আব্দুল্লাহ আল মাহফুজ
ণস্থায়ী এই পৃথিবীতে আমরা কতো কিছু পাই আবার হারিয়েও ফেলি। এর মধ্যে আমাদের একানন্ত প্রিয় মানুষও থাকেন। যেমন- অতি সম্প্রতি আমি আমার প্রাণ প্রিয় পিতাকে হারিয়েছি। যার অভাব আমার জীবনে আর কোনো দিন পূরণ হবে না। জীবনের প্রতিটি ফেলে আসা দিনের সাথে আমার আব্বুর স্মৃতি জড়িত।
আমার অভিভাবক, আমার শিক, আমার বন্ধু, আমার আদর্শ, আমার সুখ-দুঃখের অংশীদার । পৃথিবীতে আমার সবচাইতে প্রিয় মানুষটি ছিলেন আমার পিতা। ২০২০ সালের ৪ টা অগষ্ট আমার আব্বু আমাদেরকে ছেড়ে চলে যান না ফেরার দেশে।যিনি আমার অস্তিত্বের সাথে মিশে আছেন । সৎ, নিষ্ঠাবান, ধর্মপরায়ন, কর্তব্যপরায়ণ, সত্যবাদী এক মানুষ ছিলেন আমার আব্বু। কোনোদিন অন্যায়ের কাছে মাথানত করতে দেখিনি উনাকে। তিনি আমাদেরকেও সৎভাবে জীবন যাপনে উদ্বুদ্ধ করতেন এবং বলতেন কষ্ট হবে তোমাদের তারপরেও সৎপথ থেকে বিচ্যুত হবে না। তিনি পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন শিকতার মতো এক মহান পেশাকে।
আমার পিতার জন্ম যশোর জেলার কেশবপুর উপজেলার ভালুকঘর গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে। যে বাড়িতে তিনি জন্মগ্রহণ করেছিলেন সেটা হাজী বাড়ি হিসেবে পরিচিত। বিশিষ্ঠ আলেম আমার আব্বু মরহুম মাওলানা আব্দুল হাই সিদ্দিকীর শেষ ইচ্ছানুযায়ী পারিবারিক গোরস্থান তাঁর পিতা- মায়ের কবরের পাশেই দাফন করা হয়।
তিনি লেখাপড়া করেছেন মাদ্রাসা থেকে ৩টি বিষয়ে কামিল পাশ এবং জেনারেল থেকে কৃতিত্বেও সাথে মাস্টার্স পাশ করেন । আমার দাদার পূর্ব অনুরোধে তাঁর প্রতিষ্ঠিত ভালুকঘর আজিজিয়া ফাযিল মাদ্রাসায় শিকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তখনকার দিনে এতদোঞ্চলে কোনো উচ্চবিদ্যালয় ছিল না। শিার আলো থেকে মানুষ বঞ্চিত ছিল। তিনি প্রথমদিকে মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়ে ছাত্র সংগ্রহ করতেন এবং তাদেরকে মাদ্রাসায় আসার ব্যাপারে উৎসাহিত করতেন। কেশবপরের মানুষের সাথে আব্বুর অন্তরঙ্গ সম্পর্ক ছিল। তারা সম্মান করতেন, ভালোবাসতেন এবং তিনিও জাতি,ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে প্রতিটা মানুষ কে সম্মান করতেন ভালোবাসতেন আমার অহংকার হলেন আমার আব্বু।
আব্বুর মহৎ গুণাবলীর মধ্যে রয়েছে অন্যকে তিনি সম্মান করতেন, যে অবস্থানে থাকতেন সেটাতে তিনি সন্তুষ্ট থাকতেন এবং তিনি ছিলেন প্রচারবিমুখ একজন মানুষ। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি ভালুকঘর কেন্দ্রীয় মসজিদের খতিব ছিলেন এবং ভালুকঘর ফাযিল মাদ্রাসার ভারপ্রাপ্ত অধ্যরে দায়িত্ব পালন করেছেন। আমার বাবা ছিলেন আমার আদর্শ,
ছোটবেলায় থেকেই আমি আব্বুর সাথে সাথে থাকতাম। তিনি আমাকে নিয়ে মাছ বাজার থেকে শুরু করে স্যালুন, ব্যাংক, শিা অফিস, মার্কেট প্রায় সব জায়গায় যেতেন। যার কারণে উনার সাথে ঘনিষ্ঠতা আমার বেশি ছিল। তিনি বিনয়ের সাথে কথা বলতেন এবং বয়সে ছোটদেরকেও আপনি সম্বোধন করতেন।
ব্যক্তিজীবনে আমার আব্ব সাদামাঠা জীবন-যাপনে অভ্যস্থ ছিলেন। পরম করুণাময় আল্লাাহর প্রতি উনার ছিল দৃঢ় বিশ্বাস। তাই তিনি জীবনে বিপদ-আপদ আসলে ধৈর্যের সাথে সেটাকে মোকাবেলা করতেন। আমার মা থেকে শুরু করে আমাদের পরিবারের প্রতিটি সদস্যের প্রতি তিনি যতœবান ছিলেন। তিনিও আমাকে সঙ্গে রাখতেন,সকল বিষয়ে পরামর্শ করতেন হয়তোবা ভরসা পেতেন।
আমার কল্পনা করতেও কষ্ট হয় যে, তিনি আমাদের মাঝে আর নেই। কে শাসন করবে আমাকে, কে আমাকে আদর করবে, কে আমার খুশিতে খুশি হবে, কে আমার সাথে অভিমান করবে এইসব ভাবলেই মনটা কেমন যেন আবেগাপ্লুত হয়ে যায়।
আমার একটা কথা বার বার মনে হচ্ছে তিনি যখন হসপিটালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ছিলেন তখন আমি উনার পাশেই ছিলাম। তিনি দুই বার আমার দিকে তাকিয়ে চোখ বন্ধ করলেন আর তাকালেন না। যতোদিন বেঁচে থাকব আমার প্রাণপ্রিয় আব্বুর স্মৃতিটাকে আগলে ধরে থাকব। কেননা আমি বিশ্বাস করি আমার প্রতিটি নিঃশ্বাসের সাথে তিনি মিশে আছেন। আব্বুর সেই হাসিমুখটি যেন দেখেছিলাম যে দিন শেষ বিদায় দিলাম সেদিনও। তিনি যেনো আমাকে বলছেন মাহফুজ তুমি বুঝে শুনে চলবা, তোমাকে তো সব শিখিয়ে দিয়েগেছি, তবে কান্না কেন।’
সত্যিই আমাকে শিখিয়েছেন, সৎভাবে জীবন-যাপন করতে, সৃষ্টিকর্তার সান্নিধ্যে থাকতে। শিখিয়েছেন ন্যায়-অন্যায়, হারাম-হালাল। আত্মঅহমিকা বিসর্জন দিয়ে নিজেকে সাধারণ মানুষ ভাবতে শিখিয়েছেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, মানুষের অহংকার করার মতো কিছুই নেই। সবই সৃষ্টিকর্তার দান। আমার আব্বু ছিলেন লোভ-লালসার ঊর্ধ্বে একজন মানুষ। ভবিষ্যত নিয়ে কম ভাবতেন তিনি। আমাদেরকে বলতেন, কাউকে ঠকাবে না, নিজে ঠকবে, এতে পরকালের হিসাব সহজ হবে। তিনি সারাজীবন মানুষের দ্বারা ঠকেছেন। যাদের তিনি বেশি উপকার করেছেন তারাই তাকে অনেক ক্ষতি করেছেন এবং এখনও করছেন।
আব্বু চলে গেছেন, কিন্তু তিনি বেঁচে থাকবেন আমরা যারা উনার সন্তান তাদের মধ্য দিয়ে এবং অগণিত ছাত্র-ছাত্রী যাদেরকে তিনি মানুষ হিসেবে গড়ে দিয়ে গেছেন।
আমার এমন কলিজার টুকরা আব্বুকে আমি কেমন করে ভুলে থাকতে পারি। যার পদচারণা আমার কল্পনা চিন্তা চেতনায়। যাকে ছাড়া আমার স্মৃতিগুলো মলিন। স্বপ্নগুলো ঝরা পাতার মতো। আমার জীবনের এগিয়ে চলার পালতোলা নৌকাটা যেন খেই হারিয়ে ফেলেছে। আমার হৃদয়ের রক্তরণ হচ্ছে প্রতিটি মুহূর্তে।
আব্বু আপনি অনাবিল শান্তিতে শায়িত থাকবেন। এটাই আমার প্রতি মুহূর্তের প্রার্থনা।####

