বিশ্বজিৎ সিংহ রায়,,মহম্মদপুর ( মাগুরা): গ্রামবাংলার জলাভূমি,খাল-বিল,পুকুরপাড় কিংবা ভেজা ধানখেতের পাশে চোখ রাখলেই দেখা মিলত- একসময় সাদা বা হালকা গোলাপি রঙের কুঁকড়ানো পাপড়ির ছোট্ট,সরল অথচ হৃদয় ছোঁয়া এক ফুল। এই ফুলের নাম কলমি ফুল।যেন প্রকৃতির আঁচলে জড়িয়ে থাকা ভোরবেলার হাসি।
বাতাসে হালকা দুলে থাকা সেই ফুল আজও গ্রামবাংলার স্মৃতিকে জাগিয়ে রাখে,কৃষকের পথচলার সঙ্গী হয়ে থাকে থাকে কবির কলমে,সংগীতের সুরে,স্মৃতির মায়াবী তালিকায়।
মাগুরার মহম্মদপুর উপজেলার ইছামতি বিলে অসংখ্য সদ্য ফোটা কর্মী ফুল দেখা যায়।
কলমি ফুলের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এক ধরনের সহজ-সরল ভাব।কোনো আড়ম্বর নেই,নেই দাম্ভিকতা।সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের পাশে থাকা এই ফুল যেন গ্রামের মেয়েদের মতই-
লজ্জাবতী,শান্ত,কোলাহলহীন। প্রকৃতি তাকে সাজিয়েছে সরলতাতেই।
সেই সরলতাই তাকে করেছে অভিজাত,করেছে স্মরণীয়।সকালের শুকতারা মিলিয়ে যাওয়ার আগেই সে ফুটে ওঠে।শিশিরভেজা ঘাসের গায়ে যখন সূর্যের প্রথম সোনালি আলো পড়ে,ঠিক তখনই কলমি ফুলের পাপড়ি খুলে যায় ধীরে-ধীরে। তার রঙে নেই গাঢ়তা,নেই চোখে লাগার মতো উজ্জ্বলতা তবুও মন কেড়ে নেওয়ার শক্তি অসীম।
কলমি শুধু একটি ফুল নয়-গ্রামের মানুষের কাছে এটি সরাসরি প্রকৃতির ভাষা।
কৃষক মাঠের সীমানায় বসে বিশ্রাম নিতে নিতে এই ফুলের দিকে চেয়ে থাকা মানেই ক্ষণিকের শান্তি।
পথ হাঁটা কিশোরী তার শাড়ির আঁচলে কলমি ফুল গুঁজে নেয় অনায়াসে।
শিশুরা এটিকে বানায় নৌকা ভাসানোর খেলায় গল্পের অংশ।
যেন কলমি ফুল মানুষের জীবনের সাথে এমনভাবে মিশে আছে,যেমন শৈশব মিশে থাকে স্মৃতির ভেতরে।
খাল-পুকুরের জলে কলমি গাছের পাতারা ছায়া ফেলে রাখে সারা দিন।
পানির মুখে ভেসে থাকা তাদের দোলায় যেন নদীর সুর।এই জলজ পাতার মাঝেই মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকে ফুলগুলো-সাদা-গোলাপি রঙে,নিঃশব্দে। মনে হয়-“কেউ আমায় দেখুক কি না দেখুক,আমি ফুটবো,কারণ এটাই আমার আনন্দ।”
আজ যখন শহর বাড়ছে,বিলুচ্ছে বিল ও খাল, আধুনিকতার দৌড়ে মানুষ পিছনে ঠেলে দিচ্ছে গ্রামের স্মৃতি-তখন কলমি ফুল হয়ে উঠছে দূরবর্তী এক গল্প।যেখানে প্রকৃতি ছিল শিক্ষক
বাতাস ছিল সঙ্গীত আর একটি সাদা-গোলাপি ফুল ছিল মন ছুঁয়ে যাওয়ার সাথী।
কলমি ফুল যেন আমাদের মনে করিয়ে দেয় সৌন্দর্য কখনো জোরে চিৎকার করা নয়।সৌন্দর্য হচ্ছে নীরবে ফুটে থাকা শেষশব্দ।
গোলাপি-সাদা কলমি ফুল নিঃশব্দে শিখিয়ে যায়-জীবনে ধীর হও,স্বাভাবিক হও,নিজের মতো ফুটে ওঠো।জাঁকজমক নয়,স্পর্শই সৌন্দর্যের আসল ভাষা।গ্রামবাংলার স্নিগ্ধ বিকেলের মতো-কলমি ফুল চিরকাল থাকবে হৃদয়ের জানালায়,হালকা বাতাসে দুলতে থাকা এক মায়াবী স্মৃতি হয়ে।

