শাহরিয়ার কবীর সৈকত, নড়াইল:
একুশে পদকপ্রাপ্ত কবি বিজয় সরকারের মৃত্যুর ৪০ বছরেও গড়ে ওঠেনি কবির স্মৃতি রক্ষার্থে ‘স্মৃতি সংগ্রহশালা’। ফলে, অযতœ অবহেলায় স্থাপনাসহ কবির ব্যবহৃত খাট, পাদুকা, পাঞ্জাবিসহ নষ্ট হচ্ছে বিভিন্ন জিনিসপত্র । সংরক্ষণের অভাবে বিজয় সরকারের অনেক গানের পান্ডুলিপি হারিয়ে যেতে বসেছে।
প্রয়াত কবির বসতভিটায় ২০০৯ সালে ‘বিজয় মঞ্চ’, আগত শিল্পীদের বসার জন্য মঞ্চ সংলগ্ন একটি কক্ষ, কবির ব্যবহৃত জিনিসপত্র রাখার জন্য একটি কক্ষ এবং একটি টয়লেট নির্মাণ করা হলেও তা ব্যবহারের অযোগ্য হয়ে পড়েছে। কবির বাড়িতে কোনো অনুষ্ঠান না হওয়ায় শিল্পীদের বসার কক্ষে বছরের অধিকাংশ সময় মাছের খাবার এবং জ্বালানি রাখা হয় এবং মঞ্চের ওপর গরুর ঘাস ও খড় কাটা হয়ে থাকে।
এছাড়া নির্জন এলাকা হওয়ায় কবির বসত ভিটায় অসামাজিক কর্মকান্ড ও মাদকসেবীদের আড্ডা বসে বলেও এলাকাবাসির অভিযোগ রয়েছে।
কবির দূর সম্পর্কের আত্নীয় বিমল সিকদারের ছেলে দেবা সিকদার জানান, আমরা মঞ্চসহ জায়গাটি দেখাশোনার দায়িত্বে থাকলেও এখানকার পরিবেশ দিন দিন খারাপ হচ্ছে। এখানে অসামাজিক থেকে শুরু এমন অনেক কর্মকান্ড ঘটছে যা মুখে বলা যায় না। আমরা অনেক কিছু বলতেও পারি না। তিনি এখানে নিরাপত্তার বিষয়টি দেখবার জন্য প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেন।
সুশান্ত পাল নামে একজন পর্যটক বলেন, আমরা কবি বিজয় সরকারের বাড়ি এবং তাঁর স্মৃতি বিজড়িত জিনিসপত্র দেখতে এসেছি। কিন্তু, এখানে খাবার পানিসহ বিশ্রামের কোন ব্যবস্থা নেই, ওয়াশরুম নেই। যে ওয়াশরুম আছে সেটা ব্যবহারের অযোগ্য। তিনি সরকারের কাছে কবির বসত ভিটার সীমানা প্রাচীর, পর্যটকদের বিশ্রামাগার ও সুপেয় পানিসহ ওয়াশরুম নির্মানের দাবি জানান।
ডুমদি গ্রামের বিদ্যুৎ বিশ্বাসসহ প্রতিবেশিরা জানান, কবির বাড়িতে আসার পাঁকা রাস্তাটি সংস্কারের অভাবে চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়েছে। এছাড়া সরকার মন্দির পাঁকা করে দিয়েছে এবং একটি মঞ্চ করে দিয়েছিল। কিন্তু, মঞ্চটি সংরক্ষণ ও সংস্কারের অভাবে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। কবির বসতভিটা ও স্মৃতি রক্ষার্থে সীমানা প্রাচীর নির্মান, সুপেয় পানির ব্যবস্থা, পর্যটকদের বিশ্রামাগার ও ওয়াশরুম নির্মানের দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসি।
চারণকবি বিজয় সরকার ফাউন্ডেশনের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ফাউন্ডেশনের যুগ্ম-আহবায়ক এস এম আকরাম শাহীদ চুন্নু বলেন, বিজয় সরকারের স্মৃতি রক্ষায় সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি কবির বাস্তভিটায় ‘বিজয় তীর্থ’ নামে একটি প্রকল্প অনুমোদন করলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। এছাড়া শিল্পকলা একাডেমির মাধ্যমে নড়াইলে একটি তথ্য-গবেষণা ও সাংস্কৃতিক চর্চা কেন্দ্র অনুমোদনের অপেক্ষয় রয়েছে। তিনি আরো জানান, ২০১০ সাল থেকে বিজয় স্বর্ণ পদক চালু করা হয়েছে।
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) উপ-সচিব লিংকন বিশ্বাস বলেন, কবিয়াল বিজয় সরকারের বসতবাড়ি সংস্কারের জন্য যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহনসহ বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির সাথে যোগাযোগ করে বিজয় সরকার ফাউন্ডেশন ও এলাকাবাসির দাবি পূরণে ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে।
‘পোষা পাখি উড়ে যাবে সজনী একদিন ভাবি নাই মনে’,‘তুমি জাননা রে প্রিয় তুমি মোর জীবনের সাধনা’,‘এ পৃথিবী যেমন আছে তেমনই ঠিক রবে, সুন্দর এই পৃথিবী ছেড়ে একদিন চলে যেতে হবে’,‘নবী নামের নৌকা গড় আল্লাহ নামের পাল খাটাও বিসমিল্লাহ বলিয়া মোমিন কুলের তরী খুলে দাও’,‘জানিতে চাই দয়াল তোমার আসল নামটা কি’ এ রকম অসংখ্য গানের স্রষ্টা বাংলার কবিগানের অন্যতম প্রধান পুরুষ চারণ কবি বিজয় সরকার একাধারে গীতিকার, সুরকার ও গায়ক ছিলেন।
মরমি এই কবি বিচ্ছেদ, ভক্তি, ভালোবাসা, ধর্ম, শ্রেণী সংগ্রাম, দেশাত্ববোধক, মুক্তিযুদ্ধ এবং বঙ্গবন্ধু, বাউলসহ বিভিন্ন পর্যায়ের ১ হাজার ৮শ’ গান রচনা করেছেন। রচিত সব গানই নিজের সুরে গাওয়া। বাংলাদেশের কবি গানের উৎকর্ষ সৃষ্টিতে কবিয়াল বিজয় সরকারের অবদান অসামান্য। প্রচারবিমুখ ও নিভৃতচারী এই সংগীত সাধক আসরের প্রয়োজনে মঞ্চে বসেই গান রচনা করে তাৎক্ষনিকভাবে সুর করে তা পরিবেশন করেছেন। কবিগানের মধ্যে অশ্লিলতা দূর করে সবার জন্য উপযোগী করে কবিগানকে সমৃদ্ধ করে বাংলাদেশে জনপ্রিয় করে তোলেন কবিয়াল বিজয় সরকার ।
কবি বিজয় সরকার গান রচনা করে নিজেই তাতে সুর দিয়েছেন। অথচ তাঁরই গান অনেক শিল্পী সুর বিকৃত করে প্রচার করছেন বলে অভিযোগ করেছেন বিজয় ভক্তরা। তাঁরা কবির পন্ডুলিপি সংরক্ষণ ও শুদ্ধসুরে বিজয় সরকারের গান ‘বিজয় গীতি’ প্রচারের জন্য সরকারের নিকট জোর দাবি জানিয়েছেন।
কবিয়াল বিজয় সরকার ১৯০৩ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি নড়াইল সদরের নিভৃতপল্লী ডুমদি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৮৫ সালের ৪ডিসেম্বর বিজয় সরকারের মৃত্যুর পর ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কেউটিয়ায় তাঁকে সমাহিত করা হয়। শিল্পকলায় বিশেষ অবদানের জন্য ২০১৩ সালে মরণোত্তর একুশে পদকে ভূষিত হন তিনি।
৪ ডিসেম্বর ২০২৫ কবি বিজয় সরকারের ৪১ তম প্রয়ান দিবস (৪০ তম মৃত্যু বার্ষিকী) পালন উপলক্ষ্যে চারণকবি বিজয় সরকার ফাউন্ডেশন নড়াইল জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে নানা কর্মসূচির আয়োজন করেছে। কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে, কবির প্রতিকৃতিতে পুস্পমাল্য অর্পণ, মঙ্গল প্রদীপ প্রজ্বলন ও আত্মার শান্তি কামনায় ১ মিনিট নীরবতা পালন, আলোচনা সভা ও বিজয়গীতির আসর।

