শনিবার, ১৭ই জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ৩রা মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ, ২৮শে রজব, ১৪৪৭ হিজরি

সাতক্ষীরার পানসি হোটেলে গরুর মাংস আসে অজ্ঞাত স্থান থেকে!

আরো খবর

ফারুক রহমান, সাতক্ষীরা:
সাতক্ষীরার অন্যতম প্রসিদ্ধ রেস্তোরাঁ ‘পানসি হোটেলে’ প্রতিদিন রান্নায় ব্যবহৃত গরুর মাংস সরবরাহ করা হচ্ছে অজ্ঞাত স্থান থেকে। হোটেলটিতে নিয়মিত খেতে আসা মানুষজন বিষয়টি জানার পরে খাদ্য নিরাপত্তায় ভুগছে। জনস্বাস্থ্য হুমকির মুখে! পৌরসভার কসাইখানায় জবাইকৃত মাংস নিতে চান না হোটেল মালিক!

 

 

সাতক্ষীরা জেলা শহরের পৌর সদরে সরকারি বালিকা বিদ্যালয়ের বিপরীতে প্রাণসায়র খালের পশ্চিম পাড়ে অবস্থিত ‘পানসি হোটেল’টি দীর্ঘদিন সুনামের সাথে ব্যবসা করে আসছে। জেলা সাতক্ষীরা জেলার বাইরে থেকেও মানুষ এখানে খাওয়ার জন্য এসে ভিড় করে।

 

 

পানসি হোটেলে বর্তমানে যে গরুর মাংস ব্যবহার করা হচ্ছে তা জেলা সদরের কোন কসাই, মাংস ব্যবসায়ীর সরবরাহকৃত মাংস নয়। অজ্ঞাত স্থান থেকেই মাংস প্রতিদিন হোটেলের রান্নাঘরে আসে। অভিযোগ পাওয়ার পর এই প্রতিবেদক মাংস সরবরাহের প্রতিষ্ঠান খুঁজতে দীর্ঘ সময় পর্যবেক্ষণ করেন।

 

 

গত বুধবার, বৃহস্পতিবার (২৪ ও ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫) পরপর দুইদিন সকাল সাড়ে ১০টা থেকে ২১টা পর্যন্ত শহরের নারকেলতলা মোড়ে খুলনা থেকে আসা একটি যাত্রীবাহী বাস থেকে নামিয়ে দেওয়া একটি বস্তা ভ্যানে করে পানসি হোটেলের দিকে নিয়ে যেতে দেখা যায়।

 

 

এক পর্যায়ে গত বৃহস্পতিবার সকাল ১১টায় ভ্যানটি থামিয়ে মাংসের বস্তা সম্পর্কে জানতে চাইলে ধ্যানে বসে থাকা যুবক এই মাংস প্রতিদিন খুলনা জেলার ডুমুরিয়া উপজেলার আঠারোমাইল নামক স্থান থেকে জবাইকৃত গরুর মাংস নিয়ে পানসি হোটেলে সরবরাহ করা হয় বলে জানায়।

 

 

অভিযোগ রয়েছে, আঠারোমাইল নামক জায়গাটি খুলনা এবং সাতক্ষীরা জেলার সীমান্তবর্তী এলাকা হওয়ায় সেখানে মরা, রোগাক্রান্ত, অসুস্থ, গর্ভবতী গরু জবাই করা হয়। মহিষ জবাই করে গরুর মাংসের নামে বিক্রি করা হয়। খুলনা সাতক্ষীরা অঞ্চলের হোটেল, রেস্টুরেন্টগুলোতে সরবরাহ করে একটি চক্র। ওই চক্র এই মাংস বস্তায় ভরে অপরিচ্ছন্নভাবে পানসি হোটেলে সরবরাহ করা হচ্ছে দীর্ঘদিন। পানসি হোটেল কর্তৃপক্ষ দাম কম হওয়ায় ঝুঁকিপূর্ণ এই মাংস হোটেলটিতে বিক্রি করছে।

 

 

শুক্রবার বেলা ১২টায় হোটেলের সামনে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করে কয়েকজনের সাথে কথা বলে বিষয়টি নিয়ে কথা বললে, তারা জানান এই হোটেলটিতে আমরা দীর্ঘদিন খেয়ে আসছি। অজ্ঞাত স্থানে জবাই করা গরুর মাংস এই হোটেলে সরবরাহ করা হয় জানার পর খাবারে ব্যবহারিত মাংসের ব্যাপারে খোঁজখবর নিয়ে তারপরে খেতে আসবো।

 

 

এদিকে, সম্প্রতি জেলা সদরের লাবসার বাইপাস এলাকা থেকে মরা গরু পরিবহনের সময় ওই চক্রের দুইজনকে মরা গরুর মাংস ও একটি মিনি পিকআপ ধরে পুলিশে দেয় স্থানীয়রা। জেলার সীমান্ত এলাকায় রোগাক্রান্ত ও মরা গরু ও মহিষ জবাই করে চক্রটি কৌশলে অন্যান্য হোটেলে বিক্রি করে এমন অভিযোগ রয়েছে।

এদিকে, কয়েকজন বিশেষজ্ঞের সাথে কথা বলে জানা গেছে, বস্তায় করে মাংস সরবরাহ করা হলে সেটি ধুলোবালি, রোগজীবাণু এবং অন্যান্য দূষক পদার্থের সংস্পর্শে আসতে পারে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করে। বস্তায় করে মাংস সরবরাহ করা হলে সেটি অস্বাস্থ্যকর ও ভেজাল হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এটি ভোক্তা অধিকার লঙ্ঘন এবং জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। রেস্টুরেন্টে বিক্রি করার আগে মাংসকে নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে পরিষ্কার ও প্যাকেটজাত করে রান্নার কাজে ব্যবহার করতে হবে। এর বাইরে কিছু হলে তা ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইনে শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে গণ্য হবে।

 

 

জানা গেছে, রেস্টুরেন্ট ব্যবসার নীতিমালা অনুযায়ী, অনুমোদিত উৎস থেকে মাংস সংগ্রহ করে বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক প্রণীত পশু জবাই ও মাংসের মান নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১১ মেনে পরিবেশন করার কথা উল্লেখ রয়েছে আইনে।

 

 

খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার আঠারোমাইল বাজার এলাকার মাংস ব্যবসায়ী শহিদুল ইসলাম জানান, তিনি সাতক্ষীরার পানসি হোটেলে নিয়মিত মাংস সরবরাহ করেন। তবে তার ওখানে জবাইকৃত গরু-মহিষ সুস্থ স্বাভাবিক কিনা এবং মানুষের খাওয়ার উপযোগী কিনা তা পরীক্ষা করার কোন কর্তৃপক্ষ নেই। এভাবেই তিনি দীর্ঘদিন পানসি হোটেলে মাংস সরবরাহ করে আসছে।

জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর সাতক্ষীরার সহকারী পরিচালক জানান, পঁচা গলা দুর্গন্ধ না হলে আমাদের তেমন কিছু করার থাকে না।

সাতক্ষীরা পৌরসভার স্যানিটারী ইন্সপেক্টর রবিউল আলম জানান, পশু জবাই পর্যন্ত তার দায়িত্ব, রেস্টুরেন্টের মাংসের বিষয়টি নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ দেখে।

জেলা নিরাপদ খাদ্য কর্মকর্তা দীপংকর দত্ত জানান, অভিযোগ পেলে বিষয়টি খতিয়ে দেখবো।

 

 

 

পানসি রেস্তোরাঁর মালিক জিএম ফাত্তাহ তার মালিকানাধীন পানসি হোটেলে অনুমোদনবিহীন কসাইখানা থেকে জবাইকৃত গরুর মাংস রান্না করে বিক্রির বিষয়ে বলেন, সাতক্ষীরা শহরের বড়বাজারের মাংস না কেনায় একটি চক্র অপপ্রচার চালাচ্ছে।

 

তিনি মাংস যথাযথ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পরিবহন না করার বিষয়ে বলেন, বিষয়টি সমাধান করতে হঠাৎ কেমনে নেওয়া হবে।

আরো পড়ুন

সর্বশেষ