সাব্বির হোসেন:
শীত এলেই যশোর জেলার গ্রাম ও জনপদে বদলে যায় জীবনযাত্রার চেনা ছন্দ। কুয়াশায় মোড়ানো ভোর, খেজুরগাছে ঝুলে থাকা হাঁড়ি, চুলার আগুনে ফুটতে থাকা রস আর ঘরে ঘরে পিঠা-পুলির আয়োজন—সব মিলিয়ে শীতের যশোর যেন ঐতিহ্য আর জীবনের এক প্রাণবন্ত মিলনমেলায় রূপ নেয়।
ঝিকরগাছা ও চৌগাছা উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে ভোরের আলো ফোটার আগেই গাছিরা খেজুরগাছ থেকে রস সংগ্রহে ব্যস্ত হয়ে পড়ছেন। রাতভর জমে থাকা স্বচ্ছ রস এখন শীতের অন্যতম আকর্ষণ। স্থানীয় বাজারের পাশাপাশি আশপাশের এলাকাতেও এসব রস বিক্রি হচ্ছে। অনেক মানুষ ভোরে ভোরেই তাজা রস সংগ্রহ করে শীতের স্বাদ ও আমেজ উপভোগ করছেন।

শার্শা ও নাভারণ এলাকায় শীতের শুরুতেই জমে উঠেছে গুড় তৈরির মৌসুম। গ্রামের খোলা আঙিনায় বসানো চুলায় বড় কড়াইয়ে রস জ্বাল দিয়ে তৈরি হচ্ছে পাটালি ও দানা গুড়। ধীরে ধীরে ঘন হয়ে ওঠা রসের মিষ্টি গন্ধ চারপাশে ছড়িয়ে পড়ছে। স্থানীয় হাটবাজারে এসব গুড়ের চাহিদা বাড়তে শুরু করেছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
শীত মানেই পিঠার সময়—এ কথা যেন সবচেয়ে বেশি প্রযোজ্য মণিরামপুর ও কেশবপুর উপজেলায়। ভাপা, চিতই, পুলি, দুধপুলি, পাটিসাপটা—নানান ধরনের পিঠায় মুখর হয়ে উঠছে গ্রামীণ উঠান। সকালে কিংবা বিকেলের আড্ডায় পিঠা ছাড়া যেন শীতের অনুভূতি সম্পূর্ণ হয় না। আত্মীয়স্বজন ও অতিথি আপ্যায়নেও পিঠা এখন শীতের প্রধান অনুষঙ্গ।
এদিকে বাঘারপাড়া উপজেলাসহ যশোর জেলার বিভিন্ন এলাকায় শীতের সবজি চাষে ব্যস্ত সময় পার করছেন কৃষকেরা। ফুলকপি, বাঁধাকপি, শিম, গাজর, মুলা, লাউসহ নানা ধরনের সবজি মাঠ থেকে সরাসরি চলে আসছে বাজারে। কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এবার সবজির ফলন ভালো হয়েছে। এতে কৃষকের পাশাপাশি সাধারণ ভোক্তারাও উপকৃত হচ্ছেন।

জেলার হাটবাজারগুলোতে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত শীতের সবজি, খেজুরের রস ও গুড় কিনতে মানুষের ভিড় লক্ষ্য করা যাচ্ছে। শহরাঞ্চল থেকে অনেকেই গ্রামে গিয়ে খাঁটি গুড় ও রস সংগ্রহ করছেন। এতে একদিকে গ্রামীণ অর্থনীতিতে চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে, অন্যদিকে ঐতিহ্যবাহী পেশাগুলোও নতুন করে প্রাণ ফিরে পাচ্ছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, আধুনিক জীবনের ব্যস্ততার মাঝেও যশোরে শীত এলেই খেজুরের রস, গুড় ও পিঠা-পুলির সংস্কৃতি এখনো অটুট রয়েছে। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বয়ে চলা এই ঐতিহ্য নতুন প্রজন্মের কাছেও সমানভাবে আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে।
ঝিকরগাছা থেকে চৌগাছা, শার্শা, নাভারণ, মণিরামপুর, কেশবপুর ও বাঘারপাড়া—যশোর জেলার প্রতিটি উপজেলায় শীত শুধু ঠান্ডার মৌসুম নয়। খেজুরের রসের মিষ্টতা, গুড়ের ঘ্রাণ, পিঠা-পুলির উষ্ণতা আর শীতের সবজির সবুজে এই সময়টা হয়ে ওঠে গ্রামবাংলার জীবনের উৎসব ও ঐতিহ্যের ধারক।

