া যায়। পরে মনিরামপুর খেদাপাড়া পুলিশ ফাঁড়ি এসে লাশ ময়না তদন্তের জন্য নিয়ে যায়। এবং মনিরামপুর থানায় একটি মামলা দায়ের হয় । যার নং-১৫ তারিখ: ১১/১২/২০১৮ইং। শিমুল সরশকাটি গ্রামের আনছার সদস্য রফিকুল ইসলামের ছেলে। সে স্থানীয় কাশিমপুর বিদ্যালয় থেকে ২০১৮ সালে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ গ্রহণ করে।

এলাকাবাসি জানায়, শিমুল হত্যা মামলাটি বিগত সময় প্রকৃত দোষীদের সনাক্ত করতে ব্যার্থ হয়েছে পুলিশ। মামলার দায় সারতে যাদেরকে আসামি করা হয়েছে তারা কোন ভাবেই এই হত্যার সাতে জড়িত না। হত্যার ঘটনা অন্য দিকে প্রবাহিত করতে গ্রামের সাধারন কয়েকজনকে আসামি করে মামলার আসামি করা হয়েছে। অথছ মামলার এজাহারে তাদের কারোর নাম নেই।

তারা আরও জানান, অপরাধী যেই হোক না কেন শিমুল হত্যার শাস্তি পাক আমরা সেটাই দাবি জানাচ্ছি। তাদের মতে এই মামলা পূনঃতদন্ত করলে বেরিয়ে আসবে প্রকৃত সত্য ঘটনা।

অনুসন্ধানে জানা যায়, শিমুল হত্যা মামলার ২নং আসামি আব্দুস সামাদ মোড়ল সরশকাটি গ্রামের একজন সাধারন দিনমুজুর এবং সরল সোজা মানুষ। তিনি তার ছেলে জাহিদুলকে আনছারে চাকরি দেবার জন্য ৮ লাখ টাকা দেন শিমুলের পিতা প্রতিবেশি রফিকুল ইসমের কাছে । রফিকুল ইসলাম ঢাকার গাজীপুরে আনসার ব্যাটালিয়ান অফিসের একজন কর্মচারী।

তবে এই টাকার কোন স্ট্যাম্প করেননি। প্রতিবেশি রফিকুলের প্রতি আস্থা এবং ভরসার কারনে তার বাড়িতে গিয়ে প্রথমে ৩ লাখ এবং পরবর্তীতে ঝিকরগাছা ইসলামি ব্যাংকের মাধ্যামে আরও ৫ লাখ টাকা প্রদান করেন। কিন্তু আনছার সদস্য রফিকুল জাহিদুলকে চাকরি দিতে না পারায় সামাদকে ৮ লাখ টাকা ফেরত দিয়ে দেন এবং ফেরত দেবার সময় সরশকাটি বাজারে বসে জনসম্মুখে ফেরতকৃত টাকার স্ট্যাম্প করেন। যা পরবর্তীতে এই হত্যা মামলায় টাকা সংক্রান্ত লেনদেন দেখিয়ে মোঃ আব্দুস সামাদ মোড়লকে ২নং আসামি এবং মেয়ের জামাই সিরাজকে ৩নং আসামি ও ছেলে জাহিদুল ইসলামকে ৪নং আসামি করা হয়। তারা আরও জানান, এই হত্যা মামলার অজ্ঞত আসামি যাদের করা হয়েছে এরা দোষী নাও হতে পারে। সে সময় দলীয় কোন্দলে এদেরেকে আসামি করা হয়েছে বলেও গুঞ্জন রয়েছে।

স্থানীয়রা জানান, মামলার ১নং আসামি আকাশও আনছারের চাকরি নিবে বলে শিমুলের পিতা রফিকুলের কাছ ৭ লাখ টাকা প্রদান করেন এবং আকাশের চাকরিও হয় কিন্তু আকাশ শিমুল হত্যা মামলার আসামি হওয়ার কারনে সে আনছার ব্যাটালিয়নে যোগ দিতে পারিনি। তার প্রধান কারন শিমুল হত্যার পর তাকে প্রধান আসামি করা হয়। এজন্য তার পুলিশ রিপোর্ট নেগেটিভ দেয়।

স্থানীয় গোপন সূত্রে জানা যায়, শিমুল হত্যার নিদৃষ্ট কাওকে সনাক্ত করতে পারিনি তদন্ত কর্মকর্তা। সে সময় মামলার তদন্তের ভার পড়ে যশোর পুলিশ ব্যুরো অব ইভেস্টিগেশ (পিবিআই)-এর এসআই আব্দুল মান্নানের উপর। এস আই মান্নান সে সময় মামলার অজ্ঞাত (প্রথমিক ধারনা) কৃত আসামি মোঃ আব্দুস সামাদ মোড়লকে ২নং আসামি এবং তার মেয়ের জামাই সিরাজকে ৩নং আসামি ও ছেলে জাহিদুল ইসলামকে মামলা থেকে নাম বাদ দিতে ৩ লাখ টাকা দাবি করেন। কিন্তু সামাদ তার কথায় রাজি হয়নি। পরে টাকা না পেয়ে তাদেরকে শিমুল হত্যার মামলার আসামি করা হয়েছে বলে দাবি করেছেন আব্দুস সামাদ।

শিমুল হত্যার ব্যাপারে পুলিশের তদন্ত প্রতিবেদন এবং এলাকাবাসীর দেয়া বক্তব্যে বেরিয়ে আসছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। তদন্ত কর্মকর্তার দেয়া প্রতিবেদনে যাদেরকে মামলার স্বাক্ষী করা হয়েছে তাদের মধ্যে পারভীনা খাতুন এবং আবু মুছা তাদের লিখিত বক্তব্যে উল্লেখ করেছেন শিমুলের চাচত ভাই সবুজের সুন্দরী স্ত্রী (আসমিরার)সাথে তার(শিমুল) পরকীয়া প্রেমের সম্পর্ক ছিল। বিষয়টি জানাজানি হলে দুই পরিবারের মধ্যে চরম বিরোধ তৈরি হয়। একপর্যায় সবুজ তার স্ত্রীকে নিয়ে শশুরবাড়ি পাশ্ববর্তী মধুপুর গ্রামে গিয়ে বসবাস করতে থাকেন। স্থানীয়দের দাবি নারী ঘটিত বিষয়টি হত্যাকান্ডের কারণ হতে পারে। তাদের বক্তব্য মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা হত্যাকান্ডে ব্যবহৃত অস্ত্র উদ্ধার বা আলামত হিসেবে জব্দ দেখাননি। তাছাড়া শিমুল কোথায় হত্যা হয়েছে তদন্তে তা উল্লেখ বা পরিস্কার করা হয়নি। হত্যায় শিমুলের শরীরে ধারালো অস্ত্র দিয়ে তার গলাকাটা হয়েছে এবং শরীরের বিভিন্ন স্থানে জখম করা হয়েছে তা প্রকাশ পায়।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, শিমুলের মরাদেহ যেখান থেকে উদ্ধার করা হয় সেখানে কোন রক্তের দাগ বা আলামত পাওয়া যায়নি। সে ঘটনার রাতে যে শার্ট প্যান্ট পরে বাড়ি থেকে বের হয়েছিল তার মরাদেহে সেই শার্ট প্যান্ট ছিল। পরে তার শার্ট খুলে দেখা যায় তার শরীরে একাধিক স্থানে ধারাল অস্ত্রের আঘাতের চিহ্ন এবং গলা কাটা। তাদের ধারনা তাকে অন্য কোন স্থানে হত্যা করে লাশ বাড়ির পাশে ফেলে রাখা হয়। প্রকৃত ঘটনা স্থল কোথায় এবং হত্যাকান্ডে কিধরনের অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে পুলিশের তদন্তে তা পরিস্কার করা হয়নি। ফলে তদন্ত নিয়ে সৃস্টি হয়েছে ধুম্্রজাল। স্থানীয়দের দাবি মামলাটি যথযথভাবে তদন্ত করা হয়নি।

মামলার স্বাক্ষী ওই গ্রামের মোঃ আবু মুছা জানান, আমি পুলিশে চাকরি করি। ২০১৮ সালে ১১ ডিসেম্বর মোবাইলে জানতে পারি আমার প্রতিবেশি আনছার সদস্য রফিকুলের ছেলে শিমুল হত্যা হয়েছে। এই মামলার তদন্তকালে এসআই মান্নান আমাকে একটি কাগজে স্বাক্ষর করিয়ে নেন। ওই কাগজে কোন লেখা ছিলো না। পরে জানতে পারি আমাকে ওই মামলার স্বাক্ষী করা হয়েছে।

শিমুল হত্যার সাথে সামাদ, তার ছেলে জাহিদুল ও জামাই সিরাজ জড়িত কিনা প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এরা হত্যাকারী হতে পারে না। এরা সমাজের নিরীহ প্রকৃতির মানুষ। তবে শিমুল হত্যাকারী কে বা কারা দীর্ঘ ৭ বছর পার হলেও এখনও প্রকৃত সত্য উদঘটন হয়নি বলে মনে করেন তিনি। তিনি বলেন, আমরা গ্রামবাসি এই হত্যার সাথে জড়িত প্রকৃত আসামিদের মুখোস উন্মোচন করার জোর দাবি জানাচ্ছি।

আরো পড়ুন

সর্বশেষ